Tuesday, April 5, 2016

‘কঠোর’ নির্বাচন কমিশনের প্রত্যাশা! by এ কে এম জাকারিয়া

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সামনের ধাপগুলোতে বিএনপি থাকবে কি থাকবে না, তেমন একটি আলোচনা উঠেছে দলটির মধ্যে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। জানা গেছে, অধিকাংশ নেতাই আপাতত নির্বাচনে থাকার পক্ষেই মত দিয়েছেন। আজ সোমবার রাতে খালেদা জিয়া একই বিষয় নিয়ে ২০-দলীয় জোটের নেতাদের সঙ্গে কথা বলবেন বলে বিএনপির সূত্র নিশ্চিত করেছে। এই যখন পরিস্থিতি, তখন নির্বাচন কমিশনকে ‘কঠোর’ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, ‘আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি। কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীন। নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও অবাধ করার জন্য তারা যেকোনো ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে। কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’ গত দুই দফার ইউপি নির্বাচনে আমাদের যে অভিজ্ঞতা হলো, তারপর হানিফের এই বক্তব্যকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করব? নির্বাচন কমিশন যে ‘স্বাধীন’, তা কি নির্বাচন কমিশন নিজেই ভুলে গিয়েছিল? সরকারি দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদককে তাই বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিতে হয়েছে, নাকি সরকারি দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার ‘অনুমতি’ দেওয়া হলো। নির্বাচন কমিশনকে বলে দেওয়া হলো, নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও অবাধ করতে যেকোনো ধরনের পদক্ষেপ তারা নিতে পারবে। বোঝা গেল, ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম দুই দফা নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করেনি বা করতে পারেনি। নির্বাচনকে ‘শান্তিপূর্ণ ও অবাধ’ রাখতে যেসব ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল, তা তারা নেয়নি। এর ফলাফল আমরা গত দুই পর্বের নির্বাচনে দেখলাম। নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৪ জন, নির্বাচনের নামে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেন অসংখ্য প্রার্থী। চেয়ারম্যান পদে দলীয় ভিত্তিতে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত এবারের নির্বাচনে বহু আসনে অবিশ্বাস্যভাবে বিএনপির কোনো প্রার্থীই পাওয়া গেল না। স্থানীয় সরকারের এই স্তরের নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের মধ্যে যে উৎসাহ উদ্দীপনা থাকার কথা, তার কিছুই দেখা গেল না। ভোটকেন্দ্র দখল আর সিল ছাপ্পর মারার নির্বাচনের যে ঐতিহ্য এক সময় দেশে ছিল, তা যেন আবার ফিরে এল। যেকোনো নির্বাচনে শেষ বিচারে নির্বাচনের ফলাফলই আসল কথা। এমন নির্বাচনী পরিস্থিতিতে ফলাফল যা হওয়ার কথা তা-ই হয়েছে প্রথম দুই দফা নির্বাচনে। সরকারি দলেরই জয়জয়কার। প্রশ্ন হচ্ছে, হঠাৎ নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে সরকারি দলের কঠোর ভূমিকা প্রত্যাশিত হয়ে পড়ল কেন? সামনের দফা নির্বাচনগুলোতে বিএনপিকে ধরে রাখাতে? নাকি অন্য কিছু? আওয়ামী লীগের মূল্যায়ন হচ্ছে, ইউনিয়ন পরিষদের পরের দফা নির্বাচনগুলো থেকে সরে গেলে দল হিসেবে বিএনপির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। আওয়ামী লীগের এই মূল্যায়নের যথার্থতা থাক বা না থাক, বিএনপি নির্বাচনে থাকবে কি থাকবে না, সেটা তাদের হিসাব-নিকাশের ব্যাপার। তবে নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি যদি অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে তা কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের মাথাব্যথার কারণ নয়। বিএনপির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার দায়ও আওয়ামী লীগের নয়। সমস্যাটি হচ্ছে, নির্বাচন থেকে বিএনপি সরে গেলে আওয়ামী লীগের মধ্যে অন্তঃকলহ যেমন বাড়তে পারে, তেমনি সহিংসতাও আরও ব্যাপক হতে পারে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতার মধ্যে এমন আশঙ্কা রয়েছে। গত দুই পর্বের নির্বাচনে যে সহিংসতা আমরা দেখলাম তা মূলত আওয়ামী লীগ ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যেই ঘটেছে। এসব ঠেকাতে হলে নির্বাচন কমিশনের ‘কঠোর’ ভূমিকার দরকার আছে বৈকি!  আমরা বুঝতে পারছি, নির্বাচন কমিশনের ‘স্বাধীন’ ভূমিকা পালন বা নির্বাচনকে ‘অবাধ ও শান্তিপূর্ণ’ করতে দরকারি সব ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভবত সরকারি দলের স্বার্থেই এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকারি দল যখন নির্বাচন কমিশনকে ‘স্বাধীন’ ভূমিকা পালনের ‘অনুমতি’ দিয়েছে অথবা নির্বাচন কমিশনকে তার স্বাধীনতার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, আগামী পর্বের নির্বাচনগুলোতে তার কী ফল মিলবে, কে জানে!

No comments:

Post a Comment