![]() |
| শহীদ শাফী ইমাম(রুমী) |
রুমী—এক
অকুতোভয় তরুণের নাম, যিনি তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে অজস্র তরুণের অনুপ্রেরণা
হয়ে রয়েছেন। রুমীর পোশাকি নাম শহীদ শাফী ইমাম। বাংলাদেশের মহান
স্বাধীনতাযুদ্ধের এক শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৫১ সালের ২৯ মার্চ শরীফ ইমাম
ও জাহানারা ইমামের কোলজুড়ে আসেন রুমী। কবি জালালুদ্দিন রুমীর মতো জ্ঞানী ও
দার্শনিক হবেন—এ প্রত্যাশায় মা-বাবা ছেলের নাম রেখেছিলেন রুমী। আর পোশাকি
নাম শাফী, অর্থাৎ যিনি নিরাময় করেন। রুমী কি পেরেছিলেন মা-বাবার রাখা নাম
সার্থক করতে? দ্বিতীয় জন্মবার্ষিকীতে রুমী কয়েকটি ছড়ার বই উপহার পেয়েছিলেন।
শুনে শুনে মাস দুয়েকের মধ্যে সব ছড়া মুখস্থ করে ফেলেন ছোট্ট রুমী। মুখস্থ
হয়ে যাওয়ার পর নিজেই ছড়ার ওপর আঙুল দিয়ে পড়তেন। ছবির সঙ্গে ছড়ার যোগসূত্র
সেই দুই-আড়াই বছর বয়সেও সঠিকভাবে মনে রাখতে পারতেন। তিন বছরের শুরুতেই তাঁর
অক্ষরজ্ঞান শেখা হয়ে যায়। মা জাহানারা ইমামের এক বর্ণনায় রুমীর লাইব্রেরি
নিয়ে একটি মজার ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। রুমী তখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়েন। তাঁর
বইয়ের আধিক্য দেখে তিনি রুমীকে নিজস্ব লাইব্রেরি গড়ে তোলার পরামর্শ দেন।
রুমীকে তিনি একটা বুকশেলফ আর একটা রাবার সিল বানিয়ে দেন, যেটাতে লেখা ছিল
‘Rumi’s Own Library’। এতে মহা উৎসাহিত রুমী তাঁর নিজস্ব লাইব্রেরির বইয়ে
সিল মারার ঝোঁকে প্রতিদিনই নতুন বই কিনতে চাইতেন। মায়ের সুযোগ্য পরিচালনা ও
অনুপ্রেরণায় ছোটবেলা থেকেই রুমীর বই কেনা ও পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠেছিল। রুমীর
আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় জাহানারা ইমাম তাঁকে
রিডার’স ডাইজেস্ট ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের গ্রাহক এবং অষ্টম
শ্রেণিতে ওঠার পর টাইম ও লাইফ ম্যাগাজিনের গ্রাহক করে দেন। রুমী তাঁর
পছন্দের বইয়ের সমন্বয়ে নিজস্ব লাইব্রেরি সমৃদ্ধ করতে থাকেন, যেখানে ছিল
ধর্ম, বিজ্ঞান থেকে শুরু করে কার্ল মার্ক্স, অ্যাঙ্গেলস, লেনিন, মাও সে
তুংয়ের সামরিক রচনাবলীসহ বিবিধ বিষয়ভিত্তিক বইয়ের সমাহার। মাত্র ১৭ বছর
বয়সে রুমীর পড়াশোনার পরিধি দেখে তাঁর মেজ খালুর বাবা অভিভূত হয়ে বলেছিলেন,
‘গভীর জ্ঞানের অধিকারী এই ছেলে তো সিএসপি না হয়ে যায় না।’ উল্লেখ্য,
মেধাবী ছাত্র রুমী ১৯৬৮ সালে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল থেকে স্টার
মার্কসসহ মাধ্যমিক এবং ১৯৭০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে স্টার মার্কস নিয়ে
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ভর্তি হন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতেও তিনি ভর্তি হন।
শরীফ ইমাম ও জাহানারা ইমাম দুজনই রাজনীতিসচেতন হওয়ায় সব সময় দেশে কখন কী
ঘটছে, দেশ ও জাতি কোন দিকে যাচ্ছে, বাঙালি হিসেবে কোন পথ অবলম্বন করা
উচিত—এসব বিষয়ে আলোচনা করতেন এবং ছেলেদের সেই আলোচনায় অংশীদার করতেন। ফলে
ছোটবেলা থেকেই রুমীর মনে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, স্বাধীনতার
আকাঙ্ক্ষা বিষয়গুলো গেঁথে গিয়েছিল। রুমী খুব কম সময়ে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার
আদর্শ আত্মস্থ করে ফেলেন। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার
অভ্যাস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও আন্দোলনের ইতিহাস তিনি
আগ্রহ নিয়ে পড়তেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রজ্ঞা ও মেধাসম্পন্ন বন্ধুমহলের
সাহচর্যে এসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রুমীর জানা–বোঝার ভান্ডার আরও সমৃদ্ধ
হতে থাকে। বন্ধুমহলের আলোচনার বিষয়ে থাকত কার্ল মার্ক্স, অ্যাঙ্গেলস,
লেনিন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে নজরুল, আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব, গ্যারি
সোবার্স, রিচি বেেনা, ববি মুর, গর্ডন ব্যাংকস, এলভিস প্রিসলি, রোলিং
স্টোনস, রবিশঙ্কর, আলী আকবর খাঁ, আল্লারাখা, চে গুয়েভারা, যোগব্যায়াম,
জ্যোতিষ শাস্ত্র, সাম্প্রতিক ছবি এবং আরও নানাবিধ বিষয়। ১৯৭১ সালের ৩ মে
রুমী তাঁর মায়ের জন্মদিনে লিওন উরিসের লেখা মাইলা ১৮ বইটি উপহার দেন, যা
ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী। এক্সোডাস-এর বিখ্যাত লেখক লিওন উরিসের সব কটি বই
দিয়ে সমৃদ্ধ ছিল রুমীর নিজের লাইব্রেরি। দেশের চরম সংকটকালে মায়ের মনোবল
বাড়ানোর জন্য রুমী তাঁকে বইটি উপহার দেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শুরুতে
জার্মানি অতর্কিত আক্রমণ করে পোল্যান্ড দখল করে নেওয়ার পর সেখানে পোলিশ
ইহুদিদের ওপর নাৎসি বাহিনীর অমানুষিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে পোলিশরা যে
অসাধারণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তাকে কেন্দ্র করেই বইটির বিষয়বস্তু আবর্তিত।
জার্মানরা ইহুদিদের মানুষ বলে গণ্য করত না, যেমন পশ্চিম পাকিস্তানি
শাসকেরা বাঙালিদের মানুষ হিসেবে, মুসলমান হিসেবে গণ্য করত না। মাইলা ১৮-তে
বর্ণিত দেশ ও জাতির নাম বদলে দিলে তা ছিল অবিকল বাংলাদেশ আর বাঙালির
অবর্ণনীয় দুর্দশা আর বাঁচা–মরার লড়াইয়ের কাহিনি। ১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট
আনুমানিক রাত ১২টার দিকে রুমীকে তাঁর বাসভবন থেকে বাবা শরীফ ইমাম, ছোট ভাই
জামী, বন্ধু হাফিজ, চাচাতো ভাই মাসুমসহ পাকিস্তানি বাহিনী ধরে নিয়ে যায়।
কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে রুমী তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের কোনো কিছু স্বীকার
করতে নিষেধ করে দেন এবং সমস্ত দায়ভার নিজের ওপর নেন। বিষয়টি জানতে পেরে
ছেলের জন্য হাহাকার এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত জাহানারা ইমাম রুমীর বইয়ের আলমারি
খুলে হেনরি এলেগের জিজ্ঞাসা বইটি চোখের সামনে মেলে ধরেন, যেটা তাঁকে
কিছুদিন আগে রুমী পড়তে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আম্মা, যার ওপর টর্চার করা
হয়, খানিকক্ষণ পরে সে কিন্তু আর কিছু ফিল করে না। পরে যারা ওই টর্চারের কথা
শোনে বা পড়ে, তারাই বেশি ভয় পায়।’ রুমী আরও বলেছিলেন, শত্রুর হাতে ধরা
পড়ার পর কী কী উপায়ে তাদের টর্চার সহ্য করে নেওয়া যায়, কী কী পন্থায় টর্চার
সহনীয় করে মুখ বন্ধ রাখা যায়, সেই কথা। এ সম্বন্ধে তিনি ইপক্রেস ফাইল ও
আরও কয়েকটা বই তাঁর মাকে পড়তে দিয়েছিলেন। রুমী তাঁর নিজস্ব লাইব্রেরিতে
সংরক্ষিত বই থেকে পাওয়া জ্ঞানের আলোকে আগে থেকেই মানসিকভাবে নিজেকে তিল তিল
করে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গড়ে নিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সেক্টর
কমান্ডার খালেদ মোশাররফের অমর বাণী—‘কোনো স্বাধীন দেশ জীবিত গেরিলা চায় না;
চায় রক্তস্নাত শহীদ’। রুমী তাঁর মা-বাবার রাখা নাম সার্থক প্রমাণ করেন।
গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী ২০ বছর বয়সী রুমী স্বল্প সময়ের মধ্যেই
অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে হাজার হাজার আত্মোত্সর্গকারী তরুণের মতো
দেশবাসীকে পাকিস্তানি হায়েনাদের কবল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে নিরাময়কারীর
ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। রুমী বাঙালি তরুণসমাজকে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবেন
যুগযুগান্তরে। রুমীর ৬৫তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধা

No comments:
Post a Comment