Thursday, April 28, 2016

বেডরুম বা ‘ঘরে ঘরে’ পাহারা! by এ কে এম জাকারিয়া

‘ঘরে ঘরে’ পাহারা দেওয়ার বিষয়টি জনগণ পুলিশের কাছ থেকে আশা করে না
নিজের শোবার ঘরে সাগর-রুনি খুন হওয়ার পর আলোচনায় এসেছিল ‘বেডরুম পাহারা’ দেওয়া না-দেওয়ার বিষয়টি। বেডরুম পাহারা নিশ্চয় দেওয়া যায় না, কিন্তু বেডরুমে কেউ খুন হলে অন্তত খুনিদের খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি করা যায়। দুনিয়াজুড়ে দেশে-দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তাদের গোয়েন্দা বিভাগগুলো তা-ই করে। সাগর-রুনির মতো খুনের ঘটনা না হয় ঠেকানো যায় না বা যায়নি, কিন্তু খুনিদের চিহ্নিত বা ধরার কী হলো? ওই খুনের পর চার বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, আমরা এখনো শুধুই জানি যে ওই দুজন খুন হয়েছেন, কিন্তু এ খুনের সঙ্গে যেন কোনো খুনি নেই! গত সোমবার কলাবাগানে বাসায় ঢুকে দুজনকে কুপিয়ে মেরে ফেলার পর পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) মুখে আবার একই ধরনের কথা শোনা গেল, ‘আমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির সেন্স অব সিকিউরিটি থাকতে হবে। তাঁর নিজের নিরাপত্তা, তাঁর প্রতিবেশীর নিরাপত্তা, এলাকার নিরাপত্তা—এটা শুধু আমরা ঘরে ঘরে পাহারা দিয়ে পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পারবে না। নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা, বলয় তৈরি করতে হবে। আমাদের সহযোগিতা থাকবে।’ বেডরুম পাহারার পর এখন শোনা গেল ‘ঘরে ঘরে’ পাহারার কথা। আইজিপির এই বক্তব্যের মধ্যে বাস্তব বিষয় নেই এমন নয়। জনগণকে অবশই নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে এবং এটাও ঠিক যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে ‘ঘরে ঘরে’ পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এই বক্তব্যের সমস্যার দিকটি হচ্ছে, এতে পুলিশের দায় এড়ানোর বিষয়টি পরিষ্কার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়টি যেন জনগণেরই বেশি। অনেকটা যেন বলে দেওয়া হলো, পুলিশের এ ক্ষেত্রে করণীয় তেমন কিছু নেই। এর মধ্য দিয়ে পুলিশপ্রধান কি নিজেদের ব্যর্থতার কথাই কোনো না কোনোভাবে স্বীকার করে নিলেন না! এ বক্তব্য কি জনগণের মধ্যে কোনো স্বস্তির অনুভূতি দেবে, নাকি ভয়ভীতি বাড়িয়ে তুলবে? প্রশ্ন আরও আছে। আইজিপি জনগণকে নিজস্ব নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে নিতে বলেছেন। কীভাবে এই নিরাপত্তাবলয় তৈরি হবে? পুলিশের হাতে নিরাপত্তার যেসব উপকরণ থাকে, সেসব কি তবে এখন জনগণকে জোগাড় করতে হবে, নাকি পুলিশ থেকে সরবরাহ করা হবে? নাকি শুধু সিসি ক্যামেরা লাগালেই নিরাপত্তা নিশ্চিত? কলাবাগানে খুনিরা যেসব বেপরোয়া আচরণ দেখাল, তাতে সিসি ক্যামেরায় হত্যা ঠেকবে বলে তো মনে হয় না। প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে আইজিপির এই মন্তব্যের খবরে পাঠকেরা অসংখ্য প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কিছু মন্তব্য তুলে ধরছি পাঠকদের প্রতিক্রিয়ার ধরন বোঝার জন্য। নাম প্রকাশ করতে চান না এমন এক পাঠক মন্তব্য করেছেন, ‘আমাদেরও কি চাইলে অস্ত্রের লাইসেন্স দেবেন? বাসায় ঢুকে দিনদুপুরে মানুষ খুন করে যাচ্ছে, মেলায় ভিড়ের মধ্যে পুলিশের সামনে খুন করে যাচ্ছে, সেখানে নিরাপত্তাবলয় বলতে তো হয় বডিগার্ড, নয়তো নিজের নামে অস্ত্রের লাইসেন্স থাকতে হবে!’
আরেক পাঠক প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আমরা যদি নিজেরা নিরাপত্তাব্যবস্থা, বলয় তৈরি করি, তাহলে পুলিশের দরকার কি?’ অপূর্ব নামের একজন আইজিপিকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি যত দিন চালু থাকবে, তত দিন ব্যক্তিগত নিরাপত্তাবলয়ে কোনো কাজ হবে না। আপনি ঠিকই বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘরে ঘরে নিরাপত্তা দিতে পারবে না, কিন্তু যেসব অপরাধ ইতিমধ্যে সংঘটিত হয়েছে, সেই সব অপরাধের পেছনের অপরাধীদের বিচারের আওতায় তো আপনার বাহিনী নিয়ে আসতে পারবে। সেটা যদি সঠিকভাবে করা হয়, তাহলেই আমার মনে হয়ে অপরাধের পরিমাণ কমে যাবে।’ সাইফুল ইসলাম লিখেছেন, ‘ঘরে ঘরে পাহারার প্রশ্ন আসছে কেন আইজিপি সাহেব? নিরাপত্তাবলয় দিয়ে কী বোঝাতে চাইলেন? ডাকাতের উপদ্রবে গ্রামবাসীর রাত জেগে পাহারা দেওয়ার মতো যদি করতে হয়, তাহলে আপনি কেন পুলিশের ওই পদে আছেন? আর কেনইবা নানা পদের গোয়েন্দা বাহিনীর পেছনে অর্থের অপচয়?’
সিরিয়াল খুনের ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রচলিত গোয়েন্দা তৎপরতা সফল হয় না। কারণ এ ধরনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি তাঁর একক চিন্তা কাজে লাগিয়ে কাজটি করেন। নিজেই পরিকল্পনা করেন এবং কাজটি বাস্তবায়ন করেন
কিছুটা রগড় করে এক পাঠক লিখেছেন, ‘তার মানে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করতে না পারলে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে। এখন থেকে কেউ খুন হলে দোষ তার নিজের, খুনির নয়! কী অপূর্ব শুনিলাম!’
পাঠকদের এসব মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া, মতামত ও প্রশ্নগুলো কি উপেক্ষা করা সম্ভব? এই যে একের পর এক খুন ও খুনিদের ধরতে না পারা, এর দায় কি তবে জনগণেরই, পুলিশের নয়! কলাবাগানে যে জোড়া খুনের ঘটনা ঘটেছে, সে সম্পর্কে আইজিপি বলেছেন, ‘হত্যাকাণ্ডটি সুপরিকল্পিত বলে মনে হচ্ছে। খুনিরা অনেক দিন ধরে রেকি করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।’ আইজিপির বক্তব্যের সূত্র ধরে বলতে চাই, দীর্ঘদিন ধরে ‘রেকি করে’ ও ‘সুপরিকল্পিত’ যে হত্যাকাণ্ড, সেখানে হস্তক্ষেপ করে তা ঠেকিয়ে দেওয়াই পুলিশ ও তাদের গোয়েন্দাদের কাজ। আক্ষরিক অর্থে ‘ঘরে ঘরে’ পাহারা দেওয়ার বিষয়টি জনগণ পুলিশের কাছ থেকে আশা করে না। গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে অপরাধীদের নজরদারি, অপরাধ করার আগেই তাদের নিষ্ক্রিয় বা দমন করা অথবা কোনো ক্ষেত্রে অপরাধ ঘটে গেলে তাদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করাই হচ্ছে দুনিয়াজুড়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথ। এভাবেই আসলে ‘ঘরে ঘরে’ নিশ্চিত করা সম্ভব। কলাবাগানের বাসায় জোড়া খুনের মতো একটি সুসংগঠিত ঘটনা ঠেকাতে না পারা সে কারণেই একটি পুলিশি বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা। আর এ ধরনের ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও যখন অপরাধীদের চিহ্নিত করা যায় না, ধরা যায় না তখন সেটা চরম ব্যর্থতাই। কলাবাগানের জোড়া খুনের ঘটনায় সাত ব্যক্তি সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে। যেভাবে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, তাতে নিখুঁত পরিকল্পনার প্রমাণ মেলে। মানে এর পেছনে একজন ‘যোগ্য’ পরিকল্পক কাজ করেছেন। ধারণা করা যায়, তিনি অপারেশন পরিচালনাকারী খুনি চক্রকে নিয়ে দিনের পর দিন বসেছেন। এই খুনের পেছনে যদি কোনো আদর্শগত ব্যাপার থেকে থাকে, তবে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। কীভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে, সম্ভাব্য কী কী পরিস্থিতির মুখোমুখি তাঁরা হতে পারেন বা সে ক্ষেত্রে কীভাবে তা সামাল দেওয়া হবে—এসব নিয়ে নিশ্চয়ই তাঁদের হাতে-কলমে শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা তৎপরতার সাধারণ তত্ত্বে এটা ধরে নেওয়া হয়, যে অপরাধকর্মে একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকে, সেখানে ঢুকে পড়া ও রহস্য ভেদ করা কঠিন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই একের পর এক একই ধরনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত শক্তিটি বা শক্তিগুলো যথেষ্ট সংগঠিত এবং তাদের তৎপরতা সমাজে রয়েছে। এই সংগঠিত শক্তি কি এতটাই অভেদ্য যে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা তৎপরতা তা ভেদ করতে পারছে না?
সিরিয়াল খুনের ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রচলিত গোয়েন্দা তৎপরতা সফল হয় না। কারণ এ ধরনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি তাঁর একক চিন্তা কাজে লাগিয়ে কাজটি করেন। নিজেই পরিকল্পনা করেন এবং কাজটি বাস্তবায়ন করেন। দৃশ্যত স্বাভাবিক জীবনযাপনকারী কোনো ব্যক্তি যদি এ ধরনের মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েন, তখন অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ ও গোয়েন্দাদের হিমশিম খেতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে অভিজিৎ হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে রাজশাহীতে অধ্যাপক হত্যা বা কলাবাগানের জোড়া খুন বা ১৪ মাসের ৩৫ খুন—এগুলোর সবই সংগঠিত শক্তির কাজ। এদের ঠেকাতে হবে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেই। পরিকল্পনা পর্যায়েই তাদের নিষ্ক্রিয় করতে হবে, কাঠামো ভেঙে দিতে হবে, বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী সে ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে ও দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি বদলাতে হবে। সেটা না পারলে নাগরিকদের ‘সেন্স অব সিকিউরিটি’ কোনো কাজে দেবে না। জনগণকে নানা উপদেশ দিয়ে বা তাদের সিসি ক্যামেরা লাগাতে বাধ্য করেও কোনো লাভ হবে না। সিসি ক্যামেরা এই বেপরোয়া খুনিদের নিবৃত্ত করতে পারবে না।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

No comments:

Post a Comment