Saturday, April 23, 2016

অভিযোগের সুরাহা হয় না by হারুন আল রশীদ

অবৈধ নছিমনে করে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় নির্বাচনী সামগ্রী নিয়ে ভোটকেন্দ্রে
যাচ্ছেন নির্বাচনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বাঁয়ে পণ্য বহনকারী পিকআপও
ব্যবহার করা হচ্ছে এ কাজে। নীলফামারীর জেলা নির্বাচন
কার্যালয়ের সামনে থেকে গতকাল দুপুরে তোলা ছবি
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জাল ভোটসহ নানান অনিয়মের শিকার প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রতিকার চেয়ে সাড়া পাচ্ছেন না। ক্ষমতা থাকলেও কমিশন আবেদনকারীদের বলছে, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর কমিশনের কিছু করার নেই। এসব বিষয়ে প্রতিকার পেতে হলে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে যেতে হবে। তবে কমিশন সচিবালয়ের নির্বাচন–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কমিশনের এ পদক্ষেপ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন পরিচালনাবিধির পরিপন্থী। নির্বাচন পরিচালনাবিধির ৯০ ধারায় বলা আছে, সন্তোষজনক মনে না হলে কমিশন নির্বাচনের যেকোনো পর্যায়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিতে পারে। ফলাফল বাতিলের ক্ষমতাও দেওয়া আছে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে কমিশন ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের প্রতিকার পাওয়া থেকে বঞ্চিত করছে। নির্বাচন–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও বলেন, ভোট গ্রহণের দিন অভিযোগ আসার সঙ্গে সঙ্গে কমিশন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে ২৪ ঘণ্টা পর। ততক্ষণে নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়ে যাচ্ছে। এরপর দেখা যায়, অনিয়মের অভিযোগে কমিশন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা নির্বাচন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। তাতে অভিযোগকারী প্রার্থীর কোনো লাভ হচ্ছে না। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার জাবেদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, কমিশনের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসেনি বলেই অনেক জায়গায় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। আর যেহেতু নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়ে গেছে, তাই এখন কমিশনের কিছু করার নেই। নির্বাচনের ফল নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে তার জন্য ট্রাইব্যুনাল আছে। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, প্রতিটি জেলায় একজন যুগ্ম জেলা জজের অধীনে একটি করে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল নির্বাচন–সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করে। আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করার কথা বলা থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। এ কারণে প্রার্থীরা সাধারণত এই আদালতে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ বোধ করেন না। ব্যাপক সহিংসতা, প্রাণহানি ও অনিয়মের মধ্য দিয়ে গত ২২ মার্চ ৭১২টি এবং ৩১ মার্চ ৬৩৯টি ইউপিতে ভোট গ্রহণ হয়েছে। এমনই সহিংসতা ও অনিয়মের আশঙ্কা মাথায় রেখে আজ ৬১৪টি ইউপিতে ভোট গ্রহণ করা হবে। প্রথম ধাপে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত ৫৪ প্রার্থী এবং দ্বিতীয় ধাপে ৩৩ প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। কমিশন সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে জানা যায়, এখন পর্যন্ত প্রথম দুই ধাপের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এক হাজারের বেশি অভিযোগ কমিশন সচিবালয়ে জমা পড়েছে। বেশির ভাগ অভিযোগ এসেছে বরিশাল, ভোলা, বরগুনা, ঝালকাঠি, সাতক্ষীরা ও চট্টগ্রাম থেকে। বেশির ভাগ অভিযোগ কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দেওয়া–সংক্রান্ত। নির্বাচনের ফল পাল্টে দেওয়ার অভিযোগও আছে কয়েকটি। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করেনি।সব অভিযোগ এক নথিতে নিষ্পত্তি করে দিতে যাচ্ছে কমিশন। এ জন্য ২০ এপ্রিল কমিশন সচিবালয় থেকে একটি নথি তৈরি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পর কমিশনের কিছু করার নেই। সংক্ষুব্ধ প্রার্থীকে প্রতিকার চেয়ে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে হবে। এ বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশ আছে। তবে সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, আইন অনুযায়ী তফসিল ঘোষণার পর থেকে গেজেট প্রকাশের আগে পর্যন্ত সময়কে নির্বাচনকালীন সময় বলা হয়। সুতরাং নির্বাচনকালীন কোনো অনিয়ম হলে সেখানে তদন্ত করে কমিশন যেকোনো ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কেবল গেজেট হয়ে যাওয়ার পর কমিশনের কিছু করার থাকে না। কমিশন সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বেশ কিছু এলাকার নির্বাচনী অনিয়ম সম্পর্কে কমিশনের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তারা ব্যবস্থা নেয়নি। চাঁদপুরের হাইমচর, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডসহ আরও অনেক জায়গায় ভোটের দিন নির্বাচনী অনিয়মের খবর কমিশন যথাসময়ে পেয়েছিল। কিন্তু সাচিবিক কাজে বিলম্বের কারণে তারা অবৈধ ভোট গ্রহণের যজ্ঞ বন্ধ করতে পারেনি। ৩১ মার্চ দ্বিতীয় ধাপের ভোট গ্রহণের দিন সকাল ১০টার মধ্যে হাইমচরের গাজীপুর ইউনিয়নের সব কটি কেন্দ্র দখল হয়ে যায়। এই ইউপির ভোট গ্রহণ বন্ধের জন্য কমিশন সচিবালয় থেকে বেলা ১১টায় নথি উত্থাপন করা হয়। শেষ পর্যন্ত নথিটি কমিশনের জাবেদ আলীর কক্ষে গিয়ে আটকে যায়। ততক্ষণে ভোট গ্রহণ শেষ হয়ে গেছে। চতুর্থ ধাপে ৭ মে চট্টগ্রামের রাউজানে ১৪টি ইউপিতে ভোট গ্রহণ হবে। এর মধ্যে ১১টি ইউপিতে কৌশলে বিএনপির প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় প্রার্থীর প্রস্তাবকারী ও সমর্থনকারীরা গিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে বলেছেন, মনোনয়নপত্রের সই তাঁদের নয়। পাহাড়তলী ইউনিয়নের বিএনপি প্রার্থীর সমর্থনকারী জাহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেছেন, তাঁকে জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে ‘মনোনয়নপত্রে সই করেননি’ মর্মে লিখিয়ে তা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে বাধ্য করা হয়। ভোট হওয়ার কথা থাকলেও লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের চরবংশী (উত্তর) ও চরমোহনায় আজ কোনো পদেই ভোট হচ্ছে না। কারণ, চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্যের সবাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হতে চলেছেন। কমিশন কর্মকর্তাদের কেউ কেউ কিছু ক্ষেত্রে কমিশনের ব্যবস্থা নেওয়া আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাত গুটিয়ে বসে থাকাকে স্ববিরোধী অবস্থান বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার সব ইউনিয়নের নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছিল সেখানে কমিশনের একজন কর্মকর্তা লাঞ্ছিত হয়েছিলেন বলে। তা ছাড়া রাঙামাটির ৪৯টি ইউপির নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে সেখানে আওয়ামী লীগ কোনো প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিতে না পারায়।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন
তৃতীয় ধাপ ৬১৪ইউপিতে ভোট আজ
২৫ ইউপিতে আ.লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বী নেই
৭৬ ইউপিতে বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী নেই
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের দুটি ইউনিয়নে ভোটের প্রয়োজন হচ্ছে না। চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সদস্য প্রার্থীদের সবাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে চলেছেন
দ্বিতীয় ধাপ : ৬৩৯ ইউপি
আ.লীগের ৩৩ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত
বিএনপির প্রার্থী ছিল না ৬৩ ইউপিতে
প্রথম ধাপ : ৭১২ ইউপি
আ.লীগের ৫৪ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত
বিএনপির প্রার্থী ছিল না ১১৯ ইউপিতে
নির্বাচ​নী সহিংসতায় গতকাল পর্যন্ত নিহত ৪৩

No comments:

Post a Comment