![]() |
| অংসান সুচি শুধু সংগ্রামী নন,নেতৃত্বের বিচক্ষণতাও আছে তাঁর মধ্যে |
মিয়ানমার
আমাদের নিকট প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দেশটির সঙ্গে আমাদের বহুবিধ সম্পর্ক
রয়েছে। আছে তাদের সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে কৌতূহলও। গত বছরের নভেম্বরে
সেখানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই নির্বাচনে পার্লামেন্টের উভয়
কক্ষে ৭৫ শতাংশ আসনে ভোট হয়। এর ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়েছে দেশটির
অবিসংবাদিত নেত্রী অং সান সু চির ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)।
উল্লেখ্য, অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ আসন সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত। এত আসন নিয়ে
জেতার পরও দলনেত্রী সু চি প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি
সাংবিধানিক বিধিনিষেধের জন্য। ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়, অং সান সু চিকে
রাষ্ট্রের মূল নেতৃত্ব থেকে দূরে রাখতেই সামরিক শাসকেরা সংবিধানে এ
বিধিনিষেধ সংযুক্ত করেছে। কিন্তু তারা পারেনি সু চির দলের বিজয় ঠেকাতে।
তেমনি পারেনি তাঁর দলের প্রার্থীকে প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে
নির্বাচিত হওয়া থেকে বিরত রাখতে। অবশ্য সু চিও বিবেচনার পরিচয় দিচ্ছেন
প্রভাবশালী সামরিক বাহিনীর সঙ্গে এ পর্যায়েই কোনো সংঘাত থেকে দূরে থাকার
সিদ্ধান্ত নিয়ে। শুধু তা-ই নয়, ক্ষেত্রবিশেষে তিনি তাদের সহযোগিতা ও
সমর্থনের ওপর নির্ভর করছেন। উল্লেখ্য, এখনো সরকারের গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন
হয়নি। ৩০ মার্চ তা হওয়ার কথা রয়েছে। মিয়ানমার দেশটি অতীতে বার্মা নামে
পরিচিত ছিল। তার সাবেক রাজধানী দেশের প্রধান শহর ও সমুদ্রবন্দর ইয়াঙ্গুন
পরিচিত ছিল রেঙ্গুন নামে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ দেশটিতে শতাধিক জাতিসত্তার
বসবাস। এর সীমান্তে রয়েছে ভারত, বাংলাদেশ, চীন, লাওস ও থাইল্যান্ড। ২ লাখ
৬১ হাজার ২২৭ বর্গমাইলের এই বিশাল দেশটির জনসংখ্যা ২০১৪ সালের জনগণনা
অনুসারে পাঁচ কোটির কিছু বেশি। অবশ্য সেই জনগণনা নিয়ে বিতর্ক আছে। এতে
রোহিঙ্গাসহ বেশ কিছু জাতিসত্তাকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মাথাপিছু জিডিপি
১ হাজার ৪১৯ ডলার। তবে অর্ধশতাব্দীর অধিককালের সামরিক শাসনে ধনী-দরিদ্রের
ব্যবধান ব্যাপক বেড়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকেও পিছিয়ে আছে দেশটি। ১৮২৪
সালে দেশটি ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত হয়। স্বাধীন হয় ১৯৪৮ সালে। স্বাধীনতার
আগে আগেই ব্রিটিশ শাসিত বার্মার জাতীয়তাবাদী নেতা ও প্রধানমন্ত্রী অং সান
মাত্র ৩২ বছর বয়সে নিহত হন। তাঁকেই সে দেশটির স্বাধীনতার প্রাণপুরুষ রূপে
বিবেচনা করা হয়। তাঁরই মেয়ে অং সান সু চি ১৯৪৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
উচ্চশিক্ষিত ও সংগ্রামী এই নারী। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী। দীর্ঘ সংগ্রাম ও
অবর্ণনীয় ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে তিনি দেশটির সামরিক শাসন অবসানে
নেতৃত্ব দেন। শুধু সংগ্রামী নন, নেতৃত্বের বিচক্ষণতাও আছে তাঁর মধ্যে। তিনি
হয়তো ধারণা করেন, মিয়ানমারের জাতিগত বিরোধ দেশটির সংহতি বিপন্ন করতে পারে।
তাই দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর আকস্মিক সব বদলে দিলে সেসব বিরোধ মাথাচাড়া
দিয়ে উঠতে পারে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভের
পেরেস্ত্রোইকা (সংস্কার) ও গ্লাসনস্ত (উন্মুক্তকরণ) পরিণতি থেকেও তিনি
হয়তো শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। তাই চূড়ান্ত বিজয় হাতে নিয়ে ধীর অথচ দৃঢ়
পদক্ষেপে তিনি অগ্রসর হতে চাইছেন। ইন্দোনেশিয়ার সুহার্ত–পরবর্তী জামানার
সূচনায় ক্ষমতার অংশীদার ছিল সামরিক বাহিনী। এখন সেখানে তারা ক্ষমতার
অংশীদার নয়। এমনও হতে পারে, ১৯৯০-এর নির্বাচনে এনএলডির বিপুল বিজয়ের পর তা
সামরিক বাহিনী মেনে নেয়নি, সেটাও স্মরণে রেখেছেন। ২০১২ সালে একটি
নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে তিনি বিরোধী দলের নেতা হন। তখনই অবসান ঘটে সামরিক
শাসনের। তবে ক্ষমতা থেকে যায় সামরিক বাহিনীর হাতেই। আর এবার সরকারের
নিয়ন্ত্রণ যাচ্ছে তাঁর হাতে। সম্প্রতি নিবন্ধকারের মিয়ানমার ভ্রমণের সুযোগ
ঘটেছিল। তবে ভাষাবিভ্রাটের জন্য সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করে তাদের
মনোভাব বোঝার সুযোগ খুব কমই হয়েছে। ইংরেজি ভাষায় ভাঙাচোরাভাবেও বলতে পারেন
এমন লোক দেশটিতে কম। বাংলাদেশি এনজিও ‘আশার’ কার্যালয়ে গিয়ে এর নিষ্ঠাবান
কর্মকর্তাদের সঙ্গে কিছু আলোচনা হয়। গুটি কয়েক ইংরেজি জানা স্থানীয় লোকের
সঙ্গেও কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। তবে তাঁরা প্রায় সবাই অন্তর্মুখী। সহজে মুখ
খুলতে চান না। এটা স্বভাবগত, নাকি দীর্ঘ সামরিক শাসনের ফসল, বোঝা মুশকিল।
দীর্ঘকাল একটি জাতি নিয়ন্ত্রিত জীবন কাটালে স্বাধীন চিন্তাচেতনা লোপ না
পেলেও সুপ্ত থাকে। হয়তো তেমনটাই আছে সেখানে। জানতে পারলাম, ভোট হয়েছিল
শান্তিপূর্ণ। সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনব্যবস্থা ছিল ত্রুটিমুক্ত,
এটা জেনে ভালো লাগল। তাদের সমর্থিত দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, সেখানেও ভোট
গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ছিল না কোনো হস্তক্ষেপ। কিছু জনসভা হয়েছে, তবে ছিল না
কোনো পোস্টার, ব্যানার বা ফেস্টুন। ৭০ শতাংশের অধিক ভোটার ভোট দিয়েছেন।
গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থার প্রতিই তাঁদের সমর্থন। তবে ভোটের ফলাফল বা
সরকার গঠন নিয়ে কোনো উচ্ছ্বাস দৃশ্যমান নয় বা ছিল না। অং সান সু চির
ইয়াঙ্গুনের বাড়ির সামনে গিয়েছি। বাড়িটি মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের
তীর্থক্ষেত্র। কিন্তু কোনো লোকজনই নেই এর ধারেকাছে। অবশ্য সু চি এখন সরকার
গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে দেশের নতুন রাজধানী নেপিডোতে অবস্থান করছেন। ১৯৬২
সালে যে সামরিক শাসনের শৃঙ্খল পরানো হয় দেশটিকে, তার প্রকৃত অবসানের
ঘণ্টাধ্বনি বাজে ২০১৫ সালের নভেম্বরের নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার দিন। আমাদের
দেশে নব্বইয়ের স্বৈরাচারের পতনকে মানুষ যেভাবে উল্লাসের সঙ্গে বরণ করেছিল,
তেমন কিছুই ঘটেনি মিয়ানমারে। দীর্ঘ সামরিক শাসন দেশটিতে একরূপ শৃঙ্খলার
মধ্যে এনেছে। আইনশৃঙ্খলা–ব্যবস্থা ভালো। সবাই নিজকে নিরাপদ বোধ করার মতো
অবস্থায় রয়েছে সেখানে। তবে নিয়ন্ত্রণ সর্বত্র। জেলার নিচের প্রশাসনিক ইউনিট
টাউনশিপ। এক টাউনশিপের কোনো লোক অন্য টাউনশিপে গিয়ে রাত যাপন করলে
কর্তৃপক্ষকে জানাতে হয়। এমনকি জামাই শ্বশুরবাড়িতে গেলেও। এ–জাতীয় বিধান
শৃঙ্খলার নামে করা হলেও মানুষের মুক্ত চলাফেরার অধিকারের পরিপন্থী। এ ধরনের
অনেক বিধিনিষেধ রয়েছে তাদের সমাজব্যবস্থায়। স্বাধীন বিচার বিভাগ গড়ে তোলাও
একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মুক্ত চিন্তার সংবাদপত্র হয়তো গণতন্ত্র চলমান থাকলে
ধীরে ধীরে শাখা-প্রশাখা গজাবে। বিশাল দেশটির শাসনব্যবস্থা এককেন্দ্রিক।
সম্পদে পরিপূর্ণ অথচ দারিদ্র্যক্লিষ্ট জনগণকে ধীরে ধীরে উন্নত জীবনযাত্রার
স্বাদ দিতে না পারলে গণতন্ত্রের প্রতি তারা মোহ হারিয়ে ফেলবে। আর দেশটির
সম্পদের যথোপযুক্ত ব্যবহার ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তাদের
জীবনযাত্রা উন্নত করার সুযোগ রয়েছে ব্যাপক। মাইলের পর মাইল পড়ে থাকা
কৃষিজমিতে আবাদ হচ্ছে না সেচের অভাবে। অথচ নদীবহুল এ দেশটিতে সেচের
ব্যবস্থা করা সম্ভব। প্রয়োজনে আসবে বিদেশি বিনিয়োগ। শিল্প স্থাপনের জন্য
যথেষ্ট জমি ও কাঁচামালের সম্ভার রয়েছে তাদের। স্থানীয় উপযুক্ত উদ্যোক্তা
শ্রেণির তেমন প্রসার ঘটেনি। তবে বিদেশি উদ্যোক্তারা ধীরে ধীরে আসছে। চাইছে
মুক্ত পরিবেশ। এগুলোর সমন্বয় করা গেলে কৃষি ও শিল্পে জোয়ার আসবে। ঘটবে
ব্যাপক কর্মসংস্থান। জনগণের পাশাপাশি সরকারের আয়ও বাড়বে। উপযুক্ত গণমুখী
করনীতি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করতে কিছুটা সহায়ক হবে। গণতন্ত্র এমন একটি
সমাজব্যবস্থা, যার রক্ষাকবচ একমাত্র জনগণের হাতে। জনগণ সতর্ক ও সচেতন না
থাকলে এ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। মিয়ানমার আমাদের নিকট প্রতিবেশী একটি দেশ।
আমরা যেমন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী, তারাও তা–ই বলে অন্তত ভোটে
প্রমাণ দিয়েছে। সংগ্রামী নেত্রী অং সান সু চি জাতিগত বিষয়ে ভোটের রাজনীতিই
করেন। বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন তিনি। তবে এখন তিনিই দেশটির কান্ডারি। নতুন
সরকারের মন্ত্রী হচ্ছেন বলে জানা যায়। আর দলের কর্তৃত্বেও থাকছেন। তাঁদের
সাফল্য কামনা করে এ দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ। তবে দীর্ঘকাল পরে গণতন্ত্রের
পথে অগ্রসরমান একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্ছ্বাস লক্ষ না করে বিস্মিত ও কিছুটা
হতাশ হয়েছি। এতে ধারণা করা অসংগত নয় যে গণতন্ত্রের পালে এখনো হাওয়া
লাগেনি। কামনা রইল, এটা শিগগিরই লাগবে। আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক
মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

No comments:
Post a Comment