Tuesday, April 5, 2016

বর্ষার আগেই বৃষ্টি বাড়ছে by ইফতেখার মাহমুদ

ঋতুচক্রের হিসাবে এখন বসন্ত। নীলাকাশজুড়ে সাদা মেঘের ওড়াউড়ি, আর দমকা হাওয়ার ঝাপটা। এই তো এই ঋতুর চিরপুরোনো বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এবার বসন্ত শেষ হওয়ার আগেই প্রকৃতিতে বৈশাখী আঁচড় লেগেছে। দমকা হাওয়া হরহামেশা ঝোড়ো বাতাসে রূপ নিচ্ছে। এক সপ্তাহজুড়েই রাতভর ঝুম বৃষ্টি। আর গতকাল সোমবার শ্রীমঙ্গলে ১৫৭ ও চাঁদপুরে যে ৫৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, তা তো বর্ষাকেও হার মানায়। আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বর্ষার আগের তিন মাস মার্চ-এপ্রিল ও মেতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়ছে। বর্ষায় বৃষ্টিবহুল দিনের সংখ্যা কমলেও মোট বৃষ্টিপাতও বাড়ছে। জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাসে বৃষ্টিহীন দিনের সংখ্যা বাড়লেও অল্প সময়ে বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে গড়ে মোট বৃষ্টিপাত বাড়ছে। বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্স স্টাডিজের (বিসিএএস) ফেলো মো. আবু সৈয়দ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের শিক্ষক এম আল আমিনের একটি যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সিলেটে বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়ছে। আবার বরিশাল বিভাগে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরে সংরক্ষিত গত ৩০ বছরের দৈনিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ পর্যালোচনা করে ওই দুই গবেষক ‘বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার বদলের অনুসন্ধানের ভৌগোলিক ধরন’ শীর্ষক ওই গবেষণাটি করেছেন। তাতে দেখা গেছে, বৃষ্টিপাত বাড়লেও প্রাক-বর্ষা মৌসুমে দেশের মোট গড় তাপমাত্রাও বাড়ছে। কোনো একটি এলাকায় বৃষ্টিপাত বাড়লে তাপমাত্রা কমার কথা। কিন্তু তা না হয়ে কেন বাড়ছে, তারও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে ওই গবেষণায়। বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রা একই সঙ্গে বৃদ্ধি সম্পর্কে গবেষক মো. আবু সৈয়দ প্রথম আলোকে বলেন, আগে বর্ষায় দেশে টানা কয়েক দিন বৃষ্টি হতো। বৈশাখেও টানা ঝড়বৃষ্টি দেখা দিত। এখন কয়েক ঘণ্টায় এমন বৃষ্টি হয়, যা আগে কয়েক দিনেও হতো না। ফলে বৃষ্টিহীন দিনের সংখ্যা বেশি হচ্ছে। এতে মোট তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জলাশয় ও গাছপালা উজাড় হয়ে কংক্রিটের স্থাপনা বেশি হওয়ার কারণেও তাপমাত্রা বাড়ছে। গবেষণাটিতে দেখা গেছে, চট্টগ্রামে প্রতিবছর গড়ে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে দশমিক শূন্য ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত বেড়েছে। একই সময়ে সিলেটে বেড়েছে ৪ দশমিক ১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। ঢাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুব সামান্য বেড়েছে। অন্যদিকে মার্চ-এপ্রিল ও মে মাসে ৩ দশমিক ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত কমেছে। সার্ক আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্র ও জাপানের নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং আবহাওয়া বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক আরজুমান্দ হাবিবের দুটি গবেষণাতেও বাংলাদেশে প্রাক-বর্ষার তিন মাসে বৃষ্টিপাত বেড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ওই দুই গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গ্রীষ্ম ও বর্ষার সময়কাল কিছুটা এগিয়ে এসেছে। ঋতুচক্রের হিসাবে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে গ্রীষ্ম শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে বৈশাখের ঝোড়ো হাওয়া ও বৃষ্টি শুরু হয়ে যাচ্ছে। আরজুমান্দ হাবিবের ‘বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের ধরন’ শীর্ষক ২০১২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে মার্চে প্রতিবছর ০.০০৪৮ মিলিমিটার এবং এপ্রিলে ০.০০৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত বাড়ছে। এই গবেষণাটি করার ক্ষেত্রে গত ৬০ বছরের বৃষ্টিপাতের পরিমাণকে পর্যালোচনা করা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশের বিভিন্ন স্থানে যে বৃষ্টিপাত হচ্ছে, তা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের ওপরে পূবালী লঘুচাপ নামে বিরাজ করছে। ওই লঘুচাপের প্রভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আজও দেশের ওই তিন বিভাগের অনেক এলাকায় এবং দেশের বাকি এলাকার কিছু কিছু স্থানে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।

No comments:

Post a Comment