Monday, April 18, 2016

একযাত্রায় ভিন্ন ফল by আলী ইমাম মজুমদার

একযাত্রায় পৃথক ফল হলে বিষয়টি প্রশ্নবোধক হয় অনেক ক্ষেত্রে। তেমনি কিছু ঘটনা নজরে আসছে ইউনিয়ন পরিষদসমূহের চলমান নির্বাচনে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বরাবর অন্যান্য নির্বাচনের চেয়ে একটি ভিন্ন মাত্রা থাকে। এখানে চেয়ারম্যান, বিশেষ করে সদস্যদের নির্বাচনী এলাকা ছোট থাকে বলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় তীব্র। ভোটারের উপস্থিতি থাকে বেশি। এখানে ভোটদানে ভোটারদের বিবেচ্য বিষয় থাকে কোন প্রার্থী তঁাদের প্রয়োজনে দ্রুত সাড়া দেবেন, আবাসস্থলের নৈকট্য ও আত্মীয়তাসহ নানা বিষয়াদি। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ভোটারদের উপস্থিতি বেশি হওয়ার জন্য এই নির্বাচনটির আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাও থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে। তাই প্রথা হিসেবে এ নির্বাচনটি জাতীয় নির্বাচনের মতো সারা দেশে এক দিনে হয় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকরীভাবে নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন দফায় হয়ে থাকে। এবারেও তাই হচ্ছে। তবে হালের নির্বাচনটিতে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। এত দিন পর্যন্ত এ নির্বাচন ছিল নির্দলীয়। এবারে চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়নের বিধান করা হয়েছে। অবশ্য স্বতন্ত্র প্রার্থীও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর আওতায় চলে এসেছে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনও। আর এর স্বাভাবিক পরিণতি আমাদের কলুষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রসার। বরাবর এ নির্বাচনে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন, তাঁরাই করছেন। তবে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীরা আসতে সচেষ্ট দলীয় প্রতীকে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের প্রতীক নিয়ে। এর কারণ সহজবোধ্য। ‘সুফল’ও দেখা গেছে গত দুই দফা নির্বাচনে। এমনকি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে তো ছিলই। ক্ষমতাসীন দলের প্রতীকে যাঁরা নির্বাচন করেছেন, তাঁদের লোকেরা ব্যাপকভাবে কেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপারে সিল মেরেছেন। নির্বাচন পরিচালনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই এ প্রক্রিয়ায় শরিক। কেউবা নীরব দর্শক। প্রতিরোধ করতে বা প্রতিবাদী হতে কেউ সাহসী হয়েছেন, এমনটা জানা যায় না। তবে দুই দফাতেই সহিংসতা হয়েছে ব্যাপক। প্রাণহানির সংখ্যাও অনেক। এ ছাড়া অভিযোগ এসেছে ক্ষমতাসীন দল মনোনীত প্রার্থী ব্যতীত অন্য দল এমনকি স্বতন্ত্র বা নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীকেও মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেওয়া হয়নি অনেক ক্ষেত্রে। অভাবিত সংখ্যক নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। তবে ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের তুলনায় এ হার কম বটে। এবার দলওয়ারি প্রদত্ত ভোটের হারও বিস্ময়কর বলে প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানা যায়। এ ধরনের ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা বরাবরের মতোই। তারা অনেক কিছু জেনে না জানার ভান করে আসছে এ কমিশন গঠনের পর থেকেই। অবশ্য এ ধরনের কমিশন এ দেশের ইতিহাসে আরও ছিল। তারাও নিজেদের ‘কীর্তির’ ছাপ রেখে গেছে। স্বীয় ‘কীর্তির’ ধ্বজা ধরা এ কমিশনও এগিয়ে চলছে। নির্বাচন পরিচালনায় তাদের অদক্ষতা, একপেশে নীতি, নিষ্ক্রিয়তাসহ অনেক বিষয় নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। সমালোচনা করছে শুধু বিরোধী দলই নয়, ক্ষমতাসীন জোটের শরিক অন্য দলগুলোও। এমনকি সরকারি দলের কয়েকজন নেতাও এ কমিশনের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ করেছেন খোলামেলাভাবে। তাতেও পরিস্থিতির তেমন ইতরবিশেষ হয়নি। অন্যদিকে কমিশন বা সরকারের সমালোচনা করে আমাদের অতীত স্মৃতি আবারও সামনে নিয়ে এসেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি ভোট জালিয়াতি বা কেন্দ্র দখল ইত্যাদি নিয়ে সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, এ সরকারের নীতি হচ্ছে আমার ভোট আমি দেব। আর অন্যের ভোটও আমিই দেব। তঁার কথাটি অনেকাংশে সত্য। তবে নিজের শাসনামলে অন্যদের ভোটও তো তঁার দলের লোকেরাই দিয়ে দিতেন। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে সে ভোট দেওয়ার কাজ করতেন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা। আর ভোটের সময় বা পরে এর যথার্থতা নিয়ে সাফাই গাইতেন স্বয়ং প্রধান নির্বাচন কমিশনার। এমনকি সম্পূর্ণ ভোটারবিহীন নির্বাচনের পরেও। ধরে নেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ এভাবেই চলবে। তবে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান সব ওলটপালট করে দেয়। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে ধারা আমরা আবারও দেখেছি মাগুরা উপনির্বাচন ও ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে। আরও দুর্ভাগ্য যে, সেটি আবার চালু হয়েছে। পতিত রাষ্ট্রপতি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা অসত্য না হলেও তাঁকেও এর অংশীদার বললে ভুল হবে বলে মনে হয় না। ২০১৪ সালের নির্বাচনকালে তঁার দল নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিল। তবে দলের নেতারা জমা দেন মনোনয়নপত্র। আর একপর্যায়ে এরশাদ হারান দলের নেতৃত্ব। নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় ‘চিকিৎসার জন্য’ তাঁকে ভর্তি হতে হয় সিএমএইচে। তিনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন বলে গণমাধ্যম সূত্রে সুস্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল। কিন্তু পরিণতিতে দেখা যায় বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন তিনি। শপথও নেন সংসদ সদস্য হিসেবে। এখন মন্ত্রীর মর্যাদায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারই যদি করা হলো, তবে তাঁর প্রার্থিতা রইল কী করে? আর কীভাবে বা কাদের ভোটে তিনি নির্বাচিত হলেন? এ ভোটও তো অতি অবশ্যই তঁার শুভাকাঙ্ক্ষীরা ব্যালট পেপারে গণসিল মেরে দিয়ে দিয়েছিল বললে ভুল হবে না। প্রকৃত ভোটাররা যে নয়, তা তিনি জানেন ও বোঝেন। তাও জনগণের নজরে থাকার জন্য এ ধরনের বিবৃতি মাঝেমধ্যে দিয়ে থাকেন। শুধু নির্বাচন কমিশন নয় নির্বাচন নামক ব্যবস্থাটিই আজ প্রশ্নবিদ্ধ। এটা দুর্ভাগ্যজনক। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উদ্যোগ নিতে পারে নির্বাচন কমিশনই। তবে এখা​েন সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এখন নির্বাচন কমিশনের দু–একটি কার্যক্রম আলোচনার দাবি রাখে। রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় একটি সশস্ত্র দল বিভিন্ন প্রার্থীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে মনোনয়নপত্র দাখিলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। ফলে সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীসহ মূলধারার রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্রই জমা দিতে পারেননি। এরূপ অবস্থায় নির্বাচন কমিশন সে জেলার নির্বাচন স্থগিত করেছে। এটি ন্যায্য সিদ্ধান্ত। তবে এরূপ ঘটনা তো বিচ্ছিন্নভাবে দেশের অনেক স্থানেই ঘটেছে। ব্যাপকভাবে ঘটেছে বাগেরহাটে। সেখানে কিন্তু কমিশন নীরবই রইল। প্রথম আলোতে সাংবাদিক সোহরাব হাসান একটি তথ্যবহুল মনোজ্ঞ উপসম্পাদকীয় লিখেছেন। এ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ সম্পর্কেও তাঁর ‘ঘরে ঘরে মাগুরা’ শীর্ষক উপসম্পাদকীয়টি আমাদের চেতনার মূলে স্পর্শ করেছে। এগুলো আমরা অনেকেই হয়তো পড়ি। কিন্তু যাঁদের ব্যবস্থা নেওয়ার, তঁারা নিস্পৃহ থাকেন বরাবর। এখনো তা–ই আছেন। বান্দরবান পার্বত্য জেলার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সন্নিকটে। সেখানে রাঙামাটির মতো আইনশৃঙ্খলার ব্যবস্থা হয়তো নাজুক নয়। তবে কিছুটা শঙ্কাও আছে। সেটাই জানা গেল সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম–বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা থেকে। সে সভায় সরকারি দলের স্থানীয় নেতাদের দাবি, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করতে হবে। কিছুটা বিস্ময়কর ঠেকল। বরাবর এ রাজনৈতিক দলটি নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়ে থাকে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকারসমূহের নির্বাচনে দু–একটি ব্যতিক্রমধর্মী ক্ষেত্র ব্যতীত সেনা মোতায়েন করাও হয় না। আমরা বরাবর দেখে আসছি পেশিশক্তির ভয়ে যাঁরা ভীত, তঁারাই সেনা মোতায়েন চান। বান্দরবানেও এ কারণেই তা চাওয়া হচ্ছে। তবে দেশের অন্যত্র বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যখন কোনো নির্বাচনে (সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও পৌরসভা) সেনা মোতায়েন চান, তখন তঁারা জোর গলায় এর বিরোধিতা করেন। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম সবার জানা। এর ব্যাপক পুনরুক্তি নিষ্প্রয়োজন। তবে তারা সময়-সময়ে পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত নিয়ে এবং ক্ষেত্রবিশেষে সময়োচিত সিদ্ধান্ত না দিয়ে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বিতর্কিত করেছে। প্রশ্নবিদ্ধ করেছে তাদের ভূমিকা। হতাশ করেছে দেশবাসীকে। শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, নির্বাচন নামক ব্যবস্থাটিই আজ প্রশ্নবিদ্ধ। এটা দুর্ভাগ্যজনক। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উদ্যোগ নিতে পারে নির্বাচন কমিশনই। তবে এখােন সরকারের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দেশ ও জনগণের স্বার্থে সরকারের নির্বাচনব্যবস্থাটিকে আবার একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সহায়তা করা দরকার। কমিশনেরও তার জরাজীর্ণ অতীত ও বর্তমান ভুলে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ রচনার পথ তৈরি করতে সচেষ্ট হওয়া আবশ্যকতা রয়েছে। একযাত্রায় যাতে দল আর ব্যক্তি বিবেচনায় পৃথক ফল না হয়, এটুকু দেখলেই কাজটা শুরু করা যাবে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

No comments:

Post a Comment