Monday, April 11, 2016

চরমভাবাপন্নতার এক দেশ

রঞ্জুর মতো আপনাদেরও এমন হয়? কিছুদিন কিছুই ভালো লাগে না, সব তিতা তিতা লাগে! ‘সব কাজ তুচ্ছ হয়, পণ্ড মনে হয়, সব চিন্তা—প্রার্থনার সকল সময় শূন্য মনে হয়!’ এরপরে আবার কিছুদিন আসে। তখন মনে হয় ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’। নিজেকে মনে হয় দারুণ আত্মবিশ্বাসী। কোনো সমস্যাই গায়ে লাগে না। মন একবার যদি প্যারিস প্যারিস করে, পরেরবারই হয়ে যায় ঘিঞ্জি পাটুয়াটুলী। আজ মন উড়ু উড়ু তো কাল দুরুদুরু। ভালো ও মন্দের এই চরমভাবাপন্নতার অসুখকে মনোরোগের ভাষায় বলে বাইপোলার ডিজঅর্ডার বা দ্বিমেরু আচরণগত বিভ্রাট। এটা সুখের পরে দুঃখের মতো নয়। বরং এটা সুখ-দুঃখের এমন এক ভারাসাম্যহীনতা, যার হয় সে স্বাভাবিক থাকতে পারে না। তার হিসাব-নিকাশে ভুল হয়। ভালো থাকলেও সে ভোগে, খারাপ থাকলেও ভোগে। ভোগান্তি তার সহচর। মাঝেমধ্যে মনে হয়, বাংলাদেশের জনগণও এই চরমভাবাপন্ন আচরণগত সমস্যায় ভুগছে। বাংলাদেশের দুটি রাজনৈতিক মেরুর মতো জাতীয় স্বভাবের মধ্যেও রয়েছে দুই বিপরীত মেরুর আবেগ: উচ্ছ্বাস ও বিষাদ। হয়তো বহুকাল থেকেই তা আছে। স্বাধীনতার পর বিপুল আশাবাদ সৃষ্টি হলো। কিন্তু দু-এক বছর যেতে না–যেতেই দেশ নিপতিত হলো হতাশায়। এক পক্ষ তখনো বলে যাচ্ছিল, ‘সোনার বাংলা’ হতে আর বেশি দেরি নেই। পরপরই ভয়াবহ দুঃখজনক হত্যালীলার মধ্যে প্রবেশ করল রাজনীতি। আশার সমাধিক্ষেত্র হলো দেশ। এরপরে যিনি এলেন, তিনিও তুমুল আশা জাগালেন। মানুষ হই হই করে তাঁর নামে জিন্দাবাদ দিতে থাকল। পাশাপাশি চলতে লাগল সমাজ-প্রতিষ্ঠানের রদবদল। একপর্যায়ে তিনিও গেলেন, এলেন আরেকজন। তাঁর দীর্ঘ দশ বছরের শাসন বাংলাদেশের ইতিহাসের কালো অধ্যায় হলেও অনেকের কাছেই তা উন্নয়নের দশক। তাঁর পক্ষের লোক যত আশাবাদী, বিপক্ষের লোকদের হতাশা তার চেয়েও বেশি। এবং উভয় পক্ষের মতামতই চরমভাবাপন্ন। এরপর এল সংসদীয় গণতন্ত্র, জনপ্রিয় ভোটে নির্বাচিত সরকারের শাসন। ক্ষমতাসীনদের দাবি, তাদের সরকারই সর্বকালের সেরা সরকার। এর থেকে আর বেশি ভালো হয় না, অত সুখ সইবে না। কিন্তু সেই সরকারগুলোও মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এমন অজনপ্রিয় হয়ে পড়ল, মানুষ ভাবতে থাকল তাদের বিদায়ের পরের কথা। কিন্তু দিন শেষে আমরা নিজেদের আবিষ্কার করি নতুন নতুন আশার সমাধিক্ষেত্রে দিশাহীন অবস্থায়। আশা-নিরাশার এই ঐতিহাসিক নাগরদোলা, বাংলাদেশিদের জাতীয় বাইপোলার ডিজঅর্ডারের মোটাদাগের লক্ষণ বললে খুব বেশি ভুল বলা হয় না। এ থেকে এখনো আমাদের নিস্তার হয়েছে বলে মনে হয় না। এখনো দেশে দুই ধরনের লোকই আছে। একদলের মতে, ক্ষমতাসীন সরকার সর্বকালের সবচেয়ে ভালো সরকার। এই সরকারের নেতৃত্বে চেতনার উন্নয়ন যেমন হচ্ছে, তেমনি উন্নয়নের চেতনায় যুগান্তকারী সব প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। দেশ অচিরেই সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়া হয়ে গেল বলে! মন্ত্রী মহোদয়েরা আছেন, টক শোর কণ্ঠবীরেরা আছেন, কলামিস্টদের মধ্যেও এমন অসম্ভব আশাবাদী কম নেই। ওদিকে শিল্পমন্ত্রী বলেছেন, উন্নয়ন শেষ হলে দক্ষিণাঞ্চল সিঙ্গাপুর হয়ে যাবে। তিনি সম্ভবত সুন্দরবনের জন্য ক্ষতিকর রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মতো উন্নয়ন নিয়ে বলছেন। একের পর ব্লগার হত্যার পটভূমিতে তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, গণতন্ত্র গ্লাস নয় যে একজন ব্লগার মারা গেলে ভেঙে পড়বে! তিনি আরও বলেছেন, ‘বাংলাদেশ এখন আমেরিকা–ইউরোপের চাইতেও নিরাপদ দেশ।’ আওয়ামী লীগ মানেই উন্নয়ন বলেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। সবকিছুর মধ্যে তাঁরা প্রচণ্ড সাফল্য ছাড়া আর কিছু দেখছেন না। আমাদের এ-জাতীয় মনস্তত্ত্ব কেবল রাজনীতিতেই প্রকাশিত তা নয়, ক্রিকেটের মাতামাতির মধ্যেও তা ফকফকাভাবে প্রকাশিত। কোনো একটি সাফল্যের পরই আমরা ভাবা শুরু করি, বাংলাদেশই বিশ্বের সেরা দল। আমাদের দম্ভ বাড়ে। কিন্তু একটি-দুটি পরাজয়ের পরই আনন্দের বেলুনটা যায় চুপসে। আরও একটি বড় বিজয় ছাড়া কিছুতেই তাদের আত্মবিশ্বাস জাগানো যায় না! এর খুব ভালো উদাহরণ শাহবাগের গণজাগরণ। গতকাল যেখানে ছিল লাখো মানুষের জাতীয় আলোড়ন, বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় কিছুদিনের মধ্যে তাঁদের অনেকেই হতাশ। ডেকেও আর তাঁদের পাচ্ছেন না সেই সময়কার নেতারা। অসম্ভব উচ্চাশার পরে দারুণ রকম অবসাদ মোটেই ভারসাম্যের পরিচয় নয়। আশা আর দুরাশার এই বাইপোলার ডিজঅর্ডার বাস্তবতা সম্পর্কে সজাগ ও স্বচ্ছ জ্ঞান গঠিত হতে দেয় না। তাই একদিকে উন্নয়নের জিগির, আরেক দিকে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী ঘটনায় বেতাল লাগে আমাদের। দেশ আসলে কতটা ভালো আছে, আর কতটা খারাপ দিকে যাচ্ছে, তার ভারসাম্যপূর্ণ পরিমাপ করতে ব্যর্থ হই আমরা। একটি-দুটি সাফল্যে আমরা এমনভাবে ঢোল পেটাতে থাকি, যেন বিশ্ববিজয় ঘটে গেছে। পরেই আবার কোনো না কোনো ব্যর্থতায় আস্থা হারিয়ে ফেলি ইতিহাসের ওপর মানুষের ওপর। এ অবস্থায় আশাবাদের প্রদর্শন আর হতাশার আহাজারি আকাশ-বাতাস ঢেকে ফেলে।  এমনটা ঘটে যখন মানুষ দীর্ঘ অবসাদে ভুগতে থাকে। দুই দশক ধরে একের পর এক রাজনৈতিক ভূমিকম্প ও ধসে বাংলাদেশের মানুষ হকচকিত। এর মধ্যে বহু ওপরের মামুদ তলায় চলে গেছে, তলার মামুদ ওপরে উঠেছে। বহু মানুষ নৃশংসভাবে নিহত হয়েছেন, বিধ্বস্ত হয়েছে বহু প্রতিষ্ঠান। অনেক কিছুতে আস্থা নড়ে গেছে, নতুন আস্থা দাঁড়াবার জায়গা পাচ্ছে না। এভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে, মানুষ ক্রমাগত আক্রান্ত বোধ করতে থাকলে, তার মর্যাদায় বারবার আঘাত আসতে থাকলে এবং তার কোনো প্রতিকার করতে না পারলে অবসাদের চাদর একটা সমাজকে ঢেকে ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি অস্তিতিশীলতা ও ভয়ের মধ্যে মানুষের ভেতরে যেমন দেখা যায় সামাজিক জড়তা, তেমনি হঠাৎ তারা ফুঁসে উঠতে পারে কোনো ঘটনায়। অজস্র হত্যা-ধর্ষণের পর হঠাৎ কুমিল্লার ছাত্রী তনু হত্যায় যেমন জড়তা ভাঙতে দেখেছি, আবার তার মধ্যে ঝিমিয়ে পড়ার অবসাদও দেখা যাচ্ছে। অবসাদের ওপর মনোবিজ্ঞানশাস্ত্রের পথিকৃৎ জিগমুন্ড ফ্রয়েডের বিখ্যাত একটা বই হলো মৌর্নিং অ্যান্ড মেলাংকলিয়া (Mourning and Melancholia)। বাংলায় বলা যায়, শোক ও বিষাদ। বড় কোনো কিছুকে হারিয়ে ফেললে মানুষের শোক ও বিষাদ দুটোই হয়। তবে দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। মানুষ তখন শোক করে, যখন সে হারানো মানুষ বা জিনিসের সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে জানে এবং এ–ও জানে যে যা হারিয়ে গেছে, তা আর ফিরে আসবে না। শোকের পর সে এটা মেনে নেয় এবং স্বাভাবিক দশায় ফিরে আসে। মুসলিম রীতিতে চল্লিশ দিনের শোকচল্লিশা পালনের পর দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিক হওয়ার কথা আছে। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালনের রেওয়াজের সঙ্গেও আমরা পরিচিত। ব্যক্তি বা সমষ্টির চিত্তের সুস্থতার জন্যই শোকপর্ব জীবনের জন্য অপরিহার্য। সব সংস্কৃতিতেই এমন রীতি প্রচলিত। ফ্রয়েড বলছেন, বিষণ্নতা আরও মারাত্মক। বিষণ্নতা বা মেলাংকলিয়ার সরব উদ্‌যাপন নেই। এটা সেই পরিস্থিতি, যখন হারানোর ব্যাপারটা মেনে নেওয়া যাচ্ছে না এবং পরিষ্কারভাবে জানাও যাচ্ছে না ক্ষতিটা আসলে কত বড়। মানাও যায় না, আবার পরিমাপও করা যায় না—এমন ক্ষতি মানুষকে অবসাদগ্রস্ত করে তোলে। এটা এক বিশুদ্ধ ক্ষতি। বিশুদ্ধ ক্ষতি বলতে সব ক্ষতির বড় ক্ষতি, যা হারালে অন্য কোনো কিছুই আর সুখী করে না। সে অন্য কোনো কিছু দিয়ে এর পূরণও করতে পারে না, কারণ সে তো জানে না সে কী হারিয়েছে! শোক কখনো চেতনের তলায় লুকায় না, শোক প্রকাশিত হবেই। কিন্তু বিষণ্নতা লুকিয়ে থাকে মনের অচেতন স্তরে এবং কুট কুট করে ইঁদুরের মতো খেয়ে ফেলে মনোবল, ইচ্ছাশক্তি ও আশাবাদ। বাংলাদেশের জনজীবন মারাত্মক সব অঘটনে বিপর্যস্ত। জীবনের ভয় ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা এই সময়ের বৈশিষ্ট্য। এ অবস্থা অনেককেই বিষাদগ্রস্ত করে তুলছে। তারপরও অনেকেই নিশ্চিত নয়, কী থেকে কী হয়ে গেল। জীবন, জবান, অধিকার দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু এ থেকে বেরোনোর উপায় দেখা যাচ্ছে না। এ অবস্থাও বাইপোলারিটির জন্ম দিতে পারে। অবসাদগ্রস্ত করে তুলতে পারে। সার্বক্ষণিক উদ্বেগ কাজ করে, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগে ভয় আসে, কারো চোখের দিকে তাকাতে অস্বস্তি হয়।
ওদিকে আরেক দল প্রচণ্ড আনন্দিত। তারা নিজেদের ভয়ানক শক্তিশালী মনে করছে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বললে, ‘তাদের এই উচ্চকিত মনোভাবকে বলে ম্যানিয়া বা হাইপারম্যানিয়া। এমন সময় আক্রান্ত ব্যক্তি অস্বাভাবিক উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাস বোধ করে। তখন তারা ভাবনাচিন্তা ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেয়, যার পরিণতি তারা জানে না।’
এ দুই মনোভাব আসলে একই অসুখের দুই দিক। বাংলাদেশের গভীর রাজনৈতিক বিভাজনের মতো এই মানসিক বৈকল্যও জাতীয় দুর্দশার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ কেবল বাড়িয়েই চলেছে।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।  
bagharu@gmail.com

No comments:

Post a Comment