![]() |
| বিমানটির ককপিটের জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসছেন এক মরিয়া আরোহী। ডানের ছবিতে আত্মসমর্পণ করতে বিমানের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছেন ছিনতাইকারী |
দিনভর
উৎকণ্ঠার পর রক্তপাত বা অন্য কোনো অঘটন ছাড়াই মিসরীয় বিমান ছিনতাই
নাটকের অবসান ঘটেছে গতকাল মঙ্গলবার। ইজিপ্টএয়ারের অভ্যন্তরীণ রুটের
উড়োজাহাজটি সাইপ্রাসে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে সেখানে সব যাত্রীকেই ছেড়ে দেন
ছিনতাইকারী এক মিসরীয় নাগরিক। সাইপ্রাস ও মিসরের সরকার—উভয়েই বলেছে, এ
ঘটনার সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের কোনো যোগসূত্র নেই। গতকাল সকালে বিমানটি
ছিনতাই হওয়ার পর থেকে এর কারণ, ছিনতাইকারীর পরিচয় নিয়ে একের পর এক
বিপরীতধর্মী তথ্য পাওয়া যায়। সর্বশেষ সাইপ্রাস সরকারের মুখপাত্র নিকোস
ক্রিস্টোডলিডেজ বলেন, ওই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর বেশি কিছু
তিনি বলেননি। বিমান ছিনতাইয়ের খবর প্রচারের পর সংবাদমাধ্যমে এর কারণ হিসেবে
নানা ধরনের কথা শোনা যায়। শুরুতে এমন সংবাদ আসে যে ছিনতাইকারী একজন
মিসরীয়। তিনি সাইপ্রাসে থাকা তাঁর সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন।
খবরে বলা হয়, সাইপ্রাসের নাগরিক সেই নারী লারনাকা বিমানবন্দরের উদ্দেশে
রওনা হয়েছেন। সাইপ্রাসের প্রেসিডেন্ট নিচোস আনাস্তাসিয়াদেসও বিমান
ছিনতাইয়ের এমন কারণই উল্লেখ করেন। গতকাল স্থানীয় সময় সকাল আটটায় মিসরের
উপকূলবর্তী শহর আলেকজান্দ্রিয়া থেকে রওনা হয়ে কায়রো যাওয়ার পথে
ইজিপ্টএয়ারের ওই বিমানটি ছিনতাই হয়। এয়ারবাস এ৩২০ মডেলের ওই উড়োজাহাজে ৮১
জন যাত্রী ছিলেন। এটি স্থানীয় সময় সকাল আটটা ৫০ মিনিটে সাইপ্রাসের বন্দরনগর
লারনাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। মিসরের বিমান পরিবহনমন্ত্রী
শরিফ ফাতি বলেন, লারনাকার বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরপরই ওই ছিনতাইকারী
তিনজন যাত্রী এবং বিমানটির চারজন ক্রু ছাড়া সবাইকেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। দিনের
শেষভাগে ছিনতাইকারীর নাম পাওয়া যায়। তবে তা নিয়েও ছিল বিভ্রান্তি। মিসরের
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা মেনা প্রথমে ছিনতাইকারীর নাম উল্লেখ করে, ইব্রাহিম
সামাহা। পরে আবার বলা হয়, সাইফ আলদিন মুস্তাফা। সাইপ্রাসের পররাষ্ট্র
মন্ত্রণালয়ও ছিনতাইকারীর নাম মুস্তাফা বলে উল্লেখ করে। সিওয়াইবিসি নামের
সাইপ্রাসের একটি টেলিভিশন চ্যানেল জানায়, ওই ছিনতাইকারী মিসরের নারী
বন্দীদের মুক্তি দাবি করেন। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কর্মকর্তাদের
সঙ্গেও সাক্ষাৎ করতে চান। এতে করে ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে
পারে বলে একপর্যায়ে ধারণা করা হচ্ছিল। লারনাকা বিমানবন্দরে নামার পর
টারমাকেই থাকে বিমানটি। এর চারপাশজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান
নেন। মিসরের বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় জানায়, ছিনতাই হওয়া বিমানটির পাইলট
ওমর আল গামাল তাঁদের বলেছিলেন, এক যাত্রী তাঁর কাছে বিস্ফোরকবাহী বেল্ট
আছে বলে হুমকি দেন। পাইলট বলেন, ওই যাত্রীই তাঁকে বিমানটি লারনাকায় নিয়ে
যেতে বাধ্য করেন। বিমান পরিবহনমন্ত্রী শরিফ ফাতি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা
জানি না, আদৌ কোনো হুমকি দেওয়া হয়েছিল কি না বা আদৌ তাঁর কাছে
বিস্ফোরকবাহী বেল্ট ছিল কি না।’ পরে অবশ্য কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেন যে,
ছিনাইয়ের জন্য নকল বেল্ট ব্যবহার করেছিলেন ওই ব্যক্তি। নতুন এই বিমান
ছিনতাইয়ের কোনো নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত না হওয়া গেলেও একটি বিষয় নিশ্চিত
যে, এর ফলে মিসরের পর্যটনশিল্প আরেক দফা ধাক্কা খাবে। মিসরের অর্থনীতির
একটি শক্তিশালী খাত পর্যটন। ২০১১ সাল থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক অচলাবস্থার
কারণে দেশটির অর্থনীতির অবস্থা এমনিতেই বেশ নাজুক। গত বছরের অক্টোবরে
সিনাই উপদ্বীপে যাত্রীবাহী রুশ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর থেকে পর্যটন খাতের
আয় বেশ কমেছে মিসরে। প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি দাবি করেন,
সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছিল রুশ বিমানটি। ওই ঘটনার পর জঙ্গি সংগঠন
ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিমানটিতে বোমা পেতে রেখেছিল বলে দাবি করে। এবারের
ঘটনায় অর্থনীতির ওপর প্রভাব পড়ার পাশাপাশি মিসরের বিমান পরিবহনের নিরাপত্তা
নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। গত কয়েক দশকে সাইপ্রাসে বিমানকেন্দ্রিক কয়েকটি
সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে। ১৯৭৮ সালে লারনাকাতেই ছিনতাই হওয়া একটি বিমান মিসরের
সরকারি বাহিনী দ্রুত গিয়ে উদ্ধার করে। ওই ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক
সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। ১৯৮৮ সালে থাইল্যান্ড থেকে কুয়েতগামী কুয়েত
এয়ারলাইনসের একটি বিমান ছিনতাই করে লারনাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। ১৬ দিন ধরে
বিমানের যাত্রীদের আটকে রাখা হয়। ওই ঘটনায় দুজন যাত্রী নিহত হয়েছিলেন।

No comments:
Post a Comment