দেশের
ছয়টি জেলায় পরিচালিত ২৭টি পীস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ জামায়াতে
ইসলামীর আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা ও রাজনৈতিক আদর্শে পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ
উঠেছে। বিচ্ছিন্নভাবেও ‘পীস’ শব্দটি ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন নামে ঢাকাসহ
দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের শতাধিক স্কুল পরিচালিত হচ্ছে। অভিযোগ আছে,
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অনুমোদনের বাইরে জামায়াতের দলীয়
আদর্শের অনুকূল পাঠ্যবই পড়ানো হয় এসব স্কুলে। এসব স্কুলের পরিচালনা পর্ষদে
রয়েছেন জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা। আবার কোনো কোনো স্কুল
পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতা-কর্মী
ও সমর্থকেরাও রয়েছেন। ঢাকা, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, গাজীপুর, নোয়াখালী,
ফেনীসহ বিভিন্ন জেলায় নামে-বেনামে পরিচালিত স্কুলগুলোকে জামায়াত-শিবির
সাংগঠনিক কাজে ব্যবহার করছে সন্দেহ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
থেকে গত ১৩ মার্চ একটি প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো
হয়েছে। পীস স্কুলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জামায়াত-শিবিরের নেতা ও জড়িত সরকারি
কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এতে। এ ছাড়া
স্কুলের আয়ের উৎস ও ব্যয় খতিয়ে দেখতেও বলা হয়েছে। স্থানীয় জেলা প্রশাসক ও
পুলিশ সুপারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলার কথাও আছে প্রতিবেদনে। এ ছাড়া
প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের এসব প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করার জন্য
দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির মাধ্যমে নির্দেশ দেওয়ার সুপারিশও আছে। স্বরাষ্ট্র
মন্ত্রণালয় প্রতিবেদনটিকে ‘অতিগুরুত্বপূর্ণ’ উল্লেখ করে আইনশৃঙ্খলা-বিষয়ক
মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় উপস্থাপন করতে বলেছে। জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র
মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোজাম্মেল হক খান প্রতিবেদন পাওয়ার বিষয়টি
নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমরা পুলিশ সদর দপ্তরে চিঠি পাঠিয়ে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয়
ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।’ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ গতকাল
প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসব স্কুলের বিষয়ে আমাদের কাছেও গুরুতর অভিযোগ এসেছে।
আমরা শিক্ষা বোর্ডগুলোতে চিঠি পাঠিয়ে জানতে চেয়েছি কীভাবে স্কুলগুলো
অনুমোদন পেয়েছে, কারা এসব অনুমোদন দিয়েছে আর অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেছেন
কারা। এ ছাড়া যেসব অভিযোগ এসেছে, তা তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার
নির্দেশ দিয়েছি।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, শীর্ষস্থানীয় নেতারা মানবতাবিরোধী
অপরাধে অভিযুক্ত ও দণ্ডিত হওয়ায় পর্যুদস্ত জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক
ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে এনজিও, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ধর্মীয়
প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি শিক্ষা খাতে প্রভাব তৈরির কৌশল অব্যাহত রেখেছে। পীস
স্কুলের শিক্ষার্থীরা উগ্র ধর্মীয় মতবাদে দীক্ষিত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে
আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এসব স্কুলের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দল ও অন্যান্য দলের
নেতা-কর্মীদের যুক্ত করার মাধ্যমে জামায়াতের মতাদর্শভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম
তৈরির কৌশলও নেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে
বলা হয়েছে, কোনো কোনো পীস স্কুল পরিচালিত হয় ‘ইনভাইটস পীস লিমিটেড’
নামের একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এর চেয়ারম্যানের দায়িত্বে
রয়েছেন ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ও ঢাকা মহানগর জামায়াতের রোকন আবু জাফর
মুহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন ইসলামী
ছাত্রশিবিরের সাবেক স্কুল কার্যক্রম সম্পাদক ও বর্তমানে ঢাকা মহানগর
জামায়াতের রোকন আলমগীর মো. ইউনুস। পীস স্কুলে কেন্দ্রীয় জামায়াতের
কর্মপরিষদ সদস্য ড. আহসান ইমরোজ সম্পাদিত বাংলা বই, সাইয়্যেদ আবুল আলা
মওদুদী ও মতিউর রহমান নিজামীর লেখা সাংগঠনিক বই পড়ানো হয়। সিরাজগঞ্জ জেলার
পীস পাবলিক স্কুলের পরিচালক এবং সভাপতি মুহাম্মদ বাবর আলী প্রথম আলোকে
বলেন, ‘এই স্কুলে আগে কয়েকজন জামায়াতপন্থী ছিলেন, তাঁরা হয়তো এসব বই
পড়াতেন। তাঁদের উগ্র আচরণ দেখে আমরা তাঁদের বাদ দিয়ে দিয়েছি।’ পীস স্কুল
পরিচালনার ব্যয়নির্বাহে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া ভর্তি ফি, টিউশন ফি,
মাসিক বেতন, সেশন ফি, কোচিং ফি ইত্যাদির বাইরেও ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও
দাতা সদস্যদের কাছ থেকে অর্থ আসে। এসব স্কুলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি
কর্মকর্তা ও পীস স্কুলের সঙ্গে সম্পৃক্ত জামায়াত-সমর্থকের ওপর নজরদারি
বাড়াতে বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। লালমাটিয়ায় অবস্থিত পীস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল
অ্যান্ড কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামান মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, এসব
অভিযোগ ভিত্তিহীন। এর বেশি মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। স্কুলটির পরিচালক
খান মো. আক্তারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, সাত সদস্যের পরিচালনা পর্ষদের
সবাই আওয়ামী লীগ সরকারের শুভাকাঙ্ক্ষী, তাঁরা জামায়াতের ঘোর বিরোধী। তিনি
বলেন, একমাত্র লালমাটিয়া পীস স্কুল অ্যান্ড কলেজ বাদে অন্য সব পীস স্কুল
জামায়াতের। ওই স্কুলগুলোর পাঠদানে সমস্যা আছে, শুধু তাঁরাই সঠিক শিক্ষা
দিচ্ছেন। পীস স্কুলে কেন্দ্রীয় জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ড. আহসান ইমরোজ,
সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদী ও মতিউর রহমান নিজামীর লেখা সাংগঠনিক বই পড়ানো হয়
কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পাঠদানের বিষয়ে আমার তেমন কোনো ধারণা
নেই। তাই পড়ানো হলেও আমি দায়ভার নিতে পারি না।’ প্রতিবেদনে উত্তরা পীস
ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্যকেই জামায়াত-সমর্থক বলে
উল্লেখ করা হয়। তবে এসব সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা বলেন, তাঁরা
ওই স্কুলের সঙ্গে যুক্ত নন। প্রতিবেদনে ভুলভাবে তাঁদের নাম এসেছে। এদিকে
উত্তরা ইনভাইট পীস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সদস্য ডালিয়া সুলতানা জানান, তিনি
একজন গৃহিণী। তিনি জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন। এ ছাড়া স্কুলের পড়াশোনা
বা কমিটির বিষয়ে তেমন কিছু তিনি জানেন না। পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান
সৈয়দ মাহফুজুল আলমের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। প্রতিবেদনে বলা
হয়েছে, এই স্কুলের চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহফুজুল আলম নিজেকে আওয়ামী
লীগ-সংশ্লিষ্ট বলে পরিচয় দেন। জানতে চাইলে সৈয়দ মাহফুজুল আলম নিজেকে আওয়ামী
লীগ ঘরানার দাবি করে প্রথম আলোকে বলেন, এই স্কুলের বিষয়ে নানা প্রশ্ন ওঠায়
তিনি ওই স্কুল থেকে অনেক আগেই পদত্যাগ করেছেন। তবে কেউ কেউ তাঁর নাম
ব্যবহার করে থাকতে পারে। স্কুলের পাঠদান পদ্ধতিতে কোনো সমস্যা নেই বলে
তিনি দাবি করেন। মালিবাগ পীস স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য প্রথমে নিজেকে
লুনা আক্তার এবং ওই স্কুলের সদস্য দাবি করলেও কিছুক্ষণ পর বলেন, তিনি লুনা
আক্তার নন। এসব স্কুলের পরিচালক, সদস্য ও শিক্ষকদের অনেকেই নিজেদের পরিচয়
এভাবে অস্বীকার করেন। গাজীপুর পীস স্কুল অ্যান্ড কলেজের চেয়্যারম্যান ড.
আহম্মদ উল্লাহ ঢাকা কলেজের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রধান। ওই স্কুলে
পরিচালকেরা জনপ্রতি পাঁচ লাখ টাকা করে স্কুলে দিয়েছেন। জানতে চাইলে ড.
আহম্মদ উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই স্কুল সঠিকভাবে পরিচালিত হয়। আমি নিজে
দেখাশোনা করি।’ চাঁপাইনবাবগঞ্জ পীস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের
পরিচালনা পর্ষদের সাবেক অভিভাবক প্রতিনিধি মো. শামসুজ্জামান বলেন, এই স্কুল
নিয়ে সন্দেহ হওয়ায় তিনি তাঁর সন্তানকে অন্য স্কুলে দিয়েছেন। স্কুলে জাতীয়
সংগীত গাওয়া হতো না বলে তিনি জানান।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment