Wednesday, March 23, 2016

নীরবে-সরবে জাল ভোট by অরূপ দত্ত

ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের
মীরাবাড়ির বড় কৈবর্তপুর সরকারি প্রাথমিক
বিদ্যালয় কেন্দ্রে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার
দিকে ক্ষমতাসীন দল মনোনীত চেয়ারম্যান
প্রার্থীর সমর্থকেরা উন্মুক্ত স্থানে জাল ভোট দিচ্ছেন
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রথম দফায় গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঝালকাঠি সদর উপজেলার নবগ্রামে একটি কেন্দ্রে দুই ইউপি সদস্য প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। সংঘর্ষে এক প্রার্থীর ভাই নিহত হয়েছেন।
ঝালকাঠির চার উপজেলার ৩১টি ইউনিয়নের বেশির ভাগ কেন্দ্রে ভোট জালিয়াতি হয়েছে নীরবে। কিছু কেন্দ্রে প্রকাশ্যেই জাল ভোট দিতে দেখা গেছে। বিএনপির পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সকালেই কয়েকটি কেন্দ্র বন্ধ করে পরে আবার চালু করা হয়।
ঝালকাঠি ও রাজাপুরের চারটি কেন্দ্রে প্রকাশ্যে জাল ভোট দিতে দেখা যায়। আতঙ্কে অনেক ভোটার কেন্দ্র ছেড়ে চলে যান। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনেও বাধা দেন।
সদর উপজেলার নবগ্রামের কালিয়ান্ধার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের কাছে ইউপি সদস্য পদপ্রার্থী সজীব হোসেন ও চুন্নু শিকদারের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এতে চুন্নু শিকদারের ভাই আবুল কাশেম শিকদার (৫৫) নিহত হন।
ঝালকাঠির পুলিশ সুপার সুভাষ চন্দ্র সাহা প্রথম আলোকে বলেন, কেন্দ্রের বাইরে এ ঘটনা ঘটেছে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও বেশির ভাগ কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ হয়েছে।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিটি কেন্দ্রেই ভোট কারচুপি হয়েছে। তাঁদের অনেক কর্মীকে আহত করা হয়েছে। আটকও করা হয়েছে অনেককে। তাঁরা প্রহসনের নির্বাচন বর্জন করছেন। সঙ্গে পুনর্নির্বাচনের দাবি করেছেন।
একটি কেন্দ্রের চিত্র: বেলা ১১টার দিকে রাজাপুর সদর ইউনিয়নের মীরাবাড়ির বড় কৈবর্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কর্মী ও পোলিং এজেন্টরা প্রকাশ্যে জাল ভোট দিতে গেলে বিএনপি প্রার্থীর কর্মীরা বাধা দেন। পরে দুই পক্ষের কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতি ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। এর আগে পৌনে ১১টার দিকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আনোয়ার হোসেন মৃধা কেন্দ্রে এসে কর্মীদের সঙ্গে ‘ভালোভাবে’ কাজ করতে বলেন। তিনি চলে যাওয়ার পরপরই আওয়ামী লীগের একজন স্থানীয় নেতা ভোটারদের বলেন, তাঁদের টেবিলে আওয়ামী লীগের ব্যালট পেপারে সিল দিয়ে তারপর বাক্সে ফেলতে হবে। কিছুক্ষণ ধরে তা-ই চলতে থাকে।
দুই দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার সময় ভোটার, বিশেষ করে নারী ভোটাররা দিগ্বিদিক ছুটতে থাকেন। পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পুলিশ চারটি ফাঁকা গুলি ছোড়ে।
বেলা সোয়া ১১টার দিকে কেন্দ্রের বেগম রোকেয়া কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের একজন প্রার্থীর পক্ষে পোলিং এজেন্ট মো. আমানত ব্যালট পেপারে সিল মারছেন এবং বাক্সে ফেলছেন।
কিছুক্ষণের মধ্যে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আনোয়ার হোসেন মৃধা কেন্দ্রে আসেন। তিনি চলে যাওয়ার পর কেন্দ্রে আবার জাল ভোট শুরু হয়। ছাত্রলীগের তিনজন কর্মীকে বারবার কক্ষে ঢুকে জাল ভোট দিতে দেখা যায়।
বেলা দেড়টার দিকে ব্যাপক জাল ভোটের ঘটনা ঘটলে বিএনপির কর্মীরা আবারও কেন্দ্রে আসেন। এ সময় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ পাঁচটি গুলি ছোড়ে। বেলা দুইটার দিকে দায়িত্ব পালনকালে ডেইলি স্টার-এর ঝালকাঠি প্রতিনিধি জহিরুল ইসলামের হাত থেকে তাঁর ব্যবহৃত ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলেন এক ছাত্রলীগ নেতা। এর আগে তিনি ডেইলি স্টার প্রতিনিধিকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন।
অন্যান্য কেন্দ্র: বেলা দুইটার দিকে রাজাপুরের আগলি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দিতে শুরু করেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজাপুর মাঝিবাড়ি কেন্দ্রে সংঘর্ষ বাধলে আধা ঘণ্টা ভোট গ্রহণ বন্ধ থাকে।
সকাল সোয়া নয়টার দিকে ঝালকাঠি সদরের বেশাইন খান শহীদ স্মৃতি মাধ্যমিক বিদ্যানিকেতন কেন্দ্রে জাল ভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আবদুশ শুক্কুর মোল্লা ও বিএনপির প্রার্থী রাজা নাসিরের সমর্থকদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। এ সময় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে লাইনে দাঁড়ানো নারী ভোটাররা কেন্দ্র ছেড়ে চলে যান।
নলছিটি উপজেলায় বেশির ভাগ কেন্দ্রে জাল ভোট হয়েছে। উত্তর তিমিরকাঠিতে জাল ভোটকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। দপদপিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়।

No comments:

Post a Comment