Wednesday, April 27, 2016

আনসার আল ইসলামের দায় স্বীকার, দুটি মামলা

জুলহাজ মান্নান, মাহবুব তনয়
রাজধানীর কলাবাগানে বাসায় ঢুকে জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব রাব্বী তনয়কে হত্যার দায় স্বীকার করেছে আল-কায়েদা ভারতীয় উপমহাদেশের (একিউআইএস) কথিত বাংলাদেশ শাখা ‘আনসার আল ইসলাম’। গতকাল মঙ্গলবার বেলা দেড়টার দিকে আনসার আল ইসলামের নামে খোলা টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় এ দায় স্বীকারের বার্তা প্রচার করা হয়। এই বিবৃতির বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ‘এর আগে দায় স্বীকারের ঘটনায় যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল, তাদের সঙ্গে ঘটনায় জড়িত থাকার কোনো সম্পৃক্ততা মেলেনি। তারপরও আমরা এবারের বিষয়টিও খতিয়ে দেখছি।’ পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহিদুল ইসলাম গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এই হত্যার মিল রয়েছে। তবে তদন্ত না করে এখনই নিশ্চিত হওয়া যাবে না কোনো জঙ্গি সংগঠন এ ঘটনা ঘটিয়েছে কি না। তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ড সুপরিকল্পিত বলে মনে হচ্ছে। কলাবাগানে জোড়া খুনের ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। পালিয়ে যাওয়ার সময় এক দুর্বৃত্তের কাছ থেকে উদ্ধার করা ব্যাগ থেকে পাওয়া আলামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। এদিকে লাশের ময়নাতদন্তকারী সূত্র বলেছে, দুজনকেই উপর্যুপরি কোপানো হয়েছে। নিহত দুজনকে গতকাল দাফন করা হয়েছে। আনসার আল ইসলামের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ শাখার মুজাহিদিনরা বাংলাদেশে সমকামিতা প্রসারের পথিকৃৎ, সমকামীদের গুপ্ত সংগঠন রূপবানের পরিচালক জুলহাজ মান্নান ও তাঁর সহযোগী মাহবুব তনয়কে হত্যা করেছে।’ আনসার আল ইসলাম রূপবানকে গুপ্ত সংগঠন দাবি করলেও এটি গুপ্ত সংগঠন নয়, এটি মূলত সমকামীদের অধিকারবিষয়ক একটি সাময়িকী। এটি ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম বের হয়। এরপর মাত্র একটি সংখ্যা বের হয়েছিল। জুলহাজ ছিলেন সাময়িকীটির একজন সম্পাদক। গত সোমবার কলাবাগানের বাসায় ঢুকে জুলহাজ মান্নান ও তাঁর বন্ধু মাহবুবকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। জুলহাজ যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য সংস্থা ইউএসএআইডিতে কর্মরত ছিলেন। মাহবুব ছিলেন লোকনাট্য দলের সঙ্গে যুক্ত। দুর্বৃত্তদের কোপে আহত বাড়ির প্রহরী পারভেজ মোল্লা এবং কলাবাগান থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মমতাজ উদ্দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দুই মামলা: জুলহাজ ও মাহবুব হত্যার ঘটনায় কলাবাগান থানায় দুটি মামলা হয়েছে। একটি হত্যা মামলা, অন্যটি অস্ত্র আইনে। কলাবাগান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) হাসান মাহমুদ গতকাল বলেন, নিহত জুলহাজ মান্নানের ভাই মিনহাজ মান্নান হত্যা মামলাটি করেছেন। সরকারি কাজে বাধা ও অস্ত্র আইনে মামলা করেছেন ঘটনার সময় ঘটনাস্থলের কাছে দায়িত্ব পালন করা উপপরিদর্শক শামীম আহমেদ। দুটি মামলায়ই অজ্ঞাতনামা পাঁচ-ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে। কলাবাগান থানার পুলিশের সূত্র বলেছে, পালিয়ে যাওয়ার সময় এক দুর্বৃত্তের কাছ থেকে উদ্ধার করা ব্যাগ থেকে পাওয়া একটি দেশি ও একটি বিদেশি পিস্তল, গুলি, চাপাতি, একটি গামছা, একটি লুঙ্গিসহ নয় ধরনের আলামত পাওয়া গেছে। এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে পুলিশ। এক পুলিশ সদস্য ব্যাগটি উদ্ধার করেন। পালাতে থাকা দুর্বৃত্তদের আটকাতে গিয়ে ধারালো অস্ত্রের কোপে আহত হন এএসআই মমতাজ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আলামত ধরে তদন্ত চলছে। এসব ঘটনায় জামায়াত-শিবিরসহ জঙ্গি সদস্যরা জড়িত থাকতে পারে। তবে তারা সব একই। আমরা অনেকগুলো হত্যার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করেছি। এগুলোর বিচারকাজ চলছে।’ তিনি বলেন, ‘সব হত্যার বিচার হবে। এ বিষয়ে গোয়েন্দারা সচেতন রয়েছেন। সারা পৃথিবীতে অস্থিরতা চলছে, সে তুলনায় আমরা নিয়ন্ত্রণে আছি।’ উপর্যুপরি কোপানো হয়েছে: জুলহাজ ও মাহবুরের লাশের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুজনকেই উপর্যুপরি কোপানো হয়েছে। জুলহাজের মাথার বাঁ দিকে গভীর গর্ত হয়ে মগজ বেরিয়ে যায়। এতে তাঁর মৃত্যু হয়। মাহবুবের মাথার পেছনে ও ঘাড়ে উপর্যুপরি কোপ ছিল। তাঁর স্পাইনাল কর্ড কেটে যায়। এতেই তাঁর মৃত্যু হয়। দুজনেরই হাতে কোপ ছিল। ধারণা করছি, বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তাঁরা।’ লাশ দাফন: জুলহাজের বড় ভাই মিনহাজ মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, বাদ জোহর কলাবাগানে তাঁদের বাসা-সংলগ্ন তেঁতুলতলা মাঠে জুলহাজের জানাজা হয়। বাদ আসর বনানী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। জুলহাজকে কেউ কখনো হুমকি দিয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন তথ্য তাঁর বা তাঁর পরিবারের জানা নেই।জুলহাজের বাড়ি চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলায়। মাহবুবের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে প্রথমে শিল্পকলা একাডেমিতে নেওয়া হয়। পরে শেওড়াপাড়ার বাসায় নেওয়া হয়। মিরপুরের জান্নাতুল মাওয়া কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয় বলে জানান তাঁর বোন জাকিয়া রাব্বী। তাঁদের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলে। এদিকে কলাবাগানে জোড়া খুন মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আগামী ২৪ মে দিন ধার্য করেছেন আদালত। গতকাল ঢাকার মহানগর হাকিম নুরুন্নাহার ইয়াসমিন এ আদেশ দেন।

No comments:

Post a Comment