![]() |
| রাদোভান কারাদজিচ |
রাদোভান
কারাদজিচের সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার ঘটনাটা ভোলার নয়। তিনি তখন বসনীয়
সার্বদের ‘রাজধানী’ পালেতে নিজের সদর দপ্তরের সিঁড়িতে বসে ছিলেন। জায়গাটা
ছিল আসল রাজধানী সারায়েভোর বাইরের একটি জায়গা, তাঁর নির্দেশে সেনারা যে
সারায়েভোর জনগোষ্ঠীর ওপর তিন বছর ধরে বোমাবর্ষণের প্রাণঘাতী উন্মাদনায়
মেতে ছিল।
খুব নিস্তেজ ভঙ্গিতে সে হাত মেলাল, ব্যাপারটা ঠিক তার সঙ্গে যায় না। এই গত সপ্তাহেই হেগ ওয়ার ক্রামইস ট্রাইব্যুনাল হলোকাস্ট– পরবর্তী ইউরোপের সবচেয়ে জঘন্য গণহত্যার জন্য তাঁকে দায়ী করেছেন, বিশেষ করে ১৯৯৫ সালে স্রেব্রেনিৎসাঘটনার জন্য, আদালত এটাকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। আদালতের ভাষায় এটি ছিল ‘সর্বোচ্চ’ নৃশংসতা, যার জন্য কাউকে গণহত্যার অভিযোগে বিচার করা যায়। তখন আমি ইন্টারন্যাশনাল টেলিভিশন নেটওয়ার্কের (আইটিএন) একদল কর্মীর সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলাম। কারাদজিচের প্রতিশ্রুতি মতো আমরা সেখানে গিয়েছিলাম, তিনি আমাদের কথা দিয়েছিলেন, বসনিয়ার উত্তর-পূর্ব নির্যাতন শিবির পরিদর্শন করতে দেবেন। অভিযোগ ছিল, সেখান থেকে নির্বাসিত মানুষেরা পালাচ্ছিল। এর আগে কারাদজিচ লন্ডনে এমন একটি শিবিরের অস্তিত্বের কথাই অস্বীকার করেছিলেন। তিনি চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন, আমরা যেন নিজে গিয়ে সব দেখে আসি। আমরা সেদিন একত্রে দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম, তবে সেই শিবির ও সারায়েভোর দখল নিয়ে কথা বলিনি। তিনি সেদিন সার্বিয়ার মহাকাব্যের কথা বলেছিলেন। তুর্কিদের হাতে শত শত বছর ধরে সার্বদের নির্যাতনের গল্প বলেছিলেন, বলেছিলেন গুসলে নামে এক তারের একধরনের বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে। ওরকম ভীতিকর না হলে ব্যাপারটা ট্র্যাজিক-কমিক হতে পারত। শেষমেশ কারাদজিচআমাদের ওই শিবিরগুলোতে ঢোকার অনুমতি দেন। এমনকি তিনি আমাদের সঙ্গে একজন রক্ষীকেও দেন, যার কাজ ছিল ওমারস্কার প্রথম শিবিরে ঢোকার পর আমরা যেন বেশি কিছু দেখতে না পাই, সেভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করা। আমাদের দেখা ছিল ন্যূনতম দেখা: কিছু কঙ্কালসার মানুষকে ক্যানটিনের সামনে টারমাকের ওপর সার বেঁধে বসিয়ে পানির মতো স্যুপ খাওয়ানো হচ্ছে। এরপর আমরা যখন সেই অন্ধকার ঘরে ঢুকতে চাইলাম, যেখান থেকে তাদের আনা হয়েছে, তখন সেই রক্ষী বন্দুকের মুখে আমাদের এক জায়গায় জড়ো করে ফেলল। যাহোক, জানা গেল ওই ঘরটি ছিল মৃত্যু, নির্যাতন ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কাটার কারখানা। আর ক্যানটিনের ওপর নারীদের রাখা হয়েছিল, যাঁদের নিয়ম করে নির্যাতন করা হতো। কারাদজিচের সঙ্গে দেখা ও পালেতে একত্রে দুপুরের খাবার খাওয়ার পর কতটা সময় চলে গেছে। বসনিয়ায় আরও তিন বছর: পশ্চিম এই শিবিরগুলোতে নির্যাতনের প্রতিবাদের ভান ধরে তারা আসলে কারাদজিচের কর্মসূচিতে সমর্থন দিয়ে গেছে, বড়জোর তাঁকে প্রশমিত করার চেষ্টা করেছে। স্রেব্রেনিৎসার নৃশংস হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত এমনটা ঘটেছে। এর মধ্যে আমাদের কূটনীতিক ও নেতারা ঝাড়বাতির নিচে আগ্রহের সঙ্গেই তাঁর সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। ২০০৮ সালে কারাদজিচের খোঁজ করেছিলাম, যাঁকে তখন বিচারের জন্য খোঁজা হচ্ছিল। আমি ও বন্ধু নেরমা ইয়েলাসিচ সেলিবিসির মাউন্টেন হাইডআউট থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, আমরা যখন আঁকাবাঁকা ও খাড়া পথ বেয়ে শহরে চলে আসছিলাম, তখন একটি লোক আমাদের গাড়ির পেছনের বাম্পারে সজোরে আঘাত করছিল। যখন সার্বিয়া ও পশ্চিমের কারাদজিচকেহেগে নিয়ে যাওয়ার সময়-সুযোগ হলো, তখন আমাকে তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য বলা হলো। আমি রাজিও হয়েছিলাম। এ ছাড়া সাক্ষ্য দেওয়ার আগেও একটি সাক্ষাৎকারের জন্য আমাকে ডাকা হলো। একটি সাদা পর্দা টানা হলো, সেখানেই তিনি ছিলেন, একদম অদ্ভুত ভঙ্গিতে। বুলেটপ্রুফ পর্দার শেষ প্রান্তের চেয়ে চার ফুটেরও কম দূরত্বে ছিলেন তিনি, ওমারস্কা সফরের ব্যাপারে প্রশ্ন করছিলেন। আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করেন, তাঁর ‘জেরার’ মুখে আমি নিজের অবস্থানে দৃঢ় থাকার চেষ্টা করি। তিনি অভিযোগ করছিলেন, ওমারস্কার ব্যাপারে আমি যে প্রতিবেদন লিখেছিলাম, তা মিথ্যা ছিল। তিনি হলফ করে বলছিলেন, ‘সেখানে মাত্র একজন মানুষ মারা গিয়েছিল।’ তবে এখন তো বিচার হয়ে গেছে। ইন্টারন্যাশনাল জাস্টিস কাউন্সেল ফর হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পরম প্রীত সিং এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন: ‘কারাদজিচেরমাশুল গোনা দিনকে দেখার জন্য ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দুই দশকেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। যাঁরা নৃশংসতা চালানোর নির্দেশ দেন, এই বিচারের মধ্য দিয়ে তাঁদের এই শক্তিশালী বার্তাই দেওয়া হলো যে বিচারের রায় চিরদিন আটকে রাখা যায় না।’ আমি অবশ্য এমন জয়ের আশাবাদে বিশ্বাস করি না। কারাদজিচের সহিংসতার পরও যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের কাছ থেকে আমি নির্দেশনা নিই। ডাবলিনে দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় খবরটি পাই, ভিক্তোরিয়া-আমিনা দাউতোভিচ নামের এক প্রিয় বন্ধু খবরটি আমাকে দেয়। বসনিয়ার যেসব শরণার্থী যুক্তরাজ্যে অভিবাসন করেছিল, তাদের কারও ঘরে জন্ম নেওয়া প্রথম সন্তান হচ্ছে এই ভিক্তোরিয়া, যার জন্ম হয় ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে। লুটন শহরে বেড়ে ওঠা এই মেয়েটি তখন ফরেনসিক সায়েন্সের চূড়ান্ত পরীক্ষা দেওয়ার জন্য যাচ্ছিল। এটা সে পড়ছে শুধু একটি কারণে। কোজারাকের আশপাশে নিজের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে মা-বাবার বন্ধুদের ও বন্ধুর মা-বাবার দেহাবশেষ খোঁজাই এই ফরেনসিক সায়েন্স পড়ার উদ্দেশ্য। সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল, যখন তার মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা দরকার ছিল: ‘সে গণহত্যা করেনি।’ না, সে স্রেব্রেনিৎসারকথাবলছিল না, অন্য একটি গণহত্যার কথা বলছিল, যার দায় থেকে কারাদজিচকে রেহাই দেওয়া হয়েছে। সেদিন তার সঙ্গে আমি আরও তিনবার কথা বলি, কিন্তু আমরা কেউই এ ব্যাপারে খুব একটা খুশি হতে পারলাম না। সে বলল, ‘মনে হয় না, আমাদের কেউ ব্যাপারটা উদ্যাপন করছে। শুধু অন্যরা করছে।’ মানে, সে বলতে চাইল, যারা সংবাদপত্রের শিরোনাম লেখে তারা আর আইনজীবী ও পর্যবেক্ষকেরা এটা উদ্যাপন করছে। ঠিক আছে, কারাদজিচকেযদি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হতো, তাহলে সেটা জঘন্য হতো, কিন্তু তা হয়নি, সে জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। স্রেব্রেনিৎসাতে গণহত্যা হয়েছে, কিন্তু সেটা আমরা অন্য ঘটনা থেকে জেনেছি। কিন্তু কারাদজিচকে একটি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে বোঝানে হচ্ছে, নির্যাতন শিবির ও দাউতোভিচদের শহরে যা হয়েছে, তা গণহত্যা নয়। অথচ দাউতোভিচদের শহরটা ধুলায় মিশে গিয়েছিল। কথা হচ্ছে, দ্রিনা নদীর ধারে ভিসেগ্রাদ শহরে যা ঘটেছে তা কী, যেখানে হাজার হাজার মানুষকে সেতুর ওপর কতল করা হয়েছে? মানুষকে ঘরে বন্দী করে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা বা ধর্ষণ শিবিরে মেয়েদের রাখা—এসব কি গণহত্যা নয়? বসনিয়াজুড়ে যে মসজিদ, গ্রন্থাগার, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সৌধ ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেগুলো গণহত্যা নয়? এটা রায়ের প্রতি অকৃতজ্ঞতা নয়, ব্যাপারটা লাখো মানুষের জীবন ধ্বংসের, তাই এই উদ্বেগ।
খুব নিস্তেজ ভঙ্গিতে সে হাত মেলাল, ব্যাপারটা ঠিক তার সঙ্গে যায় না। এই গত সপ্তাহেই হেগ ওয়ার ক্রামইস ট্রাইব্যুনাল হলোকাস্ট– পরবর্তী ইউরোপের সবচেয়ে জঘন্য গণহত্যার জন্য তাঁকে দায়ী করেছেন, বিশেষ করে ১৯৯৫ সালে স্রেব্রেনিৎসাঘটনার জন্য, আদালত এটাকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। আদালতের ভাষায় এটি ছিল ‘সর্বোচ্চ’ নৃশংসতা, যার জন্য কাউকে গণহত্যার অভিযোগে বিচার করা যায়। তখন আমি ইন্টারন্যাশনাল টেলিভিশন নেটওয়ার্কের (আইটিএন) একদল কর্মীর সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলাম। কারাদজিচের প্রতিশ্রুতি মতো আমরা সেখানে গিয়েছিলাম, তিনি আমাদের কথা দিয়েছিলেন, বসনিয়ার উত্তর-পূর্ব নির্যাতন শিবির পরিদর্শন করতে দেবেন। অভিযোগ ছিল, সেখান থেকে নির্বাসিত মানুষেরা পালাচ্ছিল। এর আগে কারাদজিচ লন্ডনে এমন একটি শিবিরের অস্তিত্বের কথাই অস্বীকার করেছিলেন। তিনি চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন, আমরা যেন নিজে গিয়ে সব দেখে আসি। আমরা সেদিন একত্রে দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম, তবে সেই শিবির ও সারায়েভোর দখল নিয়ে কথা বলিনি। তিনি সেদিন সার্বিয়ার মহাকাব্যের কথা বলেছিলেন। তুর্কিদের হাতে শত শত বছর ধরে সার্বদের নির্যাতনের গল্প বলেছিলেন, বলেছিলেন গুসলে নামে এক তারের একধরনের বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে। ওরকম ভীতিকর না হলে ব্যাপারটা ট্র্যাজিক-কমিক হতে পারত। শেষমেশ কারাদজিচআমাদের ওই শিবিরগুলোতে ঢোকার অনুমতি দেন। এমনকি তিনি আমাদের সঙ্গে একজন রক্ষীকেও দেন, যার কাজ ছিল ওমারস্কার প্রথম শিবিরে ঢোকার পর আমরা যেন বেশি কিছু দেখতে না পাই, সেভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করা। আমাদের দেখা ছিল ন্যূনতম দেখা: কিছু কঙ্কালসার মানুষকে ক্যানটিনের সামনে টারমাকের ওপর সার বেঁধে বসিয়ে পানির মতো স্যুপ খাওয়ানো হচ্ছে। এরপর আমরা যখন সেই অন্ধকার ঘরে ঢুকতে চাইলাম, যেখান থেকে তাদের আনা হয়েছে, তখন সেই রক্ষী বন্দুকের মুখে আমাদের এক জায়গায় জড়ো করে ফেলল। যাহোক, জানা গেল ওই ঘরটি ছিল মৃত্যু, নির্যাতন ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কাটার কারখানা। আর ক্যানটিনের ওপর নারীদের রাখা হয়েছিল, যাঁদের নিয়ম করে নির্যাতন করা হতো। কারাদজিচের সঙ্গে দেখা ও পালেতে একত্রে দুপুরের খাবার খাওয়ার পর কতটা সময় চলে গেছে। বসনিয়ায় আরও তিন বছর: পশ্চিম এই শিবিরগুলোতে নির্যাতনের প্রতিবাদের ভান ধরে তারা আসলে কারাদজিচের কর্মসূচিতে সমর্থন দিয়ে গেছে, বড়জোর তাঁকে প্রশমিত করার চেষ্টা করেছে। স্রেব্রেনিৎসার নৃশংস হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত এমনটা ঘটেছে। এর মধ্যে আমাদের কূটনীতিক ও নেতারা ঝাড়বাতির নিচে আগ্রহের সঙ্গেই তাঁর সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। ২০০৮ সালে কারাদজিচের খোঁজ করেছিলাম, যাঁকে তখন বিচারের জন্য খোঁজা হচ্ছিল। আমি ও বন্ধু নেরমা ইয়েলাসিচ সেলিবিসির মাউন্টেন হাইডআউট থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, আমরা যখন আঁকাবাঁকা ও খাড়া পথ বেয়ে শহরে চলে আসছিলাম, তখন একটি লোক আমাদের গাড়ির পেছনের বাম্পারে সজোরে আঘাত করছিল। যখন সার্বিয়া ও পশ্চিমের কারাদজিচকেহেগে নিয়ে যাওয়ার সময়-সুযোগ হলো, তখন আমাকে তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য বলা হলো। আমি রাজিও হয়েছিলাম। এ ছাড়া সাক্ষ্য দেওয়ার আগেও একটি সাক্ষাৎকারের জন্য আমাকে ডাকা হলো। একটি সাদা পর্দা টানা হলো, সেখানেই তিনি ছিলেন, একদম অদ্ভুত ভঙ্গিতে। বুলেটপ্রুফ পর্দার শেষ প্রান্তের চেয়ে চার ফুটেরও কম দূরত্বে ছিলেন তিনি, ওমারস্কা সফরের ব্যাপারে প্রশ্ন করছিলেন। আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করেন, তাঁর ‘জেরার’ মুখে আমি নিজের অবস্থানে দৃঢ় থাকার চেষ্টা করি। তিনি অভিযোগ করছিলেন, ওমারস্কার ব্যাপারে আমি যে প্রতিবেদন লিখেছিলাম, তা মিথ্যা ছিল। তিনি হলফ করে বলছিলেন, ‘সেখানে মাত্র একজন মানুষ মারা গিয়েছিল।’ তবে এখন তো বিচার হয়ে গেছে। ইন্টারন্যাশনাল জাস্টিস কাউন্সেল ফর হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পরম প্রীত সিং এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন: ‘কারাদজিচেরমাশুল গোনা দিনকে দেখার জন্য ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দুই দশকেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। যাঁরা নৃশংসতা চালানোর নির্দেশ দেন, এই বিচারের মধ্য দিয়ে তাঁদের এই শক্তিশালী বার্তাই দেওয়া হলো যে বিচারের রায় চিরদিন আটকে রাখা যায় না।’ আমি অবশ্য এমন জয়ের আশাবাদে বিশ্বাস করি না। কারাদজিচের সহিংসতার পরও যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের কাছ থেকে আমি নির্দেশনা নিই। ডাবলিনে দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় খবরটি পাই, ভিক্তোরিয়া-আমিনা দাউতোভিচ নামের এক প্রিয় বন্ধু খবরটি আমাকে দেয়। বসনিয়ার যেসব শরণার্থী যুক্তরাজ্যে অভিবাসন করেছিল, তাদের কারও ঘরে জন্ম নেওয়া প্রথম সন্তান হচ্ছে এই ভিক্তোরিয়া, যার জন্ম হয় ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে। লুটন শহরে বেড়ে ওঠা এই মেয়েটি তখন ফরেনসিক সায়েন্সের চূড়ান্ত পরীক্ষা দেওয়ার জন্য যাচ্ছিল। এটা সে পড়ছে শুধু একটি কারণে। কোজারাকের আশপাশে নিজের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে মা-বাবার বন্ধুদের ও বন্ধুর মা-বাবার দেহাবশেষ খোঁজাই এই ফরেনসিক সায়েন্স পড়ার উদ্দেশ্য। সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল, যখন তার মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা দরকার ছিল: ‘সে গণহত্যা করেনি।’ না, সে স্রেব্রেনিৎসারকথাবলছিল না, অন্য একটি গণহত্যার কথা বলছিল, যার দায় থেকে কারাদজিচকে রেহাই দেওয়া হয়েছে। সেদিন তার সঙ্গে আমি আরও তিনবার কথা বলি, কিন্তু আমরা কেউই এ ব্যাপারে খুব একটা খুশি হতে পারলাম না। সে বলল, ‘মনে হয় না, আমাদের কেউ ব্যাপারটা উদ্যাপন করছে। শুধু অন্যরা করছে।’ মানে, সে বলতে চাইল, যারা সংবাদপত্রের শিরোনাম লেখে তারা আর আইনজীবী ও পর্যবেক্ষকেরা এটা উদ্যাপন করছে। ঠিক আছে, কারাদজিচকেযদি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হতো, তাহলে সেটা জঘন্য হতো, কিন্তু তা হয়নি, সে জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। স্রেব্রেনিৎসাতে গণহত্যা হয়েছে, কিন্তু সেটা আমরা অন্য ঘটনা থেকে জেনেছি। কিন্তু কারাদজিচকে একটি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে বোঝানে হচ্ছে, নির্যাতন শিবির ও দাউতোভিচদের শহরে যা হয়েছে, তা গণহত্যা নয়। অথচ দাউতোভিচদের শহরটা ধুলায় মিশে গিয়েছিল। কথা হচ্ছে, দ্রিনা নদীর ধারে ভিসেগ্রাদ শহরে যা ঘটেছে তা কী, যেখানে হাজার হাজার মানুষকে সেতুর ওপর কতল করা হয়েছে? মানুষকে ঘরে বন্দী করে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা বা ধর্ষণ শিবিরে মেয়েদের রাখা—এসব কি গণহত্যা নয়? বসনিয়াজুড়ে যে মসজিদ, গ্রন্থাগার, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সৌধ ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেগুলো গণহত্যা নয়? এটা রায়ের প্রতি অকৃতজ্ঞতা নয়, ব্যাপারটা লাখো মানুষের জীবন ধ্বংসের, তাই এই উদ্বেগ।

No comments:
Post a Comment