Monday, April 4, 2016

বিজ্ঞানে সমতা এলেও কর্মমুখী শিক্ষায় পিছিয়ে নারী

সরকারের হিসেব মতে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় বাংলাদেশ নারী-পুরুষ সমতাও অর্জন করেছে। এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মেয়ে মাধ্যমিক স্কুলে পড়াশোনা করতে পারে। মাধ্যমিক পর্যায়ে এখন ছেলের চেয়ে মেয়ের সংখ্যা বেশি। মেয়েদের ক্ষেত্রে নেট ভর্তির হার ৪৪ থেকে বেড়ে ৫৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর ছেলেদের ক্ষেত্রে এ হার ৩২ থেকে ৪৫ শতাংশ হয়েছে। আগের চেয়ে বেশি মেয়ে শিক্ষার্থী এখন স্কুলে টিকে থাকছে। শিক্ষায় নারীরা সমতা অর্জন করলেও কর্মমুখী শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ছেন তারা। সম্প্রতি ইউনেস্কো বাংলাদেশের বিজ্ঞানশিক্ষা ও গবেষণা-বিষয়ক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ইউনেস্কো সায়েন্স রিপোর্ট: টোয়ার্ডস ২০৩০ শীর্ষক প্রতিবেদনটিতে শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে বিজ্ঞানশিক্ষা ও গবেষণায় নারী-পুরুষের অংশগ্রহণের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিজ্ঞানশিক্ষায়, এমনকি নারী-পুরুষের সমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম প্রকৌশল, কৃষি, চিকিৎসা, সেবা, গবেষণা, কারিগরিসহ কর্মমুখী শিক্ষা। এখানে নারীরা পিছিয়ে পড়ছেন। কারিগরি শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণের হার মাত্র ২৮ শতাংশ। পেশাগত শিক্ষায় এ হার ৩৯ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে বলছে, বাংলাদেশে প্রকৌশল শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ। দেশের জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে রূপান্তরের জন্য প্রকৌশল, কারিগরি, চিকিৎসা ও প্রযুক্তি-বিষয়ক শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নে কর্মমুখী এসব শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অথচ সাধারণ শিক্ষায় ছেলেমেয়ে সমতা অর্জন করলেও কর্মমুখী শিক্ষায় অনেক পিছিয়ে রয়েছেন দেশের নারীরা। বর্তমানে প্রকৌশল শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ১৭ শতাংশ। ইউনেস্কোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষি গবেষণায়ও পিছিয়ে নারীরা। এক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ৩১ দশমিক ১ শতাংশ। চিকিৎসায় ও সেবায় এ হার ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে বিজ্ঞানশিক্ষায় তাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক ভালো। এক্ষেত্রে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদনেও প্রকৌশল শিক্ষা ও গবেষণায় নারীর পিছিয়ে থাকার চিত্র উঠে এসেছে। ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি বুয়েটে। বুয়েটে অধ্যয়নরত মোট ১০ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী সংখ্যা মাত্র ১ হাজার ৯৪০। সে হিসেবে বুয়েটে নারীর অংশগ্রহণ ২০ শতাংশেরও কম।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, কর্মমুখী শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম থাকার কারণ মূলত তিনটি। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক, বিজ্ঞানশিক্ষার তুলনায় প্রকৌশল বা কর্মমুখী শিক্ষা ব্যয়বহুল এবং প্রকৌশল নিয়ে কাজ করার মতো শারীরিক সক্ষমতা মেয়েদের নেই। এসব কারণে মেয়েরা এখানে আসতে চায় না।
ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসেফিক ভিসি ও বুয়েটের সাবেক শিক্ষক প্রফেসর ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, বিজ্ঞানশিক্ষায় বাংলাদেশের নারীদের সমতা অর্জন নিঃসন্দেহে এক বড় অগ্রগতি। বিজ্ঞানশিক্ষায় নারীরা এগিয়ে আসলেও প্রকৌশলসহ কর্মমুখী শিক্ষায় তারা আসতে চায় না। এর  পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। কুসংস্কার, পরিবার, সামাজিকসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা এখানে কাজ করে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভিসি অধ্যাপক খালেদা একরাম বলেন, কয়েকটি কারণে নারীরা বিজ্ঞান শিক্ষা অর্জন করলেও প্রকৌশলসহ কর্মমুখী শিক্ষায় আসতে চায় না। তবে এ ধারণা পালটাতে শুরু করেছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নারীরাও এখন কর্মমুখী শিক্ষায় এগিয়ে আসছে। তবে এটায় সমতা বিধান করতে আরেকটু সময় লাগবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইউজিসি প্রতিবেদন অনুযায়ী, নারীর অংশগ্রহণ সবচেয়ে কম ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট)। এ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাত্র ৭ শতাংশ ছাত্রী অধ্যয়নরত। এর বাইরে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) নারীর অংশগ্রহণ ১৭ শতাংশ, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) ১৫ এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) মাত্র ১৪ শতাংশ। এ ছাড়া কারিগরি শিক্ষায়ও পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের নারীরা। বাংলাদেশ শিক্ষা ও গবেষণা ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কারিগরি শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণের হার মাত্র ২৮ শতাংশ। পেশাগত শিক্ষায় এ হার ৩৯ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান অস্ট্রেলিয়া যাওয়া আগে বলেন, কর্মমুখী শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য বেশ কয়েকটি উদ্যাগ নেয়া হয়েছে। তবে বর্তমান যুগে নারীরা সবচেয়ে বেশি মানবিক ও ব্যবসা শিক্ষায় পড়তে আগ্রহী। এরপরও রয়েছে নানা কুংস্কার। এসব প্রতিবন্ধকতা পড়েও এখাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা করছি।
এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বিজ্ঞান শিক্ষার হার এমনেই কমে যাচ্ছে। এরমধ্যে নারীর অংশগ্রহণ আরও কম। তিনি বলেন, শিক্ষায় আমরা এখন নারী-পুরুষ সমতা অর্জন করেছি। এখন যদি কর্মমুখী শিক্ষায় নারীরা পিছিয়ে যায় তার মানে সামগ্রিক শিক্ষায় আমরা পিছিয়ে গেলাম। এ ব্যাপারে সরকারের সুদৃষ্টি দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

No comments:

Post a Comment