Wednesday, March 23, 2016

৫০০ সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি by সামছুর রহমান ও মুসা আহমেদ

দীর্ঘদিন ধরে কেটে রাখা
হয়েছে রাস্তা, পথচারী
এলাকাবাসীর ভোগান্তির শেষ নেই।
ছবিটি সায়েদাবাদ এলাকা থেকে তোলা

কোথাও চলছে পয়োনিষ্কাশনের সংযোগ প্রশস্ত করা, আবার কোথাও চলছে ওয়াসার পানি সরবরাহের নতুন সংযোগ বসানোর কাজ। প্রতিবছর বর্ষা আসার আগমুহূর্তে শুরু হয় এভাবে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি। এ বছরও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থা রাজধানীজুড়েই চালাচ্ছে খোঁড়াখুঁড়ি। এতগুলো সড়ক একযোগে খোঁড়ায় নগরবাসীর ভোগান্তি বেড়েছে।
বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) চার শতাধিক সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি ও সংস্কারকাজ চলছে। সিটি করপোরেশন ছাড়াও ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা), বিটিসিএল, তিতাস, ডেসকো সড়কের নিচে থাকা সংযোগ সংস্কার করতে সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি করছে। তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় এখন তুলনামূলক কম সড়কে সংস্কারকাজ চলছে। ডিএসসিসির প্রায় ৮০টি সড়কে সংস্কারকাজ চলছে।
কিছু শর্ত সাপেক্ষে অন্যান্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে সড়ক খননের অনুমতি দিয়ে থাকে সিটি করপোরেশন। সড়ক অন্য সংস্থা খুঁড়লেও তা সংস্কারের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শেষ না হওয়ায় অন্য সংস্থাগুলো বারবার সিটি করপোরেশনের কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন করে। আবার অন্য সংস্থাগুলো খোঁড়া শেষে সিটি করপোরেশনকে বুঝিয়ে দিলেও তা সময়মতো সংস্কার করা হয় না।
দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছর নগরের জলাবদ্ধতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে নির্বাচিত মেয়রদের। তাই জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে সিটি করপোরেশন, যার ধারাবাহিকতায় শুরু হয়েছে উন্নয়নকাজ। যেসব এলাকায় বেশি জলাবদ্ধতা হচ্ছে, সেসব এলাকায় পানিপ্রবাহের নালা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে, যাতে বৃষ্টির পানি সড়কে জমে না থেকে দ্রুত নিষ্কাশন হয়।
ডিএনসিসি ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সড়ক উন্নয়ন ও খনন বাবদ খরচ করে প্রায় ১৭০ কোটি টাকা। এই খাতে ডিএসসিসিও প্রায় সমপরিমাণ টাকা ব্যয় করে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সড়ক সংস্কার ও খনন বাবদ ডিএনসিসি বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ২১০ কোটি টাকা। আর ডিএসসিসির বাজেটে এ বাবদ বরাদ্দ আছে ১৭০ কোটি টাকা।
ডিএনসিসির বিভিন্ন আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উত্তরা ও খিলক্ষেত এলাকার অর্ধশতাধিক সড়কে ডিএনসিসি সংস্কারকাজ করছে। এর পাশাপাশি ডেসকো উত্তরা ৩, ৬ ও ৭ নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি চালাচ্ছে। ডিএনসিসির অঞ্চল-২ (মিরপুর) ৯৬টি সড়কে কাজ চলছে। গুলশান, বনানী, বারিধারা এলাকায় ৭০টির মতো সড়কে ডিএনসিসির কাজ চলছে। এই এলাকাগুলোতে অনেক সড়ক খুঁড়েছে ওয়াসা।
এ ছাড়া গাবতলী, কল্যাণপুর, কাফরুল এলাকার ৯৪টি সড়কে সংস্কারকাজ চলছে। মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, রাজাবাজার এলাকার শ খানেক সড়কে চলছে উন্নয়নের খোঁড়াখুঁড়ি।
সরেজমিনে দেখা যায়, কল্যাণপুর এলাকায় গত ডিসেম্বর মাস থেকে সড়ক খোঁড়ে ওয়াসা। ওয়াসার কাজ প্রায় সমাপ্ত হওয়ার পরে ১৫ দিন ধরে নতুন করে একই সড়ক খুঁড়ছে ডিএনসিসি। একই সড়ক কয়েক দিনের ব্যবধানে দুবার খোঁড়ায় ভোগান্তিতে পড়েছে এলাকাবাসী। গুলশান অ্যাভিনিউ ও বনানীর রাস্তাগুলোতে দেখা যায়, ‘রাস্তা বন্ধ। বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করুন’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে উন্নয়নকাজ চলছে। বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউর দুই পাশেই খোঁড়াখুঁড়ি চলছে।
কল্যাণপুর নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা সিদ্দিকী আহমেদ বলেন, একটা সড়কে কত দিন ধরে কাজ চলে আর কতবার খুঁড়ে। তিন-চার মাস ধরে খোঁড়াখুঁড়িই চলছে। একবার ওয়াসা কেটে গেছে, তার কয়েক দিন পরেই সিটি করপোরেশন কাটছে। জনগণের দুর্ভোগ দেখার কেউ নেই।’
ডিএসসিসির প্রকৌশল দপ্তর জানায়, বর্তমানে বনশ্রী, মেরাদিয়া, মুগদা, আরামবাগ, বাসাবো, গোড়ান, শাহজাহানপুর, হাজারীবাগ, রায়েরবাজার, সুলতানগঞ্জ, জিগাতলা, লালবাগ, আজিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৭৬টি সড়কে পয়োনিষ্কাশন ও পানির লাইন সংস্কারে কাজ করছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। নির্ধারিত সময়ে মাত্র ১০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ শেষ করেছে। খোঁড়াখুঁড়ির পর ১৬টি সড়কের মেরামতের কাজ চলছে। বাকি সব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দ্বিতীয় দফায় সময় বাড়াতে ডিএসসিসির কাছে আবেদন করেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নীলক্ষেত মোড় থেকে বিডিআর সদর দপ্তর, চাঁদনী চক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সড়কে প্রায় এক মাস ধরে সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি করছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। এসব এলাকায় মাটি, বালুসহ নির্মাণসামগ্রী সড়কে ছড়িয়ে আছে। প্রায় একইভাবে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে বংশাল এলাকার বিভিন্ন সড়কে। এই এলাকার অধিকাংশ সড়ক সরু হওয়ায় সারাক্ষণই যানজট লেগে থাকছে।
এ ছাড়া দৈনিক বাংলা মোড় থেকে পুরানা পল্টন, সচিবালয়ের উত্তর ও পশ্চিম পাশের সড়কে ড্রেন সংস্কারের কাজ চলছে। খোঁড়া সড়ক, মেরামতের জন্য পিচ-সুরকি ভেঙেচুরে রাখা ও পানি জমে পিচ্ছিল হয়ে থাকায় ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে পথচারীরা।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বলছে, বর্ষা মৌসুমের আগেই কাজ শেষ করা হবে। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এ বিষয়ে ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাঈদ আনোয়ারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, একটি সড়ক যাতে একবারই খোঁড়া হয়, সে ব্যবস্থা করতে সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হচ্ছে।
কোনো সড়ক খোঁড়ার আগে সিটি করপোরেশন অন্য সংস্থাগুলোকে চিঠি দিয়ে জানাচ্ছে। অন্য সংস্থার কাজ থাকলে যেন একই সময়ে করে নেয়। আগামী ৩০ মের মধ্যে সব সড়কের উন্নয়নকাজ শেষ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

No comments:

Post a Comment