Thursday, April 28, 2016

আগামী বর্ষপূর্তিতে কী লিখব মশিউল আলম

গত ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির তিন বছর পার হলো। এ উপলক্ষে সংবাদমাধ্যমে অনেক লেখালেখি হলো, অনেক আলোচনা হলো, প্রবল আবেগের প্রকাশ ঘটল। কিন্তু দুদিনের মধ্যেই সে আবেগ হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। এর মধ্যে দেশে কত কিছু ঘটছে: একের পর এক মানুষ খুন হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ মানুষের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়ে বলছে, সবাইকে নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই নিশ্চিত করতে হবে। এভাবে একটার পর একটা ইস্যু আসতে থাকবে; আগের ইস্যু চলে যাবে পরের ইস্যুর আড়ালে। এভাবে আমরা আগামী এক বছর রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির কথা ভুলে থাকব। তারপর, যখন ২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল আসবে, তখন আবার আমাদের মনে পড়বে। সংবাদমাধ্যম সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেবে, চার বছর আগে ঠিক এই দিনে সাভারে রানা প্লাজা নামে এক বহুতল বাণিজ্যিক ভবন ধসে পড়েছিল কয়েক হাজার মানুষের ওপর। সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মর্মান্তিকভাবে মারা গিয়েছিলেন ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমজীবী নারী-পুরুষ। জীবিত উদ্ধার করা গিয়েছিল ২ হাজার ৪৩৮ জনকে, তাঁদের অনেকেই বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারিয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন। আহত ব্যক্তিদের ৫৮ শতাংশ এমন তীব্র মানসিক আঘাত পেয়েছেন, যা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি, বিভিন্ন রকমের মানসিক সমস্যায় তাঁরা ভুগছেন। আমি নিশ্চিত, ঠিক এই কথাগুলোই আগামী বছর আবারও সংবাদমাধ্যমে লেখা হবে। আমরা এই ট্র্যাজেডির তিন বছর সদ্যই পার করলাম। কিন্তু এতগুলো মানুষের মৃত্যু ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারানোর জন্য যাঁরা দায়ী, তাঁদের বিচারকাজ এখনো শুরুই করতে পারিনি। দুর্ঘটনার পরপর দেশে-বিদেশে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি রুল দিয়েছিলেন। সেই রুলের শুনানির একপর্যায়ে আদালত মন্তব্য করেছিলেন, রানা প্লাজা ধসের ঘটনা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটা একটা ফৌজদারি অপরাধ। এ ঘটনার জন্য যাঁরা দায়ী, আইন অনুসারে তাঁদের ফৌজদারি অপরাধের বিচার হতে হবে। আদালতের স্বতঃপ্রণোদিত রুল ছাড়াও হাইকোর্টে চারটি রিট আবেদন করা হয়েছিল আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টসহ (ব্লাস্ট) কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে।
মূল ঘটনার আইনি প্রতিকারের জন্য দুটি মামলা করা হয়েছে। শিল্প দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের পরিকল্পিতভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে—এই অভিযোগে একটি মামলা করা হয়েছে রানা প্লাজার মালিক ও বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। ইমারত নির্মাণের বিধিমালা লঙ্ঘন করে রানা প্লাজা নির্মাণ করা হয়েছে—এই অভিযোগেও আরেকটি মামলা করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ তিন বছরেও কোনো মামলারই বিচারকাজ শুরু হয়নি। তদন্ত শেষ হয়েছে অনেক আগে, অভিযোগপত্রও দাখিল করতে যদিও অনেক সময় লেগেছে, তবুও শেষ পর্যন্ত তা করা হয়েছে। কিন্তু আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন ও মামলার বিচারকাজ শুরু হয়নি। আজ ২৮ এপ্রিল বিচারিক আদালতে দুটি মামলারই আসামিদের উপস্থিত হওয়ার কথা, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হবে কি না, এ বিষয়ে শুনানির জন্য নতুন দিন ধার্য করার সম্ভাবনা রয়েছে আজ। বিচারকাজে এমন দীর্ঘসূত্রতাকে বিচারহীনতার নামান্তর বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান। কয়েক দিন আগে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অবহেলার কারণে, অনিয়মের কারণে এতগুলো মানুষের প্রাণ গেল, এটা তো ফৌজদারি অপরাধ। কিন্তু এমন একটা অবস্থা তৈরি করা হয়েছে যেন কিছুই হয়নি। এই ভাবলেশহীন মনোভাবের কারণ বোধ করি এটাই যে, যাঁরা অপরাধী, তাঁরা মালিকপক্ষ এবং ধনী। আর যাঁরা মারা গেছেন, তাঁরা অসহায় ও দরিদ্র। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি ধনীদের পক্ষে থাকবে?
এটা খুব স্পষ্ট যে আসামিপক্ষ অত্যন্ত প্রভাবশালী বলেই মামলা দুটির বিচারকাজে এত বিলম্ব হচ্ছে। তা ছাড়া মামলার নথিপত্র কতটা শক্ত যুক্তির ওপর দাঁড় করানো হয়েছে, সেটাও দেখার বিষয়। শুধু মামলা করলেই তো ন্যায়বিচার পাওয়া নিশ্চিত হয় না। ন্যায়বিচার পেতে হলে মামলায় জিততে হবে, সে জন্য অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মামলা লড়তে হবে। ‘শিল্প দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের পরিকল্পিতভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে’—এ রকম অভিযোগ করে যে মামলাটি করা হয়েছে, সেটা আদালতে সত্য বলে প্রমাণ করতে হবে। রানা প্লাজা ধস নিঃসন্দেহে একটা দুর্ঘটনা, দুর্ঘটনা সাধারণত পরিকল্পিত হয় না। বাদীপক্ষ আদালতে কীভাবে প্রমাণ করবে যে পরিকল্পিতভাবে ওই দুর্ঘটনা ঘটিয়ে এতগুলো শ্রমিককে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ভবনটি নির্মাণের ক্ষেত্রে ইমারতবিধি লঙ্ঘন, ভবনটিতে ফাটল দেখা দেওয়ার পরেও শ্রমিকদের ওই ভবনে কাজ করতে বাধ্য করা—এসব অভিযোগ প্রমাণ করা যতটা সহজ হবে, ‘পরিকল্পিতভাবে’ মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণ করা ততটা সহজ হবে না। অবশ্য এসব বিষয় আইনজ্ঞরাই ভালো বুঝবেন। আমাদের বক্তব্য হলো, বাদীপক্ষকে এমন জোরালো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতে হবে, যেন আদালত অভিযোগের সত্যতা দেখতে পান, দণ্ড দেওয়ার পক্ষে যুক্তি খুঁজে পান। রানা প্লাজা ধসের ব্যাপারে আরেকটি মামলাও এক বছর ধরে আদালতে আটকে রয়েছে এবং সেটাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সেটা ক্ষতিপূরণের মামলা। এখানে উল্লেখ করা দরকার, রানা প্লাজা ধসের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পরিবারগুলো দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে অর্থ পেয়েছেন। কিন্তু শ্রমিকদের প্রতিনিধিরা সে অর্থকে ‘ক্ষতিপূরণ’ হিসেবে মানতে রাজি নন। তাঁরা সেটাকে বলছেন ‘অর্থ-সহায়তা’। ক্ষতিপূরণ বিষয়ে আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি রুল জারি করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতির মাত্রা ও ক্ষতিপূরণের হার নির্ধারণের জন্য একটা উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। সরকার তেমন একটা কমিটি গঠন করেছিল এবং সেই কমিটি ক্ষতির মাত্রা ও ক্ষতিপূরণের হার নির্ধারণ করে একটা প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে। কিন্তু ওই প্রতিবেদনের ওপর শুনানি এক বছর ধরে হাইকোর্টে আটকে আছে। রানা প্লাজা ধসে হতাহত ব্যক্তিদের অধিকাংশই তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিক। ক্ষতিপূরণের মামলায় পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ যে অবস্থান নিয়েছে, তা অমানবিক। মালিকদের বক্তব্য হলো: হতাহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী। সেখানে দুর্ঘটনায় নিহত একজন শ্রমিকের পরিবারকে মাত্র এক লাখ টাকা এবং স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন এমন আহত শ্রমিককে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান আছে। পোশাকমালিকেরা আরও মনে করে, হতাহত ব্যক্তিদের ইতিমধ্যে যে ‘ক্ষতিপূরণ’ দেওয়া হয়েছে, তা বাংলাদেশের মানদণ্ডের তুলনায় অনেক বেশি। বলাই বাহুল্য, পোশাকমালিকদের এই অবস্থান অন্তত মর্মপীড়াদায়ক, এর মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের প্রতি তাঁদের সংবেদনশীলতার প্রকট অভাব ফুটে উঠেছে। তাঁরা সম্ভব শ্রমিকদেরকে কাজের হাতিয়ার ছাড়া অন্য কিছু ভাবেন না। শ্রমিকেরা যে মানুষ—এই উপলব্ধি থাকলে তাঁরা এমন অমানবিক অবস্থান নিতে পারতেন না।
এ পর্যন্ত যা লেখা হলো, এক বছর পর, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির চতুর্থ বর্ষপূর্তিতেও হয়তো তারই পুনরাবৃত্তি করতে হবে। কিন্তু আমরা তা করতে চাই না। আমরা চাই, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির জন্য যাঁরা দায়ী, তাঁদের বিচার অতি দ্রুত সম্পন্ন করা হোক। এই ঘটনার আইনি প্রতিকার না হলে ভবিষ্যতের এর চেয়েও বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে।

No comments:

Post a Comment