Saturday, April 2, 2016

ধ্বংসস্তূপের নিচে বেচারামের দেড় ঘণ্টা

এখনও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি বেঁচে ফিরেছেন। গতকাল হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এখনও শিউরে উঠছেন  বেচারাম পোড়েল। স্থানীয় পোস্তা থানার কনস্টেবল তিনি। বাড়ি হুগলীতে। প্রতিদিনের মতো এদিনও তার ডিউটি ছিল গণেশ টকিজের কাছের ক্রশিংয়ে। বসেছিলেন ফ্লাইওভারের নিচের পুলিশ কিয়স্কের মধ্যে। বৃহস্পতিবার ফ্লাইওভারের একটা অংশ ভেঙে পড়েছিল সেই কিয়স্কের উপরে। ভারী কিছু একটার আঘাতে চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া কিয়স্কের  মধ্যেই এক ধারে ছিটকে পড়েছিলেন তিনি। কিয়স্কের মধ্যে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে এই ভাবে আটকে ছিলেন টানা দেড় ঘণ্টা। সহকর্মীরা এসে উদ্ধরকারীদের সহায়তায় উদ্ধার করে তাকে নিয়ে যান হাসপাতালে।
অলৌকিকভাবেই বেঁচে গিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবারের ঘটনা বলতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন, মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে মুখের সামনে শুধু পরিবারে মুখগুলোই ভেসে উঠছিল। এমনভাবে আটকে পড়েছিলেন যে, মাথাও ঘোরাতে পারছিলেন না। বুকে, পিঠে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছিল। সঙ্গের মোবাইল ফোনটা খোঁজ করে পেলেন না। এর কিছুক্ষণ পরেই মোবাইল বেজে ওঠায় কোনোমতে হাতড়ে সেটি সংগ্রহ করে দেখেন পোস্তা থানার নম্বর।  থানাকে  জানান, তিনি কিয়স্কের মধ্যেই চাপা পড়ে রয়েছেন। তারপর অনন্ত প্রতীক্ষা। ভাবছেন, কেউ তো বাঁচাতে এলেন না।  অগত্যা চোখ বন্ধ হয়ে এসেছিল। তবে বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষার পর হাজির হয় উদ্ধারকারী দল। সঙ্গে পোস্তা থানার তার সহকর্মীরা।
গ্যাস কাটার দিয়ে ধ্বংসস্তূপ কেটে তাঁকে উদ্ধার করতে লেগে যায় দেড় ঘণ্টা। ততক্ষণে জ্ঞান হারিয়েছেন বেচারাম। জ্ঞান যখন ফিরল তখন তিনি হাসপাতালের বিছানায়। সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা। ঘিরে রয়েছেন পরিবার আর সহকর্মীরা। তবে শুক্রবার খানিকটা ধাতস্থ হয়ে জানিয়েছেন, ভগবানের দয়াতেই সব সম্ভব হয়েছে। এদিকে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার কলকাতা মেডিকেল কলেজের হাসপাতালের নানা মর্মান্তি দৃশ্যেও মুখোমুখি হতে হয়েছে উপস্থিত মানুষকে। যাদের অধিকাংই এসেছিলেন পরিজনের খোঁজ করতে। আর অনেকে এসেছেন তাদেও প্রিয় জনের দেহ শনাক্ত করতে। এমই একজন বছর পঁচিশের তরুণ অভিষেক কানোরি। তার বাবা-মা বড়বাজার মালাপাড়ার বাসিন্দা অজয় ও সরিতা কানোরি একসঙ্গে ব্যাঙ্কে গিয়েছিলেন টাকা তুলতে। আর ফেরেননি। এই দুর্ঘটনার খবর পেয়ে বার বার বাবার মোবাইলে  যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলেন অভিষেক। যোগাযোগ হয়নি। হাসপাতালে এসেই জানতে পারেন তার বাবা-মা দু’জনই মারা গিয়েছেন। ইমারজেন্সিতে বাবা-মা’র নিথর দেহ দেখে ছিটকে বেরিয়ে এসেছিলেন। ছোট ভাইকে সামলাতে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞানও হারিয়েছিলেন। পরে অবশ্য জ্ঞান ফেরার পর দেহদু’টি  শনাক্ত করেছেন।
মৃত ২৫, সাসপেন্ড দুই প্রকৌশলী
উত্তর কলকাতায় জোড়াসাঁকো এলাকায় বিবেকানন্দ রোডে ও চিৎপুর রোডের সংযোগস্থলে নির্মীয়মাণ ফ্লাইওভার ধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫। গতকাল সকালেই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ৩টি মৃতদেহকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও বিপজ্জনকভাবে ঝুলে থাকা গার্ডারের নিচে একটি লরির মধ্যে একটি মৃতদেহ আটকে রয়েছে। সেটিকে এদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত বের করা সম্ভব হয়নি। নবান্ন সূত্রে জানা গেছে, ওয়াশিংটন থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টেলিফোনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে সর্বশেষ পরিস্থিতির খোঁজ নিয়েছেন। সে সঙ্গে তিনি সব রকম সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। গতকালই ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত কলকাতা মেট্রোপলিটন অথরিটির দুই প্রকৌশলীকে সাসপেন্ড করা হয়েছে।
উদ্ধারকারীদের সূত্রে বলা হয়েছে, দুটি রাস্তার সংযোগস্থলের অংশটি পরিষ্কার করে ফেলা সম্ভব হয়েছে। তবে পশ্চিমদিকে যে অংশে গার্ডার বিপজ্জনকভাবে ব্যালান্সিং পিলার থেকে ঝুলছে সেই অংশ পরিষ্কার করতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। প্রযুক্তিবিদ এবং সিভিল ও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ব্রিজ ও ফ্লাইওভারগুলির রক্ষণাবেক্ষণ এবং সেসব ঠিকভাবে বানানো হচ্ছে কি না, উন্নত দেশগুলিতে যার মাধ্যমে সে সবের ওপর নজর রাখা হয়, সেই ‘ব্রিজ সেফ্‌?টি অডিট সফ্‌?টওয়্যার’ই নেই আমাদের দেশে। তাদের অভিযোগ, এ ব্যাপারে কোনও হেলদোলও নেই সরকারের। নেই জাতীয় স্তরের ‘ন্যাশনাল ব্রিজ লাইব্রেরি’ও। এমনকি, নির্মীয়মাণ ব্রিজ, ফ্লাইওভারগুলোর ওপর নজর রাখার জন্য নেই প্রায় প্রতিদিনের ‘ব্রিজ হেল্‌?থ মনিটরিং ব্যবস্থা’ও। এদিকে, ফ্লাইওভার ভেঙে পড়ার পরই শুরু হয়ে গিয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। অভিযোগ ও পাল্টা-অভিযোগ চলছে শাসক ও বিরোধীদের মধ্যে। গত বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাপিয়েছিলেন বাম জমানার উপর। গতকাল মেদিনীপুরের দাঁতনে জনসভা করতে গিয়েও তিনি বলেছেন, ওরা ৩-৪টে সেতু তৈরি করেছে। সেগুলো ভেঙে গিয়েছে। আমাদের সেগুলো তৈরি করতে হচ্ছে। এমন প্ল্যানিং আর টেন্ডার করল যে ভেঙেই গেল।
এই দুর্ঘটনার পিছনে সেতুতে ত্রুটি থাকার বিষয়টি স্বীকার করতে চায়নি রাজ্য প্রশাসন। কিন্তু সেই বক্তব্য থেকে কার্যত সরে এসে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, সেতুর নকশাতে যে গলদ ছিল একজন জনপ্রতিনিধি হিসাবে সেটা সরকারকে সেটা জানিয়েছিলেন। তখন প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ হয়ে গিয়েছিল। সে সঙ্গে ফান্ডিংয়ের সমস্যাও ছিল। তবে এগুলো যে বাম আমলে টেন্ডার নেয়া হয়েছিল সে অভিযোগও তুলেছেন সুদীপ। তবে বিরোধীরা সরকারকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। সিপিআইএম সংসদ সদস্য মহম্মদ সেলিম বলেছেন, এ দায় সরকারকে নিতে হবে। সব জেনে-বুঝেও কেন চুপ ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী? গতকাল ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে এনডিআরএফের ডিজি সুরজিত সিং গুলেরিয়া জানিয়েছেন, গতকাল রাত থেকে এদিন দুপুর পর্যন্ত উদ্ধার কাজ চলেছে। সেনাবাহিনী উদ্ধার কাজ শেষ করে ফিরে গিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আর কোনও মৃতদেহ নেই বলেই মনে করছেন উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে একটি যাত্রীবোঝাই মিনিবাস ও একটি পুল কার আটকে রয়েছে বলে যে আশঙ্কা করা হয়েছিল তা ঠিক নয় বলে জানানো হয়েছে। মৃতের সংখ্যা নিয়ে স্থানীয় মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
স্থানীয় অনেক মানুষই জানিয়েছেন, মৃতের সংখ্যাটা বিশ্বাস করতে পারছি না। ফ্লাইওভারটি ভেঙে পড়ার সময় রাস্তায় ছিল অনেক গাড়ি, দাঁড়িয়ে থাকা লরি, বহু মজুর এবং পথচারী। তাদেও আরও ক্ষোভ, সময়মতো প্রযোজনীয় সরঞ্জাম এনে উদ্ধার কাজ শুরু করা গেলে অনেককেই বাঁচানো সম্ভব হতো। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইতিমধ্যেই তদন্ত কমিটি গঠন করে কিভাবে ফ্লাইওভারটি ভেঙে পড়েছে এবং কারা দোষী তা খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছে। সেসঙ্গে রাজ্যে নির্মাণাধীন সব সেতুর স্বাস্থ্য পরক্ষীকারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই নির্মাণ সংস্থা আইভিআরসিএলের কলকাতার তিনটি অফিস পুলিশ সিল করে দিয়েছে।
এদের বিরুদ্ধে এবং মাল সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত খুনের অভিযোগে পুলিশ জোড়াসাঁকো থানায় তিনটি এফআইআর করেছেন। নির্মাণকারী সংস্থার পক্ষে গতকাল এটিকে ভগবানের কাজ বলে সাফাই দিলেও গতকাল বিকালের পর থেকেই সংস্থার আধিকারিকরা লাপাত্তা হয়ে গিয়েছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে আচমকাই ভেঙে পড়েছিল বিবেকানন্দ রোড ফ্লাইওভারের একাংশ। কংক্রিটের গার্ডারের তলায় চাপা পড়েন বহু মানুষ, অসংখ্য গাড়ি। তবে স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, উদ্ধারকাজ শুরু হতে অনেক দেরি হয়েছে। তাছাড়া এ ধরনের ধ্বংসস্তূপ সরানোর মতো কোনও সরঞ্জামই উদ্ধারকারীদের কাছে ছিল না। পরে সেনাবাহিনীকে ডাকা হলে বিকালের পর পুরোপুরি উদ্ধার কাজ শুরু হয়। আসেন কেন্দ্রীয় এনডিআরএফের সদস্যরাও। সারা রাত চলেছে উদ্ধার কাজ। গতকাল দুপুরের পরও চলে উদ্ধার কাজ।

No comments:

Post a Comment