Sunday, April 17, 2016

ইউরোপ যেতে মরিয়া তাঁরা

সন্তানের উন্নত ভবিষ্যতের আশায় দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপ
যেতে চান ইরিত্রিয়ার সেলাম (ছদ্মনাম) নামের এক নারী
শিশুপুত্রের উন্নত ভবিষ্যতের কথা ভেবে সবকিছুর বিনিময়েও ইউরোপে যেতে চান সেলাম (ছদ্মনাম) নামের সেই নারী, ইরিত্রিয়ায় যাঁর বাড়ি। সেই অপেক্ষায় জাতিসংঘের শরণার্থীশিবিরে দিন কাটছে তাঁর। এই অভিবাসনপ্রত্যাশীর ইউরোপ যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ও ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের গল্প উঠে এসেছে এএফপির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। আর্থিক দুর্দশা আর সেনাবাহিনীর বাধ্যতামূলক কাজ থেকে নিষ্কৃতি পেতে দূরদেশে পাড়ি জমানোর কথা ভাবেন সেলাম। ইরিত্রিয়া থেকে প্রথমে যান সুদান। সেখানে পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে তাঁর সেই আশা দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন আর বন্দিত্বের দুর্দশা নেমে আসে জীবনে। যন্ত্রণাদায়ক সেই প্রথম যাত্রার দুই বছর পর সেলাম আবার ইউরোপে যাওয়ার আশা করছেন। ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া ও সোমালিয়ার হাজারো অভিবাসনপ্রত্যাশীও একই আশায় রয়েছেন। খার্তুমে জাতিসংঘের শরণার্থীশিবিরে ৩২ বছর বয়সী সেলাম বলেন, ‘একজন নারী যত ধরনের নিপীড়নের শিকার হতে পারে, এর সবই আমার ওপর দিয়ে গেছে।’ জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর উত্তর আফ্রিকা থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ৩০ হাজারের বেশি ইরিত্রীয় ও ইথিওপীয় ইতালি গেছেন। তাঁদের মধ্যে অল্প কিছু সুদানি ও সোমালি ছিলেন। তাঁদের বেশির ভাগই সুদান হয়ে সেখানে গেছেন। তিন বছর বয়সী ছেলেশিশুর মা সেলাম বলেন, ঝুঁকি থাক বা না থাক, ইউরোপ যাওয়ার আশায় সবাই আসছে। সুদানের পূর্ব সীমান্ত পাড়ি দিয়ে অধিকাংশ অভিবাসী খার্তুমে আসেন এবং সেখানে পাচারকারীদের হাতে অর্থ দিয়ে হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে লিবিয়া উপকূলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ধরনা দেন। গত বছরে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ৩ হাজার ৮০০ অভিবাসী প্রাণ দিয়েছেন। কয়েকবার প্রচেষ্টা করলেও সেলাম কোনোবারই লিবিয়া উপকূলে পৌঁছাতে পারেননি। তাঁর এ অভিজ্ঞতা হরদম তাঁকে পীড়া দেয়। ২০১২ সালের এপ্রিলে ইরিত্রিয়ার সেনাবাহিনীতে সেলামের তাঁর সাত বছর পূর্ণ হয়। ওই সময় তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন তিনি। তখন সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি সুদান ছেড়ে পালিয়ে উন্নত কোনো দেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। ওই মাসেই দেশ ছাড়েন তিনি। বাসে করে সীমান্তে চলে যান। বিনা বাধায় ঢুকে পড়েন সুদানে। কাসালা নামের এক শহরের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় আরবের মানব পাচারকারীরা তাঁকে জোর করে ট্রাকে তুলে নেয়। পরে তাঁকে মিসরের সিনাইয়ের বেদুইন দুর্বৃত্তদের কাছে তাঁকে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেলাম বলেন, পথে অনেক নিপীড়ন চালানো হয়, খুব বাজে আচরণ করা হয়। বেদুইন ডাকাতেরা সাত মাস ধরে তাঁর ওপর নির্যাতন চালায়। মারধর, ধর্ষণ চলতে থাকে। এরপর জোর করে সেলামের পরিবারের কাছে ফোনে ৩০ হাজার ডলার মুক্তিপণ দাবি করা হয়। সেলাম বলেন, অর্থ পরিশোধের জন্য বাড়িতে কল দিতে সব সময় তাঁদের ওপর মারধর করা হতো। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে সন্তান জন্ম দেওয়ার মাস খানেক আগে পালানোর চেষ্টার সময় সেলাম ধরা পড়ে যান এবং তাঁর হাঁটুতে গুলি করা হয়। সেলাম বলেন, ‘এখনো হাঁটতে কষ্ট হয় আমার।’ ইরিত্রিয়া থেকে যখন ১৫ হাজার ডলার মুক্তিপণ দেওয়া হয়, তখন মিসর ও ইসরায়েলের এক সীমান্তে তাঁকে ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা। তিন মাস পর আবার তাঁকে ইরিত্রিয়া ফিরিয়ে নেওয়া হয়। অবৈধভাবে ইরিত্রিয়া ছাড়ায় ছয় মাসের কারাদণ্ড হয় তাঁর। আবার ইরিত্রিয়া ছাড়ার পরিকল্পনা আঁটতে থাকেন সেলাম।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যেতে চান অনেক অভিবাসীপ্রত্যাশী।
সেলামের প্রথম যাত্রা ও ২০১৪ সালে ইরিত্রিয়া ফেরত আসার সময়টাতে খার্তুম পাচারকারী সমস্যা সমাধানে কিছুটা চেষ্টা চালায়। সুদানের শরণার্থী-বিষয়ক কমিশনার হামেদআল-গিজোলি এএফপিকে বলেন, নানা উপায়ে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে সুদান। আইন ছাড়াও এ ধরনের অপরাধ কমাতে বিশেষ বিচারক নিয়োগ দিয়েছে দেশটি। ২০১৪ সালে মানব পাচার ঠেকাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পূর্ব আফ্রিকার কয়েকটি দেশের জন্য যৌথ উদ্যোগ নেয় সুদান। সুদানের নেওয়া পদক্ষেপের ফলে মানব পাচার রোধ কতটা সফল হয়েছে, তা বলা কঠিন। তবে শরণার্থীদের আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, সুদান মানব পাচার ঠেকাতে উন্নতি করলেও চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে। এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হচ্ছে, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সীমান্তের দৈর্ঘ্য ও অভিবাসীপ্রত্যাশীদের পথ পরিবর্তন ও পাচারকারী আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের ধরন। ২০১৪ সালে সেলাম যখন জেল থেকে ছাড়া পান, তখন আবার সুদানে পাড়ি দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। এবার তিনি খার্তুমে পৌঁছালে সেখানকার ইরিত্রীয় কমিউনিটিতে ঠাঁই হয় এবং পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের শরণার্থীশিবিরে নেওয়া হয়। জাতিসংঘের শরণার্থীশিবিরের সুদান অঞ্চলের প্রধান মোহামেদ আদর বলেন, ইরিত্রিয়া ছাড়ার মূল কারণ হচ্ছে এটি অনুন্নত, দারিদ্র্যপীড়িত ও বেকারত্ব। এ সমস্যা দূর করতে ব্যাপক উন্নয়ন দরকার। খার্তুমে প্রায় দুই বছর পার করা সেলাম তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা এখন আর খুব বেশি প্রকাশ করতে চান না। চার বছর আগে যে পরিকল্পনা নিয়ে ইউরোপ যাত্রা করতে চেয়েছিলেন, সে লক্ষ্য এখনো অটুট রয়েছে। সেলাম শান্ত স্বরে বলেন, ‘চিকিৎসা পেতে এবং আমার সন্তানকে বড় করার জন্য যেকোনো জায়গায় যেতে রাজি।’

No comments:

Post a Comment