Wednesday, March 16, 2016

ফেডারেল ব্যাংকের নিষেধ সত্ত্বেও ক্যাশ ডেলিভারি দেয় আরসিবিসি-ফিলিপিন্স সিনেটে শুনানি

এক্সিকিউটিভ সেশনে মুখ খুলবেন ব্রাঞ্চ ম্যানেজার * ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট সব জানতেন * সন্দেহজনক ৪৪ অ্যাকাউন্ট জব্দ * ১৮ মিলিয়ন ডলার উদ্ধার হতে পারে * চুরি যাওয়া অর্থের ৩০ মিলিয়ন ডলার চীনা ব্যবসায়ীর কাছে * ৫০ মিলিয়ন ডলার ছাড়া হয় ক্যাসিনোতে * অর্থ উত্তোলনের দিন ব্যাংকের সব সিসি ক্যামেরা অকার্যকর ছিল
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট থেকে ফিলিপিন্সে পাচার হওয়া ৮১ মিলিয়ন ডলার ডেলিভারি দিতে নিষেধাজ্ঞা জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। ‘স্টপ পেমেন্ট’ নামের নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে ফিলিপিন্সের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি) জুপিটার ব্রাঞ্চ ক্যাশ ডেলিভারি করে। চারটি অ্যাকাউন্টে ডেলিভারি হওয়া ওই অর্থের মধ্যে ৩০ মিলিয়ন ডলার চলে গেছে এক চীনা ব্যবসায়ীর কাছে। চীনা ব্যবসায়ী ওয়াইক্যাং ঝুকে মার্কিন ডলার ও স্থানীয় মুদ্রা পেসোতে দু’দফায় ওই টাকা পৌঁছে দেয় বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী একটি প্রতিষ্ঠানে।
মঙ্গলবার ফিলিপিন্স সিনেট কমিটির শুনানিতে এ তথ্য জানান, দেশটির সরকার অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ফিলরেম সার্ভিস কর্পোরেশনের প্রেসিডেন্ট সালুদ বাতিস্তা। বেশ কয়েক দফায় তিনি নিজে চীনা ব্যবসায়ীকে ১৮ মিলিয়ন ডলার ও স্থানীয় মুদ্রায় ৬০০ মিলিয়ন পেসো দিয়েছেন। বাতিস্তা বলেন, ব্যাংক ম্যানেজার সান্তোষ দেগুইতোর নির্দেশে এ টাকা চীনা ওই ব্যবসায়ীকে দেয়া হয়েছে। ওই ব্যবসায়ীকে তিনি চেনেন কিনা জানতে চাইলে বাতিস্তা বলেন, ওয়াইক্যাং ঝু বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের একজন সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী।
ফিলিপিন্স সিনেট কমিটি মঙ্গলবার স্মরণকালের বৃহত্তম এ ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনায় ৪ ঘণ্টার শুনানি গ্রহণ করে। শুনানিতে তদন্ত কমিটির প্রধান সিনেটর তেওইফিস্তো গুইনগোনাসহ অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এতে রিজাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট লরেঞ্জো ট্যান, জুপিটার স্ট্রিট শাখা ম্যানেজার মাইয়া সান্তোষ দেগুইতোসহ সন্দেহভাজন সবাইকে ডাকা হয়। ফিলিপিন্সের স্থানীয় দৈনিক ইনকোয়ারার জানায়, ৫ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলার স্থানান্তরিত হয় ফিলিপিন্সের আরসিবিসি ব্যাংকের জুপিটার ব্রাঞ্চে। ৮ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৫টায় আরসিবিসিকে ওই অর্থ ডেলিভারিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ‘স্টপ অর্ডার’ পাঠানো হয়। কিন্তু চীনা নববর্ষ উপলক্ষে ওই দিন ব্যাংক বন্ধ ছিল। শুনানিতে তদন্ত কমিটির প্রধান সিনেটর তেওইফিস্তো গুইনগোনা ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও সিইও লরেঞ্জো ট্যানকে জিজ্ঞেস করেন, ফেডারেল ব্যাংকের স্টপ পেমেন্ট অর্ডার পাওয়ার পর আপনার ব্যাংক প্রথম খোলা হয় ৯ ফেব্রুয়ারি সকালে। কিন্তু ওই নিষেধাজ্ঞা আমলে না নিয়ে সব ক্যাশ ডেলিভারি দেয়া হয় কেন? নিউইয়র্কের ফেডারেল ব্যাংকের ওই নিষেধাজ্ঞার জবাব দেয়া হয় ৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে। তখন তো দিনের শেষ সময়। ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘স্টপ পেমেন্ট অনুরোধ কেন করেছেন তার ব্যাখ্যা দেবেন কি?’ কিন্তু যে কাজটা করা উচিত ছিল দিনের শুরুতে, সেটা কেন অর্থ ডেলিভারির পরে করা হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তরে লরেঞ্জো ট্যান বলেন, ‘স্যরি! স্যার, আমি এটা স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটাই করতে পারছি না। ব্রাঞ্চ ম্যানেজার এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন।’
এদিকে, শুনানিতে সব প্রশ্নের জবাব ‘এক্সিকিউটিভ সেশন’-এ দিতে চেয়েছেন প্রধান অভিযুক্ত আরসিবিসি ব্যাংক ব্রাঞ্চ ম্যানেজার সান্তোষ দেগুইতো। কমিটির সভাপতি এ সময় দেগুইতোর কাছে জানতে চান তিনি চীনা ওই ব্যবসায়ীকে চেনেন কিনা। দেগুইতো উত্তরে বলেন, চেনেন না।
এ সময় সিনেট কমিটির সভাপতি তার কাছে জানতে চান যে, যাকে আপনি চেনেন না বলে বলছেন, তাকে কিভাবে এতগুলো টাকা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন? এ জিজ্ঞাসার কোনো জবাব দেননি ব্যাংক ম্যানেজার দেগুইতো।
তদন্ত কমিটির প্রধান সান্তোষ দিগুইতোকে জিজ্ঞেস করেন, তার ব্রাঞ্চে মাইকেল ফ্রান্সিসকো ক্রুজ, জেসি ক্রিস্টোফার লাগরোসাস, এনরিকো তেওদোরো ভাসকুয়েজ এবং আলফ্রেড সান্তোস ভারগারা যে চারটি অ্যাকাউন্ট খোলেন, যার মাধ্যমে ওই ৮১ মিলিয়ন ডলার পাচার করা হয়, সে সম্পর্কে তিনি কি জানেন। এতদিন কোনো লেনদেন না হলেও হঠাৎ শত মিলিয়ন মার্কিন ডলার একটা অ্যাকাউন্টে চলে আসলো, আর এটিকে তার কাছে সন্দেহজনক কিছু মনে হয়নি কেন? এর উত্তরে দিগুইতো বলেন, তিনি ‘এক্সিকিউটিভ সেশন’-এ এ প্রশ্নের উত্তর দেবেন।
 ‘এক্সিকিউটিভ সেশন’-এর আওতায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় মামলার সঙ্গে জড়িতরা ছাড়া অন্য কেউ উপস্থিত থাকতে পারেন না। তবে আরসিবিসি ব্যাংকের ম্যানেজারকে ব্যক্তিগতভাবে ‘এক্সিকিউটিভ সেশনে’ জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কিনা তা নিশ্চিত না করলেও, পুরো প্রক্রিয়াকে ‘এক্সিকিউটিভ সেশনের’ আওতায় আনার ব্যাপারে সম্মত হয়নি তদন্ত কমিটি।
এক্সিকিউটিভ সেশন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু জানা যায়নি। সিনেটর তেওইফিস্তো গুইনগোনা বলেন, এ চুরি যাওয়া টাকার মালিক যারা, তারা আমাদের কাছে এ ব্যাপারে কোনো আবেদন জানায়নি। তিনি বলেন, ‘এক্সিকিউটিভ সেশনের ব্যাপারে দুটো আবেদন আছে। কিন্তু আমি তাতে একমত হতে পারছি না। কেননা, এ টাকার মালিক বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের এ ব্যাপারে কোনো আহ্বান জানানো হয়নি।
এর আগে সান্তোস দিগুইতো বলেছিলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মতোই তিনি সব কাজ করেছেন। এ ঘটনায় ওই ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও সিইও লরেঞ্জো ট্যান জড়িত বলে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান। ব্যাংকটির প্রেসিডেন্ট অর্থ স্থানান্তরের ওই অবৈধ প্রক্রিয়ার কথা আগে থেকেই জানতেন এবং বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির সঙ্গে তার বন্ধু জড়িত ছিলেন।
মঙ্গলবারের শুনানিতে রিসোর্স পারসন হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয় বিভিন্ন ব্যাংক, ক্যাসিনো মালিকদের। আরও উপস্থিত ছিলেন অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিলের (এএমএলসি) কর্মকর্তা, বিএসপি গভর্নর আমান্দো টেটাঙ্গকো জুনিয়র, ফিলিপাইন এমিউজমেন্ট অ্যান্ড গেমিং কর্পোরেশনের ক্রিস্টিনো নগুইয়াত, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের তেরেসিতা হারবোসা, ইন্স্যুরেন্স কমিশনের কমিশনার ইমানুয়েল ডুস ও এএমএলসি সেক্রেটারিয়েটের নির্বাহী পরিচালক জুলিয়া বাকে-বাবাদ।
এদিকে, ফিলিপিন্সের অর্থ পাচার প্রতিরোধবিষয়ক সরকারি প্রতিষ্ঠান অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিলের (এএমএলসি) নির্বাহী পরিচালক রয়টার্সকে বলেছেন, ‘আমাদের অর্থগুলো ক্যাসিনোর জুয়াতে শেষ হয়ে যাচ্ছে।’ এ সময় তিনি বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহজনক ৪৪টি অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগশনকে (এফবিআই) তদন্তে সহায়তার অনুরোধ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক থেকে ৫ থেকে ৯ ফেত্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট থেকে সুইফট কোর্ড ব্যবহার করে ১০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার লোপাট করা হয়। সরিয়ে নেয়া অর্থের ৮১ মিলিয়ন পাঠানো হয় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি) মাকাতি সিটির জুপিটার স্ট্রিট শাখার একটি অ্যাকাউন্টে। মাত্র ৫০০ ডলার করে জমা দিয়ে ফিলিপিন্সের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনে (আরসিবিসি) ২০১৫ সালের ১৫ মে চারটি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ওই অ্যাকাউন্টগুলোতে আর কোনো লেনদেন হয়নি।
এদিকে ফিলিপিন্সে পাচার হওয়া সেই ৮১ মিলিয়ন ডলারের হদিস মিলছে না। অর্থ উত্তোলনের দিন দেশটির সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সিসি ক্যামেরা বন্ধ ছিল। তদন্ত কর্মকর্তারা সেদিনের সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজ চাইলেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তা দিতে পারছেন না।
ফিলিপিন্সের ইনকোয়ারার পত্রিকা জানায়, সে দেশের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি) জুপিটার শাখা থেকে যেদিন ওই অর্থ উত্তোলন করা হয় সেদিন ওই শাখার সব সিসি ক্যামেরা বন্ধ ছিল। কমিটির প্রধান সিনেটর তেওইফিস্তো গুইনগোনা সিসিটিভি অকার্যকর হওয়াকে ‘বড় সন্দেহজনক’ ঘটনা বলে অভিহিত করেছেন।
অন্যদিকে, যেসব অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ উত্তোলন করা হয় সেসব অ্যাকাউন্ট খোলার সময় ভুল তথ্য দেয়া হয়েছিল। এজন্য চুরি যাওয়া অর্থ ঠিক কোথায় গেল সে বিষয়ে সঠিক তথ্য পাচ্ছে না দেশটির প্রশাসনও। তবে সিনেট বলছে অর্থ যেখানেই থাকুক খুঁজে বের করা হবে।

No comments:

Post a Comment