Monday, April 18, 2016

স্যান্ডার্সের মৌচাকে ঢিল by হাসান ফেরদৌস

বার্নি স্যান্ডার্স
বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে হলভর্তি দর্শকদের সামনে ডেমোক্রেটিক পার্টির দুই প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ও বার্নি স্যান্ডার্স তাঁদের নবম বিতর্কে অংশগ্রহণ করেন। বিতর্কের একপর্যায়ে ইসরায়েল সম্বন্ধে এক প্রশ্নের জবাবে স্যান্ডার্স মন্তব্য করেন, ২০১৪ সালে গাজায় হামাসের রকেট হামলার জবাবে ইসরায়েল যে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে, তা ছিল প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি। স্যান্ডার্স তর্জনী উঁচিয়ে মন্তব্য করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়েরই উচিত হবে ফিলিস্তিনের জনগণকে ‘সম্মান ও মর্যাদা’ প্রদর্শন করা। যুক্তরাষ্ট্র অনন্তকাল ইসরায়েলের প্রতি একপেশে অবস্থান নিয়ে থাকতে পারে না। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যদি ন্যায়বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হই, তাহলে আমাদের একসময় না একসময় বলতেই হবে যে (ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী) নেতানিয়াহু যা করেন সব সময় তা ঠিক নয়।’ ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন নীতির এই সমালোচনা রীতিমতো বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। নিউইয়র্ক থেকে নির্বাচিত ডেমোক্রেটিক ইহুদি কংগ্রেসম্যান এলিয়ট অ্যাঙ্গেল সক্ষোভে বলেছেন, লোকটার কথাবার্তা রীতিমতো আপত্তিকর ও অপমানজনক। অ্যাঙ্গেল বিরক্তির সঙ্গে বলেন, স্যান্ডার্স বড্ড বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন। তাঁর এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তা দলের অতি-উগ্র বামপন্থীদের হাতে ইসরায়েলকে যা খুশি বলে আক্রমণ করার ‘লাইসেন্স’ তুলে দেবে। এমন নয় যে স্যান্ডার্স এই প্রথম এমন কথা বললেন। তিনি নিজে ইহুদি এবং ইহুদি ধর্ম ও ইতিহাস শিক্ষার লক্ষ্যে ইসরায়েলে ইহুদি আখড়ায় অধ্যয়ন উপলক্ষে কয়েক মাস কাটিয়ে আসেন। তা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনের জনগণের অধিকারের সমর্থনে তিনি কথা বলেছেন। ২০১৪ সালে ইসরায়েলের গাজা আক্রমণকে তিনি শক্ত ভাষায় সমালোচনা করেছিলেন। অবৈধ বসতি স্থাপনেরও তিনি কড়া সমালোচক। স্যান্ডার্স অবশ্য সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নিজেকে আত্মরক্ষা করার অধিকার ইসরায়েলের আছে, সে কথাও বরাবর বলে এসেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েল প্রশ্নে তাঁর সমালোচনা আরও তীব্রতর হয়েছে। কিছুদিন আগে তাঁকে ভাষণ দিতে আমন্ত্রণ করেছিল শক্তিশালী লবিং গ্রুপ আমেরিকান-ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি, কিন্তু তিনি সে আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেন। হিলারি ক্লিনটন যথারীতি সে কমিটির সামনে গিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে আমেরিকার আজীবন ও নিঃশর্ত বন্ধুত্বের পক্ষে লম্বা ভাষণ দিয়ে আসেন। সে কথা উল্লেখ করে স্যান্ডার্স মন্তব্য করেন, তাঁর দীর্ঘ ভাষণের কোথাও হিলারি ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকারের সমর্থনে কোনো মন্তব্য করেননি।
নেতানিয়াহু সম্বন্ধে স্যান্ডার্সের মন্তব্যে বিস্ময়ের কারণ, নির্বাচন সামনে রেখে এ দেশের ইহুদি লবি নাখোশ হবে জেনেও এমন মন্তব্য রীতিমতো আত্মহত্যার শামিল। নিউইয়র্ক টাইমস তার বিস্ময় চেপে না রাখতে পেরে প্রথম পাতায় এক দীর্ঘ মন্তব্য প্রতিবেদনে লিখেছে, আত্মরক্ষার খাতিরে ইসরায়েলের যা খুশি করার অধিকার আছে, এমন কথা বলে মার্কিন রাজনীতিকেরা বরাবরই একে অপরের চেয়ে অধিক মধুর সুরে ইসরায়েলের পক্ষে গান গেয়ে থাকেন। স্যান্ডার্স এই নিয়মের ব্যতিক্রম। তাঁর এই ভিন্ন অবস্থান নতুন প্রজন্মের ডেমোক্রেটিক সদস্যদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছে, তাতে দলের ভেতর ইসরায়েল প্রশ্নে মোড় ফেরানো ইঙ্গিত রয়েছে।
ম্যারিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শিবলি তেলহামি স্যান্ডার্সের বক্তব্যকে অভূতপূর্ব বলে বর্ণনা করেন। হাফিংটন পোস্ট ওয়েব পত্রিকাকে তিনি বলেন, ডেমোক্রেটিক পার্টির তৃণমূল পর্যায়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। স্যান্ডার্সের প্রার্থিতা সে কথার প্রমাণ। এটা কেবল সময়ের ব্যাপার ছিল, তিনি বলেন। শান্তির পক্ষে ইহুদি কণ্ঠস্বর, এই নামের একটি উদারনৈতিক ইহুদি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আরও স্পষ্ট বলেছেন, স্যান্ডার্সের এই অবস্থান আমাদের আনন্দিত করেছে। এ থেকে প্রমাণিত হয়, ফিলিস্তিনের নাগরিকদের অধিকারের প্রশ্নে এখন এ দেশের রাজনৈতিক মহলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থানে পরিবর্তন আসছে।
ইসরায়েলের ব্যাপারে কড়া কথা বলে স্যান্ডার্স হয়তো মৌচাকে ঢিল মেরেছেন, কিন্তু কেউ মনে করে না এর ফলে ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন নীতির পরিবর্তনের কোনো আশু সম্ভাবনা আছে

ব্রুকলিনের যে হলে স্যান্ডার্স-হিলারির বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে কেউ কেউ প্রকাশ্যে ‘ফ্রি ফিলিস্তিন’ বলে যে স্লোগান দেয়, ইহুদি বুদ্ধিজীবী পিটার বেইনার্ট সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে টাইমসকে বলেছেন, অনূর্ধ্ব ৩০ বছরের নতুন প্রজন্ম, যাদের ভেতর রয়েছে আফ্রিকান-আমেরিকান ও হিস্পানিক অভিবাসী, তারা অন্ধভাবে নেতানিয়াহুকে সমর্থন করে যাবে, তা ভাবার কোনো কারণ নেই।
ঘটনাটি রাজনৈতিক মহলে এতটা আলোড়ন তুলেছে যে কেউ কেউ বলা শুরু করেছেন, ওবামার এখন উচিত হবে কংগ্রেসের বাধা অগ্রাহ্য করে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। উদারনৈতিক হিসেবে পরিচিত ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো ইব্রাহিম ফ্রেইহাত যুক্তি দেখিয়েছেন, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দানের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির আমূল পরিবর্তন আনতে পারেন ওবামা। তিনি লিখেছেন, ছয় বছর আগে শান্তির জন্য যে নোবেল পুরস্কার তিনি পান, আর কিছু না হোক তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে ওবামার উচিত হবে অবিলম্বে এই স্বীকৃতি জানানো।
ইসরায়েলের ব্যাপারে কড়া কথা বলে স্যান্ডার্স হয়তো মৌচাকে ঢিল মেরেছেন, কিন্তু কেউ মনে করে না এর ফলে ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন নীতির পরিবর্তনের কোনো আশু সম্ভাবনা আছে। এ দেশে ইহুদি লবি যে এখনো কতটা শক্তিশালী, সে কথা খোদ স্যান্ডার্সের একটি সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত থেকেই বেশ বোঝা যায়। ইসরায়েলের বসতি স্থাপনা নীতির প্রবল সমালোচক হিসেবে পরিচিত তরুণ ইহুদি অ্যাকটিভিস্ট সিমন জিমারম্যানকে স্যান্ডার্স তাঁর প্রচারণা কমিটির একজন উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এর ঠিক দুই দিন পরে জানা গেল সিমন ফেসবুকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করে একাধিক রচনা প্রকাশ করেছেন। সে কথা প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বার্নি স্যান্ডার্স সিমনকে তাঁর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন।
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।

No comments:

Post a Comment