Thursday, April 14, 2016

আজ বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ

আজ বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ। মহাকালের গর্ভে মুখ লুকাল ১৪২২। ১৪২৩-এর প্রথম সূর্যোদয়। আর এর সঙ্গে সময়, প্রকৃতি, ঐতিহ্য ছুঁয়ে গেলে জীবনকে। তা না হলে চারপাশে বিশ্বায়নের দাপটে পৃথিবী যখন এক পরিবার সে তুমুল হুল্লোড়ের মধ্যেও নিজস্ব উৎসবের এমন নিপাট আয়োজন! যে উৎসবের উচ্ছ্বাসে, স্বতঃস্ফূর্ততায়, রঙে, সুরে সমৃদ্ধ সকাল-দুপুর-বিকেল, সারাবেলা। যতই ব্যস্ততা ঘিরে রাখুক দশদিগন্ত, যতই প্রলুব্ধ করুক বিশ্বায়নের আহ্বান, মনের গহিনে নিরন্তর বহমান রহস্যমাখা ‘ধানসিঁড়ির’ সে চোরা স্রোত। ‘যেন এ গাঙ্গুরের ঢেউয়ের আঘ্রাণ লেগে থাকে চোখেমুখে/রূপসী বাংলা যেন বুকের ওপর জেগে থাকে।’ আজ সোমবার পহেলা বৈশাখে রাজধানীসহ দেশের নানা স্থানে আয়োজিত হচ্ছে বৈশাখী মেলার। সাধারণত নদীর তীর, হাট-বাজার, বটতলা কিংবা গ্রাম-গঞ্জে বৈশাখী মেলার আয়োজন হয় বেশি। তবে এসব স্থানে মেলার আয়োজন কমে গেছে, অন্যদিকে বেড়েছে শহরকেন্দ্রিক মেলা। নিরন্তর বয়ে চলা সময়ের গতিপথে পলকের যতিচিহ্ন। আবার শুরু যাত্রা। নবযাত্রা। আর নতুন যাত্রা শুরুর এ দিনটিই বাঙালির জাতি দর্শনের একমাত্র সর্বজনীন ঠিকানা। সেজন্যই সবাই আজ বাইরে। উৎসবের স্বকীয় মেজাজে পুরো দেশ। এই যে প্রাণের টান, বাঙালিয়ানার পরিপূর্ণ নিজস্বতাকে এমন আলিঙ্গন এ কৃষ্টি, এ সংস্কৃতি জাতি হিসেবে আমাদের অবশ্যই গর্বিত করে। আপন ঐতিহ্যের প্রতি এমন নিমগ্নতা, নিঃশর্ত ভালোবাসায় নিঃসৃত আবেগ আর প্রগাঢ় মন্থনেই শুধু সৃষ্টি হতে পারে এমন কীর্তি। আর সে কীর্তির অনুপম রূপকার বাঙালি জাতি। নববর্ষ মানে নিজস্বতার সন্ধান। জীবনকে সাজানো আপন ঐতিহ্যে। ‘তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও আমি এই বাংলার পারে রয়ে যাব; দেখিব কাঁঠাল পাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে ...।’
নববর্ষ মানে দিনমান পথে-প্রান্তরে লাল-সাদা-কমলার বন্যা। সুতি শাড়ি, পাঞ্জাবি। লাল-সবুজ টিপ। ব্যবসালয়ে, প্রিয় ঠিকানায় গাঁদার কারুকাজ। নববর্ষ মানে নতুন পাঁজি, লাল প্রচ্ছদের হালখাতার উৎসব। পুরনো বন্ধুর সঙ্গে প্রাণময় আড্ডা। প্রিয় মানুষটির পাশাপাশি উদ্দেশ্যহীন হেঁটে চলা। নববর্ষ মানে লোকজ প্রান্তিক সংস্কৃতির ধুমধাম আয়োজন নাগরিক করিডরে। লাল টুকটুকে মাটির পুতুল, বাঁশি, একতারা, ডুগডুগি, মুড়ি-খই-নাগরদোলার প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ব। সবকিছুর মূলেই ওই আপন সংস্কৃতির প্রতি সুপ্ত নিবিষ্টতা। সে জন্যই হয়তো আজ পাঁচতারা হোটেলে গিয়েও পানি-ভাত, সর্ষে-ইলিশের আবদারও অপরাধ নয়। বাংলিশ এসএমএসে লোকজ কথামালাও জায়েজ। নববর্ষের দিনে নতুন হুল্লোড়ে, আশ্বাসে উšে§লিত হয় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, অতুল প্রসাদ, লালনের মানসদর্শন। প্রশ্ন জাগে বৈশাখ আবাহনে এত উচ্ছ্বাস আর পরিপাটি আয়োজন কেন? বৈশাখ মানে ঝলমলে রোদ, চিরবিড়ে গরম, হররোজ দুপুরে হঠাৎ হঠাৎ দমকা বাতাস, বিকেলে আকাশ কালো করে তেড়েফুঁড়ে কালবৈশাখী, মেঘের কলসি উপুড় করে ঝুম বৃষ্টি। আসলে সময় বৈশাখকে দিয়েছে ঝোড়ো যৌবন, রুদ্র চরিত্র, আস্রাসনের স্বাধীনতা। সব মিলে এই সময়টার একটা যৌবন আছে। আর কে না জানে, মানুষ বরাবরই যৌবনের পূজারি।
কংক্রিটের নাগরিক করিডরে বসবে গ্রাম-বাংলার সে চিরন্তন বারোয়ারি মেলা। সবাই গলা মেলাবেন এসো হে বৈশাখ, এসো ঝড় হয়ে, এসো বৃষ্টি ঝরিয়ে, এসো নতুন করে শুরুর প্রেরণা নিয়ে। বাংলা, বাঙালিয়ানাই আমাদের শেষ ঠিকানা। আসুন, আজকের দিনে সবাই বাংলার গান গাই। নিমগ্ন হই নিজস্ব সংস্কৃতিতে। শপথ নিই স্বপ্নের দেশ গড়ার। শুভ নববর্ষ ১৪২১।
পহেলা বৈশাখে সরকারি ছুটি। দিবসটি উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, গণফোরাম সভাপতি ড. কামালসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা।
এদিকে বৈশাখী উৎসবকে উপভোগ্য করতে রাজধানীতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বর্ষবরণের মূল অনুষ্ঠানস্থল রমনার বটমূলসহ গোটা এলাকায় বসানো হয়েছে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। প্রতিটি প্রবেশ পথে আর্চওয়ের মধ্য দিয়ে দর্শনার্থীদের প্রবেশ করতে হবে। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চারুকলা ইনস্টিটিউট ও রবীন্দ্র সরোবরসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিতব্য ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণের সব অনুষ্ঠান ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পোশাকধারী র‌্যাব-পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দর্শনার্থীদের সঙ্গে মিশে থাকবেন। রাজধানীর ২২টি পয়েন্টে রোড ব্লক ও তল্লাশি চৌকি বসানো হয়েছে। রমনা পার্ক ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পুলিশের উপ-নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করা হবে।
গতকাল রোববার দুপুরে রমনা বটমূল ঘিরে নেয়া আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন প্রস্তুতি পরিদর্শন করেন আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার। শান্তিপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্যই রমনায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এ সময় উৎসবকে নির্বিঘœ রাখতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করারও আহ্বান জানান আইজিপি।
নববর্ষ উদযাপন
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বর্ষবরণ উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর রমনার বটমূলে। এটি প্রায় ৫১ বছর ধরে আয়োজন করে আসছে দেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। আজ ভোর সোয়া ৬টায় এসরাজ-বাঁশি-বেহালার সুরালাপ দিয়ে শুরু হবে ছায়ানটের অনুষ্ঠান। গান ও কথায় আয়োজনকে মাতিয়ে রাখবেন ছায়ানটের শিল্পীরা।
নববর্ষকে বরণ উপলক্ষে আয়োজিত উৎসবের মধ্যে অন্যতম মঙ্গল শোভাযাত্রা। বর্ষবরণের অসাম্প্রদায়িক এ উৎসবে আজ মেতে উঠবে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে আপামর বাঙালি। আজ সকালে চারুকলা থেকে ২৬তম এ মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হবে।
বাঙালির সার্বজনীন উৎসবকে সরকারিভাবে উদযাপনে নানা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। রমনা বটমূলে ছায়ানট আয়োজিত অনুষ্ঠান বিটিভি ও বেতারে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। পত্র-পত্রিকায় থাকবে বিশেষ ক্রোড়পত্র। শিল্পকলা একাডেমি ও শিশু একাডেমি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলা একাডেমী ও বিসিক, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, জাতীয় জাদুঘরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান- মেলা, লোক উৎসব, পিঠা উৎসব এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে। দেশের সব কারাগার, হাসপাতাল ও এতিমখানায় উন্নত খাবার পরিবেশন করা হবে।
নববর্ষ উযদাপন উপলক্ষে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। মহানগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আজ সকাল সাড়ে ৭টায় রাজধানীর বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে একটি বর্ষবরণ র‌্যালি বের হবে। র‌্যালিটি বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে শুরু হয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে শেষ হবে।
জাতীয়তাবাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের আয়োজনে নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ের সামনে আজ দিনব্যাপী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করবে বিএনপি। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচতলায় ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের কার্যালয় ও এর লাগোয়া ফুটপাতে মহিলা দলের উদ্যোগে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। বিকাল ৩টায় জাসাসের উদ্যোগে আলোচনা সভা ও বিভিন্ন গুণী শিল্পীদের অংশগ্রহণে সংগীতানুষ্ঠান রয়েছে।
‘হাজারও কণ্ঠে কোটি বাঙালির বর্ষবরণ’ শিরোনামের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে সুরের ধারা ও চ্যানেল আই। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সবার জন্য উন্মুক্ত এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন অনেক খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী। ‘জাগো নব আনন্দে’ আহ্বান নিয়ে শাহবাগ শিশুপার্কের সামনে নারকেলবীথি চত্বরে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর বর্ষবরণ আয়োজন হবে আজ সকাল সাড়ে ৭টায়। ধানম-ির রবীন্দ্র সরোবরে পহেলা বৈশাখে মিলনমেলার আয়োজন করেছে দূরবীন ব্যান্ড। সকাল ৮টা থেকে শুরু হবে অনুষ্ঠানটি। ধানম-ির আবাহনী মাঠে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশেষ কনসার্ট।

No comments:

Post a Comment