ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মোড়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেট দিয়ে আরও অনেকের
সঙ্গে বের হচ্ছিলেন তাঁরা। এ সময় ৩০-৩৫ জন যুবক তাঁদের ওপর হামলে পড়েন। শত
শত লোকের সামনেই ঘটে যৌন নির্যাতনের ঘটনা, বস্ত্রহরণ। এখানেই থামেননি
যুবকেরা, এসবের ভিডিও করেছেন। এই তাঁরা হলেন বেশ কয়েকজন নারী, কিশোরী ও
মেয়েশিশু। পাঠক, নিশ্চয়ই ভুলে যাননি গত বছরের পয়লা বৈশাখে বর্ষবরণ উৎসবে
সংঘটিত নারকীয় এ ঘটনার কথা। সেদিন টিএসসি মোড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনীর সদস্যরা ছিলেন। কিন্তু কেউ মেয়েদের বাঁচাতে এগিয়ে আসেননি। নারীদের
ওপর এই বর্বর আচরণ ঠেকাতে গিয়ে ওই যুবকদের হামলায় হাত ভেঙে যায় ছাত্র
ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি লিটন নন্দীর। কিন্তু পুলিশ থাকে
নির্বিকার। তাদের এই উদাসীনতা ক্ষমার অযোগ্য। সেদিন শুধু টিএসসি মোড়েই নয়,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বেশ কয়েকটি
স্থানে ঘটে নারী নিগ্রহের ঘটনা। তাঁরা নারীদের শ্লীলতাহানি করেছেন, কিন্তু
কেউ তাঁদের কিছু বলেননি। কী আনন্দ! এক বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। যৌন
নির্যাতনকারীদের মাত্র একজন ধরা পড়েছে। বাকিদের কোনো খবর নেই, শাস্তি হওয়া
তো দূরের কথা। নারীদের শ্লীলতাহানিতে ৩০-৩৫ জন যুবক অংশ নিলেও ক্লোজড
সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও থেকে পুলিশ মাত্র আটজন যুবকের ছবি প্রকাশ করেছে।
সর্বশেষ গত মার্চ মাসে পুলিশের তদন্ত ব্যুরোকে এ মামলা তদন্তের দায়িত্ব
দিয়েছেন আদালত। আশা করি, তদন্ত ব্যুরো তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে।
অপরাধীরা ধরা পড়বে। তবে এ দেশে অপরাধ করে পার পাওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়।
কিন্তু সমস্যা হলো, একবার পার পেয়ে গেলে একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করতে অসুবিধা
কোথায়—এ রকম একটি চিন্তা যে তাঁদের মনে কাজ করবে না তার নিশ্চয়তা কী? অন্য
পুরুষেরাও যে এ রকম অপরাধ করতে দ্বিধা করবেন না, তারও কোনো নিশ্চয়তা কেউ
কি দিতে পারবে? গত বছর টিএসসি মোড়ে যেসব নারী, কিশোরী ও মেয়েশিশুর ওপর এই
যৌন নিপীড়ন চালানো হয়েছিল তাঁদের কাছে বর্ষবরণ উৎসব নিশ্চয়ই এখন এক
বিভীষিকার নাম। তাঁরা কি আর কখনো বাঙালির প্রাণের উৎসব বলে খ্যাত এই উৎসবে
যেতে চাইবেন? তঁাদের কাছে পয়লা বৈশাখ মানে কয়েকজন যুবকের কালো হাত। যে হাত
তঁাদের দেহে হিংস্র আঘাত হেনেছে। বাঁচার জন্য তঁারা চিৎকার দিয়েছিলেন।
কিন্তু তঁাদের চিৎকার যাতে শোনা না যায়, সে জন্য ওই যুবকেরা উচ্চ স্বরে
ভুভুজেলা বাজিয়েছেন। কী ভয়ানক! কত আয়োজন করেই না তাঁরা এই যৌন হয়রানির ঘটনা
ঘটিয়েছেন। হায় রে নারী! উৎসব-পার্বণে একটু আনন্দ করার অধিকারও আপনার নেই।
কোথাও আপনার নিরাপত্তা নেই। আপনারা নিজের ঘরে নির্যাতিত হচ্ছেন। আপনারা
ঘরের বাইরে নির্যাতিত হচ্ছেন। কর্মস্থলেও আপনারা স্বস্তিতে নেই। গণপরিবহনেও
আপনারা শিকার হচ্ছেন পুরুষের অভব্য আচরণের। কোথায় যাবেন আপনারা? আর মাত্র
কটা দিন। আসছে পয়লা বৈশাখ। নতুন বছরকে বরণ করার জন্য অনেকেই নানা রকম
প্রস্তুতি নিচ্ছে। চারদিকে সাজ সাজ রব। ব্যবসায়ীরা তাঁদের পণ্যের পসরা
সাজিয়ে বসেছেন। শুরু হয়েছে শাড়ি, সালোয়ার–কামিজ, গয়না, পাঞ্জাবিসহ নানা
জিনিস কেনার ধুম। কিন্তু এবার যে মেয়েরা বর্ষবরণের অনুষ্ঠানগুলোতে যাবেন,
তঁারা কি কোনো ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হওয়া ছাড়াই বাড়ি ফিরতে পারবেন? এ
নিশ্চয়তা কে দেবে? সরকার এবার প্রকাশ্য স্থানে পয়লা বৈশাখের সব অনুষ্ঠান
বিকেল পাঁচটার মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে ওই দিন ভুভুজেলা
বাজানো নিষিদ্ধ করেছে। এ ছাড়া মঙ্গল শোভাযাত্রায় ছোট ছোট মুখোশ দিয়ে মুখ
ঢাকার বিষয়টি এবার নিয়ন্ত্রণ করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
আসাদুজ্জামান খান কামাল। কিন্তু এসব পদক্ষেপ কি নারীদের নিরাপত্তা এনে
দেবে? পারবেন কি তাঁরা নির্বিঘ্নে উৎসবে অংশ নিতে? হায় রে নারী!
উৎসব-পার্বণে একটু আনন্দ করার অধিকার আপনার নেই। কোথাও নেই আপনার
নিরাপত্তা। আপনারা নিজের ঘরে নির্যাতিত হচ্ছেন। আপনারা ঘরের বাইরে
নির্যাতিত হচ্ছেন। কর্মস্থলেও আপনারা স্বস্তিতে নেই। গণপরিবহনেও আপনারা
শিকার হচ্ছেন পুরুষের অভব্য আচরণের। কোথায় যাবেন আপনারা? বেসরকারি সংস্থা
ব্র্যাকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে নারী
নির্যাতনের ঘটনা ৭৪ শতাংশ বেশি ঘটেছে। ৫৫টি জেলায় জরিপ চালিয়ে ব্র্যাক এ
প্রতিবেদন তৈরি করে। মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ৪ হাজার ১২২ জন
নারী ও শিশু বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন
৮০৮ জন, গণধর্ষণের শিকার ১৯৯ জন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৯৯ জনকে। এ
ছাড়া যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬৮ জন, পাচার হয়েছেন ৪৭ জন নারী ও শিশু,
শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩০২ জন। যেখানে ২০১৪ সালে মোট নারী-শিশু
নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন ৩ হাজার ৩৭৭ জন। ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন ৬৬৬ জন,
গণধর্ষণের শিকার ১৭৪ জন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৮৫ জনকে। এ ছাড়া
যৌন নির্যাতনের শিকার হন ৪৪ জন, পাচার হন ১১ জন নারী ও শিশু এবং শারীরিক
নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৫৮ জন। ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট নামে
একটি বেসরকারি সংস্থার এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে পাবলিক বাসে
চলাচলকারী নারীদের ৪১ শতাংশ যৌন হয়রানির শিকার হন। অর্থাৎ যেখানেই যান না
নারী, তাঁকে নিগ্রহের শিকার হতেই হবে। আর এমনটা ঘটছে, কারণ নারী নির্যাতনের
বিষয়টি এখনো জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হতে পারেনি। কেউ বিষয়টিতে গুরুত্ব দিচ্ছে
না। নির্যাতনকারীদের শাস্তি হচ্ছে না। অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা যাচ্ছে
না বলেই নারী লাঞ্ছনাসহ সব অপরাধের মাত্রা বেড়ে চলেছে। অপরাধীরা বেপরোয়া
হয়ে উঠেছে। কাজেই এখনই সময় রাষ্ট্র ও সমাজের জেগে ওঠার। নারীর ওপর যৌন
হয়রানিকারী, নারীর শ্লীলতাহানিকারী, নারী নির্যাতনকারীদের কঠোর ও
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। যত দিন সমাজ ও রাষ্ট্র এ ব্যাপারে আন্তরিক
না হবে, তত দিন নারীর ওপর এ হয়রানি ও নির্যাতন চলতেই থাকবে। আমরা চাই,
আমাদের দেশটি হবে এমন একটি দেশ, যেখানে নারীরা ভয়শূন্য মনে স্বাধীনভাবে
চলাফেরা করতে পারবেন। পারবেন সব উৎসব-পার্বণে অংশ নিতে। যেখানে কোনো
পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি তাঁদের বিদ্ধ করবে না। তাঁদের লাঞ্ছিত করবে না কোনো
পুরুষের কালো হাত। সত্যিই কি কখনো এমনটা ঘটবে?
রোকেয়া রহমান: সাংবাদিক।
রোকেয়া রহমান: সাংবাদিক।

No comments:
Post a Comment