Sunday, April 10, 2016

ইলিশের গলাকাটা ব্যবসা by এমএম মাসুদ

তিন দিন পরেই পহেলা বৈশাখ। বাঙালির প্রাণের উৎসব। চাই পান্তার সঙ্গে পদ্মার ইলিশ। তাই দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ইলিশের দামও ততই চড়ছে। আর এটাকে ঘিরে রাজধানীর বাজারগুলোতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। খুচরা ও পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে হিমাগারে সংরক্ষিত মাছ। তাও আবার আকাশছোঁয়া দামে, যা গ্রাহকদের গলা কাটা হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। অবশ্য ইতিমধ্যেই  ইলিশ চলে গেছে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার অনেক বাইরে। এ ছাড়া বাজারে প্রচুর পরিমাণে বার্মিজ ইলিশও দেদারছে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্ষবরণের উৎসবের ক্ষণ যত এগিয়ে আসবে, ততটাই উত্তাপ বাড়বে রূপালি ইলিশের দামে। যদিও মাছটির এখন প্রজনন মৌসুম। তাই কয়েকটি নদীতে মার্চ-এপ্রিল জুড়ে জাল ফেলা নিষিদ্ধ। তা ছাড়া সারা বছর ইলিশের যে চাহিদা থাকে, বৈশাখে তা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। সরবরাহেও রয়েছে ঘাটতি। আগের দিন পর্যন্ত ইলিশের দাম বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে বলে ইলিশের পাইকারি বিক্রেতারা বলেছেন।
এদিকে দেশের স্বার্থে এবং ইলিশ রক্ষায় পহেলা বৈশাখে ইলিশ খাওয়ার রেওয়াজ বন্ধ করার পরামর্শ সুধীজনদের। তাদের মতে, ইলিশের সঙ্গে বাংলা নববর্ষের কোনো যোগসূত্র নেই। তবু সংস্কৃতির ধুয়া তুলে শহরের মানুষ অনেকটা ঘটা করে পান্তার সঙ্গে ইলিশ খাওয়ার রেওয়াজ গড়ে তুলেছে। এ ছাড়া পহেলা বৈশাখে ইলিশ খেতে নিরুৎসাহিত করতে চলছে প্রচারণাও।
গতকাল রাজধানীর কাওরান বাজার, যাত্রাবাড়ীর মাছের আড়ৎ এবং সুপারশপ ঘুরে দেখা যায়, একটি ইলিশের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকছেন বিক্রেতারা। একেকটি মাছের ওজন এক থেকে দুই কেজি।
কিন্তু হতাশ হয়ে শেষ পর্যন্ত ইলিশ না কিনেই ফিরে যান রাজধানীর কাঁঠাল বাগান থেকে আসা ক্রেতা সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ইলিশের যে দাম, ইলিশ ছাড়াই পহেলা বৈশাখে পান্তা খেতে হবে। আর শহরের অলিগলিতে ইলিশ ফেরিওয়ালাদের (ভ্রাম্যমাণ) হাঁকডাকও বেড়েছে। আর এই নগরকেন্দ্রিক চাহিদাকে পুঁজি করে ফায়দা লুটছে নগরীর পাইকারি ও খুচরা মাছ ব্যবসায়ীরা। আর এখন বাজারে যে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে, তার বেশির ভাগই কয়েক মাস আগে মজুত করা হিমায়িত ইলিশ। আমদানি করা মিয়ানমারের ইলিশও প্রচুর বিক্রি হচ্ছে।
গতকাল রাজধানীর কাওরানবাজারে গিয়ে দেখা গেছে, ব্যবসায়ীরা থরে থরে সাজিয়ে রেখেছেন ইলিশ মাছ। এ বাজারের খুচরা মাছ ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম জানান, এখন বাজারে যেসব মাছ আছে তার বেশির ভাগই বার্মিজ। এগুলো কয়েক মাস আগে থেকে সে দেশে কোল্ডস্টোরেজে রাখা ছিল। পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা নিম্নমানের বার্মিজ ইলিশ নিয়ে আসছেন। তবে দেশি ইলিশও বাজারে রয়েছে। দেশি ইলিশের মধ্যে কোল্ডস্টোরেজের এবং টাটকা মাছও রয়েছে। পহেলা বৈশাখের আগে বাকি তিনদিনে দাম আরও বেড়ে যাবে, এ কারণে যারা আগেভাগেই ইলিশ কিনতে বাজারে আসছেন তারা দাম শুনে হোঁচট খাচ্ছেন।
আর ইলিশের চাহিদা অনেক বেড়ে যাওয়ায় প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে আসছে প্রচুর ইলিশ। এ ছাড়া রয়েছে গত মৌসুমের কোল্ডস্টোরেজের (হিমাগার) মাছ।
কোল্ডস্টোরেজের ইলিশ একটু সস্তায় মিললেও বার্মিজ বা নতুন আসা মাছের দাম আকাশছোঁয়া। বিক্রেতারা এখন সব চেয়ে বড় আকারের (দেড় কেজির বেশি ওজনের) এক হালি ইলিশের দাম হাঁকছেন ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। বিক্রি করছেন ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায়। তা ছাড়া সবচেয়ে ছোট আকারের এক হালি ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায়।
শফিকুল ইসলাম আরও জানান, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এখন ইলিশের দাম অনেক বেড়েছে। গত কয়েক দিন আগেও এক কেজি ওজনের এক হালি ইলিশের দাম ছিল ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। এখন তার দাম বেড়ে হয়েছে ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা। আর ২ কেজি ওজনের সবচেয়ে বড় আকারের এক হালি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকায়। তা ছাড়া ৫০০ গ্রাম থেকে এক কেজি’র নিচের ওজনের এক হালি ইলিশ মাছ ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকার স্থলে ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা, ২০০ গ্রাম থেকে ৫০০ গ্রামের নিচে ২ হাজার থেকে ৩ টাকার স্থলে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এই বাজারের আরেক মাছ বিক্রেতা তাজুল মিয়া বলেন, একহালি মাছ ১৫ হাজার টাকায় কিনে ২০ হাজার টাকা বিক্রি করি। তিনি বলেন, পয়লা বৈশাখ সামনে রেখে এই কয়দিন ব্যবসা বেশ ভালোই হচ্ছে। তবে মূল ব্যবসাটা হয় পহেলা বৈশাখের আগের দুই দিন। কারণ আগের দুই দিন সবচেয়ে বেশি ইলিশ বিক্রি হয়।
কাওরান বাজারে মাছ কিনতে আসা আরেক ক্রেতা আবুল হোসেন বলেন, ইলিশ তো সারা বছরই খাওয়া হয়। অন্য সময় ইলিশ নিয়ে তো আর এত হৈ চৈ হয় না। পয়লা  বৈশাখ এলেই ইলিশের বাজার অস্থির হয়ে যায়। আগে ২ হাজার টাকায় এক কেজি ওজনের ইলিশ কিনে ঘরে ফিরতে পারলেও এখন সেই দামে কিনতে হচ্ছে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ। দাম বেশি হওয়ায় আমি আধা কেজি ওজনের চারটি ইলিশ ৮ হাজার টাকায় কিনে ঘরে ফিরছি।
রাজধানীর হাতিরপুল বাজারে আতিকুর রহমান নামের এক ক্রেতাকে ইলিশ কিনতে দেখা গেল আবুল কাশেম নামের এক বিক্রেতার কাছ থেকে। আতিকুর রহমান বলেন, বড় ইলিশ কিনতে এসেছি। আমার এক মাসের বেতনে বড় জোর এক হালি বড় ইলিশ কিনতে পারব। তাই ছোট ইলিশ কিনছি। তাও আবার ১ হাজার ৬০০ টাকা দাম চাইছে। ওজন ৮০০ গ্রামের বেশি নয়। বিক্রেতা আবুল কাশেম বলেন, ৯০০ গ্রাম তো হইবই। চারটা লইলে ছয় হাজার টাকা দাম রাখমু।
অন্যদিকে রাজধানীর সুপার শপগুলোতেও দাম কম নয়। নয়া পল্টনে অবস্থিত স্বপ্নের শোরুমে দেখা গেছে, আধা কেজি ওজনের এক হালি ইলিশের দাম রাখা হচ্ছে ১৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা। আর এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম আরও বেশি। যার দাম রাখা হচ্ছে প্রতি পিস দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা।
এ দিকে পহেলা বৈশাখে পান্তা ইলিশ খেতে দাম চড়া হলেও অনেকেই ইলিশ কিনেই ঘরে ফিরছেন। তবে বড় ইলিশের উচ্চ দাম হওয়ায় বেশির ভাগ ক্রেতা মাঝারি আকারের ইলিশ কিনছেন বেশি।
জানা যায়, দেশে এখন ইলিশ ধরা বন্ধ থাকায় বার্মিজ ইলিশ আসছে প্রচুর। বার্মিজ মাছ আমদানির বিষয়ে কাওরান বাজারের পাইকারি মাছ বিক্রেতারা জানান, আমাদের দেশে প্রতি বছর নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত জাটকা ধরা নিষিদ্ধ করা হয় এবং মার্চ-এপ্রিল এই দুই মাস নদীতে সব ধরনের জাল ফেলা সম্পূর্ণ নিষেধ। এ কারণে এখন জেলেরা চুরি করে সামান্য মাছ ধরলেও বেশি ধরতে পারছে না। মূলত এ জন্যই বার্মিজ ইলিশ মাছ আমদানি হচ্ছে বেশি। কারণ পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ইলিশ মাছের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। ক্রেতাদের চাহিদা পূরণের জন্যই বার্মিজ ইলিশ আনছেন ব্যবসায়ীরা। তিনি আরও জানান, বেশির ভাগ বার্মিজ ইলিশ ৮০০ গ্রাম থেকে এক কেজি ওজনের হয়। তবে কিছু দেড় কেজি ওজনেরও আছে। এগুলোর দাম অনেক বেশি। দেশি এবং বার্মিজ ইলিশ দেখে সহজে চেনা না গেলেও ভালোভাবে পরখ করে দেখলে ব্যবধান বোঝা যায়। দেশি ইলিশের আঁশ হয় বড় আর বার্মিজ ইলিশের আঁশ হয় ছোট ছোট।
মৎস্য ব্যবসায়ীরা বলেন, বৈশাখ উপলক্ষে মাছের চাহিদা অনেক বেশি। আর যাও পাওয়া যাচ্ছে তা নদীর মধ্যে ট্রলারেই কেনা-বেচা হচ্ছে। ইলিশ মাছগুলো লঞ্চ ও ট্রলারযোগে ঢাকায় চলে যাচ্ছে। এজন্য আড়তে ইলিশ মাছ কম আসছে। মাছের বাজারে ক্রেতাদের চোখ এখন ইলিশের দিকে। কিন্তু চাহিদা অনুপাতে মাছ নেই। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। তাই সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে ইলিশ মাছের দাম।

No comments:

Post a Comment