Friday, April 22, 2016

সুশাসনের অভাবে ঝুঁকিতে ব্যাংকিং খাত -সুজনের গোলটেবিলে বক্তারা

সুশাসনের অভাবে দেশের ব্যাংকিং খাত চরম ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করছেন ব্যাংক ও আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত না হলে ব্যাংকিং খাত থেকেই জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় চাপ আসতে পারে। পরিস্থিতি উত্তরণে সুশাসন নিশ্চিত করা, নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়া এবং এ খাতকে রাজনীতিমুক্ত রাখার সুপারিশ করেছেন তারা। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এমন মতামত তুলে ধরেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খানের সভাপতিত্বে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মীর্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ, সাজ্জাদ জহির, নুরুল হক মজুমদার, আবদুল্লাহ আল কাফি প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফিন এক্সেলের চেয়ারম্যান ও অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ।
ড. মীর্র্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সুশাসনের অভাব রয়েছে ব্যাংকিং খাতে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে এটি ব্যাপক। ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় এতো বেশি বেড়ে যাচ্ছে যে, পুরো খাত ঝুঁকির দিকে যাচ্ছে। বিদেশি ব্যাংক একশ’ টাকা আয় করতে ৫০ টাকা ব্যয় করে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ব্যয় করে ৮৬ টাকা। এছাড়া, দৈনন্দিন লেনদেনেও অনিয়ম পরিলক্ষিত হচ্ছে।  সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিগত বছরগুলোতে বৈশ্বিক মন্দা দেখা দিয়েছিল অর্থনৈতিক খাত থেকে। বাংলাদেশেও এমন কিছু দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, সুশাসনের জন্য ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তবে তা যেন মাত্রাতিরিক্ত না হয়। ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে দেশে যেসব আইন আছে তা খুবই সমৃদ্ধ, তবে এর বাস্তবায়ন কম। তিনি বলেন, অনিয়মের ক্ষেত্রে আইটি মেশিনের কোনো দোষ নেই। যারা মেশিন নিয়ন্ত্রণ করে তারা সৎ না হলে সমস্যা থেকেই যাবে। কারণ যেসব সৎ কর্মকর্তা আছেন তাদের পেছনে সরিয়ে দেয়া হয়। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে এ যাবৎকালে অনিয়মের কোনো বিচারই দৃশ্যমান ছিল না। আর্থিক খাতে রাজনীতি প্রবেশ ঠিক না। বোর্ড রুমে যাতে রাজনীতি না ঢুকে সেদিকেও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।  ব্যাংকারদের মনোভাব পরিবর্তনে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোকে যথাসময়ে যথাস্থানে ঋণ দিতে হবে। ঋণ কার্যক্রম এবং টার্গেটগুলো ফুলফিল হচ্ছে কিনা তা নজরে রাখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি নিয়ন্ত্রণে আরও স্বচ্ছতা আনার আহ্বান জানান তিনি। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরির ঘটনায় ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন কমিটি যে প্রতিবেদন দিয়েছে তাতে তিনটি বিষয় আছে কিনা দেশের মানুষ তা জানতে চাই। সুইফটের যেসব লোক তদন্ত করতে এসেছিলেন তাদের কেন তদন্ত করতে দেয়া হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর আইটি উপদেষ্টা ঘটনার পর তদন্তে কোনো ভূমিকা রেখেছেন কিনা, আর ভারতীয় নাগরিক রাকেশ আস্তানাকে কেন এখানে আনা হলো বিশেষজ্ঞ হিসেবে। বিশ্লেষক সাজ্জাদ জহির বলেন, দেশের বাইরে থেকে আইটি বিশেষজ্ঞ ভাড়া করা হচ্ছে। কিন্তু আইটি সেক্টরের কোনো দৃশ্যমান উন্নতি কী হয়েছে? বিষয়টি বিবেচনায় আনা দরকার।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বিগত সাত বছরের ব্যাংকিং খাতের আচরণ নিয়ে বড় হতাশা কাজ করছে। তবে নতুন গভর্নরের কাছে প্রত্যাশা-তিনি যেন হতাশা কাটিয়ে মানুষকে আশা দেখান। মূল প্রবন্ধে সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ ব্যাংকিং খাতে ১১টি সমস্যার বিষয় তুলে ধরেন। পাশাপাশি কিছু পরামর্শও দেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং কমিশন গঠন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, বেসরকারি ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, জালিয়াতি বন্ধে উদ্যোগ নেয়া এবং আর্থিক স্বচ্ছতার জন্য অভ্যন্তরীণ অডিটের ব্যবস্থা করা, ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা। সুজনের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত দেড় দশকে ব্যাংকিং খাতে ৯টি বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়েছে। এর মধ্যে গত ৭ বছরের মধ্যেই ঘটেছে ৬টি বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা। এই ৬টিতেই ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি চুরি বা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের সমস্যাগুলো তুলে ধরে এতে বলা হয়, বিনিয়োগ না বাড়ায় ব্যাংকগুলোতে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত পড়ে আছে। ব্যাংকগুলো ঋণ দিয়ে তা আদায় করতে না পারায় সংকট তৈরি হচ্ছে; রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে বিপুল অঙ্কের খেলাপি ও মন্দ ঋণ রয়েছে; ব্যাংকগুলোর আইটি সেক্টর সুরক্ষিত না; আমানত সংগ্রহে অসম প্রতিযোগিতা; সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে পরিচালকদের অযাচিত হস্তক্ষেপ; বাংলাদেশ ব্যাংকসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে সিবিএ নেতাদের দৌরাত্ম্য রয়েছে। সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, ব্যাংকি খাতে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের ঘটনায় জনমনে আস্থাহীনতা ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। পুঁজিবাজার, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, বেসিক ব্যাংক ও ডেসটিনি কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা চুরির ঘটনা। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা উত্তরণে এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এ খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। অনিয়ম-দুর্নীতি রোধে ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় করণীয় সম্পর্কে সুজনের প্রতিবেদনে বলা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কার ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা; বেসরকারি ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা; কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেয়া এবং অপরাধীদের শাস্তি দেয়া; আর্থিক স্বচ্ছতার জন্য অভ্যন্তরীণ অডিট; পরিচালক নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠন; তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনগুলো বাস্তবায়ন; খেলাপি ঋণ রোধে ট্রাইব্যুনাল গঠন; ট্রেড ইউনিয়নের দৌরাত্ম্য বন্ধ; সৎ-নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।

No comments:

Post a Comment