Thursday, March 17, 2016

মেয়েকে তুলে নিতে বাধা দেওয়ায় বাবা খুন

মণীন্দ্র চন্দ্র অধিকারী
স্কুলছাত্রী মেয়েকে তুলে নিতে বাধা দেওয়ায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হয়েছেন এক বাবা। পুলিশ বলেছে, পরিবার বিয়ে ঠিক করায় মেয়েটির কথিত প্রেমিক তুহিন দলবল নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে এই হামলা ও হত্যার ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পলায়নপর হামলাকারীদের মধ্যে সাতজনকে ধরে পিটুনি দিয়ে পুলিশে দিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। আদালতে তোলার পর এঁদের মধ্যে ছয়জনের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে।
নিহত মণীন্দ্র চন্দ্র অধিকারী (৪৫) নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার ভুঁইগড় রঘুনাথপুরের বাসিন্দা। তিনি একটি বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক এবং ভ্যানচালক।
এলাকাবাসী ও পুলিশ জানায়, মাস ছয়েক আগে মনীন্দ্র চন্দ্র অধিকারীর মেয়ের (অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে নাম উল্লেখ করা হলো না) সঙ্গে রাজধানীর শ্যামপুর এলাকার তুহিনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তুহিন শ্যামপুরের একটি সাউন্ড সিস্টেম দোকানের কর্মচারী। মেয়েটি ফতুল্লার একটি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী। মেয়ের মা হত্যার ঘটনায় করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করেছেন, পূজায় সাউন্ড সিস্টেম ভাড়া নিতে গেলে তুহিনের সঙ্গে তাঁর মেয়ের পরিচয় হয়। এরপর থেকেই তুহিন তাঁর মেয়েকে উত্ত্যক্ত করতেন।
পুলিশ জানায়, তুহিনের সঙ্গে সম্পর্কের কথা জানতে পেরে মনীন্দ্র চন্দ্র তাঁদের এ সম্পর্ক ছিন্ন করতে মেয়েকে চাপ দেন। চাপের কারণে মেয়েটি দুই মাস ধরে তুহিনকে এড়িয়ে চলছিল। সম্প্রতি মনীন্দ্র চন্দ্র অন্য এক যুবকের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে ঠিক করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন তুহিন। মঙ্গলবার দিবাগত রাত পৌনে তিনটার দিকে তিনি দুটি মাইক্রোবাসে (টয়োটা হাইয়েস মাইক্রোবাস ঢাকা মেট্রো ম-০০-০৪৩৪, ঢাকা মেট্রো চ-৪৫-৯৫৬৭) করে ১০-১২ জন সহযোগী নিয়ে মেয়েটিকে তুলে নিতে তাঁদের বাড়িতে যান। বিষয়টি পরিবারের লোকজন টের পেলে মনীন্দ্র ঘর থেকে বের হন। দুর্বৃত্তরা তখন ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে তাঁকে হত্যা করেন। পরিবারের লোকজনের চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে সাত সন্ত্রাসীকে আটক করে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে দেন।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, বাবার কারণে মেয়ে সরে যাচ্ছে—এ ধারণা থেকে তুহিন ও তাঁর সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে মনীন্দ্রকে মেরে ফেলার জন্য উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করেন। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁকে মেরে ফেলার জন্যই হামলা চালানো হয়েছে।
ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল হোসেন জানান, এ ঘটনার মূল হোতা তুহিনসহ অন্যরা পলাতক রয়েছেন। তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ঘটনাস্থল থেকে দুটি হাইয়েস মাইক্রোবাস এবং দুটি ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
নিহত মনীন্দ্র চন্দ্রের স্ত্রী প্রজাপতি রানী বাদী হয়ে ফতুল্লা থানায় তুহিনসহ ১২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও আটজনকে আসামি করে মামলা করেছেন। গ্রেপ্তার হওয়া এবং মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন শ্যামপুর হাইস্কুল রোড (বাগিচা) এলাকার হৃদয় (৩২), ঢাকার বাড্ডার নতুন বাজার এলাকার অ্যালবার্ট সুশান্ত টুডু (১৯), ঢাকার গেন্ডারিয়ার দুই ভাই নজরুল ইসলাম (৩০) ও মনিরুল ইসলাম (৩৪), কেরানীগঞ্জের জাহিদ (২০), শ্যামপুর গ্লাস ফ্যাক্টরি এলাকার বাবু (২০) ও জুয়েল (২৫), জুরাইন টোল বাগিচা এলাকার তানভীর (২২)। এজাহারভুক্ত পলাতক আসামিরা হলেন শ্যামপুর কদমতলী এলাকার তুহিন (২১), একই এলাকার সবুজ (২২)। অজ্ঞাতনামা আসামি আরও ৮ জন।
গ্রেপ্তার আট আসামির মধ্যে ছয়জনকে গতকাল বিকেলে নারায়ণগঞ্জের বিচারিক হাকিম সাইদুজ্জামান শরীফের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। শুনানি শেষে আদালত প্রত্যেককে তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান বলেছেন, অসুস্থতার কারণে আসামি হৃদয়ের রিমান্ডের আবেদন করা হয়নি। হৃদয় নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি আছেন। আর তানভীরকে বিকেলে ঢাকার শ্যামপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আজ বৃহস্পতিবার তাঁকে আদালতে হাজির করা হবে বলে জানায় পুলিশ।
মহিলা পরিষদের ক্ষোভ: ফতুল্লার এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। পরিষদ গতকাল এক বিবৃতিতে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার দাবি করা হয়। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম ও সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু।

No comments:

Post a Comment