Saturday, April 9, 2016

গণপরিবহনে ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য

গণপরিবহনে দেদারসে যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় হচ্ছে। দফায় দফায় ভাড়া বাড়লেও কিছুতেই থামছে না এ নৈরাজ্য। রাজধানীর রুট, পরিবহন সংস্থা, মালিক, বাস-মিনিবাস, এমনকি গাড়ির সহকারীভেদে একই দূরত্বে আদায় করা হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন ভাড়া। প্রায় সব বাস-মিনিবাসে সেবার মান না থাকলেও নানা কায়দায় যাত্রীর এই পকেটকাটা চলছেই। প্রতিটি রুটে কয়েক টাকা থেকে শুরু করে তিনগুণ পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। এ নিয়ে প্রতিদিনই যাত্রীর সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়ছে পরিবহন শ্রমিকরা। তা রূপ নিচ্ছে মারামারিতে, অপ্রীতিকর ঘটনায়। এ নিয়ে যাত্রী প্রতিনিধিত্বহীন রাজধানীর ঢাকা মেট্রো আরটিসির ও বিআরটিসির তৎপরতাও দৃশ্যমান নয়।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করে স্বয়ং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, আসলে ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের রুটগুলোতে চলাচলকারী বাসগুলোতে বিশৃঙ্খলা রয়েছে। অনেকেই একই দূরত্বে বিভিন্ন বা বাড়তি ভাড়া আদায় করছে। এ বিষয়ে মালিক সমিতির পক্ষ থেকেও অনেক সময় একাধিক চালক ও সহকারীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একাধিক পরিবহন মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দকে সরিয়ে দেয়া বা কমিটিও ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর ৭০ ভাগ সিটিবাস সর্বনিম্ন ভাড়া আদায় করছে ১০ টাকা। ২০ ভাগ গাড়ি আদায় করছে ১৫ থেকে ২০ টাকা। অর্থাৎ কেবলমাত্র ১০ ভাগ গাড়িই নিয়ম অনুযায়ী ৫ বা ৭ টাকা সর্বনিম্নভাড়া আদায় করছে।
রাজধানীর ভেতরে ও আশপাশের জেলাগুলোতে চলাচলকারী প্রতিটি রুটেই প্রায় সব বাস ও মিনিবাসই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। বর্তমানে প্রথম তিন কিলোমিটার দূরত্বে মিনিবাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ ও বড় বাসে ৭ টাকা। কিন্তু বাস্তবে প্রকাশ্যে ছাপানো টিকিটের মাধ্যমেই দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ অতিরিক্ত ভাড়া হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। নেয়া হচ্ছে টিকিট ছাড়াও। রাজধানীর গুলিস্তান থেকে মুন্সীগঞ্জ সদরের ভাড়া ৪২ টাকা। কিন্তু এই দূরত্বে কুসুমপুর পরিবহনের বাস আদায় করছে ৫০ টাকা ভাড়া। আবার একই দূরত্বে দিঘীরপাড় ট্রান্সপোর্ট পরিবহন লিমিটেডের বাস একইভাবে টিকিট দিয়ে আদায় করছে ৬০ টাকা। সমান দূরত্বে এম.মল্লিক পরিবহনের বাস নিচ্ছে ৭০ টাকা। অপর রুটে গুলিস্তান থেকে নারায়ণগঞ্জের ভাড়া ২২ টাকা। আনন্দ পরিবহনের বাস ওই ন্যায্য ভাড়া আদায় করলেও একই দূরত্বে হিমাচল পরিবহনের বাস আদায় করছে ১৪ টাকা বেশি। ৩৬ টাকা। গুলিস্থান থেকে মরিচার ভাড়া ৩৬ টাকা হলেও যমুনা এক্সপ্রেসের বাস আদায় করছে ৫০ টাকা। একই দূরত্বে দি দোয়েল বাস আদায় করছে ৪৭ টাকা। গুলিস্তান থেকে রায়েরবাগের ভাড়া ১১ টাকা। কিন্তু মেঘনা ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির বাস আদায় করছে প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া। ২০ টাকা। গুলিস্তান থেকে সোনারগাঁও পর্যন্ত ২৬ টাকা হলেও স্বদেশ ট্রান্সপোর্টের বাস আদায় করছে ৪০ টাকা। গুলিস্তান থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ৩২ টাকা ভাড়ার স্থলে হিমাচল বাস আদায় করছে ৩৬ টাকা। একই স্থান থেকে রূপসী পর্যন্ত গ্লোরী এক্সপ্রেসের বাস আদায় করছে ৩০ টাকা। অথচ এই দূরত্বে প্রকৃত ভাড়া ১৮ টাকার বেশি হওয়ার নয়। আর এই গাড়ি গুলিস্তান থেকে গাউসিয়া পর্যন্ত ২২ টাকার ভাড়ায় আদায় করছে ৩০ টাকা। গুলিস্তান থেকে আদমজি পর্যন্ত ১৮ টাকার স্থলে কোমল মিনিবাস আদায় করছে ৩০ টাকা। একই স্থান থেকে মিরপুর-১২ পর্যন্ত ২২ টাকার ভাড়ায় স্বাধীন এক্সপ্রেস নিচ্ছে ৩০ টাকা। হিমাচল বাস নিচ্ছে ২৫ টাকা। একই দূরত্বে বিকল্প অটো সার্ভিস নিচ্ছে ২৪ টাকা ভাড়া। রাজধানীর সায়েন্সল্যাব থেকে মৎস্যভবন পর্যন্ত ভাড়া ৭ টাকা। সেখানে তরঙ্গপ্লাস বাস নিচ্ছে প্রায় চারগুণ ভাড়া। ২৫ টাকা। অথচ গুলিস্তান থেকে সায়েন্সল্যাব পর্যন্ত ইটিসিএল ভাড়া নিচ্ছে ১২ টাকা। তাও ন্যায্য ভাড়ার চেয়ে দু’টাকা বেশি।
শুধু তাই নয়। বিআরটিএ বাসও থেমে নেই। এই সুযোগে সমানে আদায় করছে বাড়তি ভাড়া। গুলিস্তান থেকে আরিচাঘাট পর্যন্ত ভাড়া ৬০। বিআরটিএ বাস আদায় করছে ১০০ টাকা। এর আগে আদায় করতো ৮০ টাকা। তখন ২০ টাকা বেশি ভাড়া নেয়ার জন্য স্বয়ং যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিআরটিএর বাসকে শোকজ করেছিলেন। তাতে রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানটির অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে কোনো সংশোধন তো আসেইনি। বরং এরপরই অতিরিক্ত ভাড়া আরও ২০ টাকা বেড়েছে। এখন আদায় হচ্ছে ১০০ টাকা। এসি বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে আড়াই টাকা। সে হিসেবে গুলিস্তান থেকে ফার্মগেটের ভাড়া ১৫ টাকা। কিন্তু বিআরটিএর এসি বাস এই দূরত্বে দ্বিগুণের বেশি ৩৫ টাকা ভাড়া নিচ্ছে। 
এতো গেল প্রকাশ্য টিকিট দিয়ে বাড়তি ভাড়া আদায়ের মহোৎসব। রাজধানীতে টিকিট ছাড়া পরিবহন সেবাদানকারী বাসগুলোও একইভাবে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে। এ নিয়ে প্রতিদিনই গাড়ির সহকারীরা যাত্রীদের সঙ্গে ঝগড়ায় লিপ্ত হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকা শহরের ১৭ নম্বর রুট। মতিঝিল থেকে মিরপুর ১২। এই রুটে যাত্রী পরিবহন করে মিনিবাস ঢাকা মেট্রো ব ১-২৬০২ নম্বর গাড়ি। চালক জুয়েল। সহকারী মাহফুজ মির্জা। গত বুধবার গাড়ির ভাড়া তোলার সময় মাঝে মাঝেই সহকারী মাহফুজের সঙ্গে যাত্রীদের বাগবিতণ্ডা হচ্ছিল। ‘কেন বেশি ভাড়া নিচ্ছো’ ইত্যাদি ইত্যাদি। একপর্যায়ের একই প্রতিবেদকের জিজ্ঞাসার জবাবে মাহফুজ মির্জা বলেন, আমরা ২৮ বা ৩০ টাকা ভাড়া নিয়ে থাকি। তবে কিছুদিন আগেও ২৫ টাকা নেয়া হতো।
চালক জুয়েল বলেন, শুধু কী আমরা? অন্যরাও একইভাবে ভাড়া নিচ্ছে। বিআরটিএর বাসও তো ২৫ টাকা ভাড়া আদায় করছে। মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ টাকা হলেও কেন বড় বাসের ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায় করছেন তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, মিনিবাস হলেও আমারটা বড় বাস হিসেবে তালিকাভুক্ত।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজ্জাম্মেল হক চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, গণপরিবহনে নানা নৈরাজ্য বিরাজ করছে। গাড়িগুলোতে দূরত্ব ও ভাড়ার তালিকা না টানিয়ে নীরবে একই দূরত্বে বাড়তি ভাড়া আদায় হচ্ছে। অতিরিক্ত ভাড়া তো রয়েছেই। সাধারণ যাত্রীরা এর প্রতিবাদ করলেই হয়রানির শিকার হচ্ছেন। কিন্তু বিআরটিএ বলেন, আরটিসি বলেন সবাই মালিক সমিতির স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত। কেউ যাত্রীর কথা ভাবে না।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ও ঢাকা মেট্রো আরটিসির সভাপতি মো. আছাদুজ্জামান মিয়া মানবজমিনকে বলেন, গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণ করে থাকে বিআরটিএ। তবু নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি বা একই দূরত্বে বিভিন্ন ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো যাত্রী বা পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি আমি এখনই শুনছি।

No comments:

Post a Comment