বাংলাদেশের
স্বাধীনতা ও জনগণের মুক্তির জন্য ১৯৭১ সালে যখন চূড়ান্ত সংগ্রাম শুরু হয়,
তখন ১০ এপ্রিল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে’
‘দৃঢ়ভাবে’ যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা ছিল এ রকম: ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য
সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত’ করা হবে। ১৯৭২ সালে যে
সংবিধান গৃহীত হয় তাতে বলা হয়েছিল এবং বহুবার সংশোধনের পর এখন যে সংবিধান
বলবৎ তাতে রাষ্ট্র ‘অঙ্গীকার’ করছে যে প্রজাতন্ত্রের মূল লক্ষ্য হবে
‘...সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক,
অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত’ করা। ‘সুবিচার’
শব্দটি একাত্তরেও উচ্চারিত হয়েছিল, বাহাত্তরের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দলিলেও
ছিল এবং এখনো যথাস্থানে আছে। একাত্তরে বলা হয়েছিল ‘বাংলাদেশের জনগণের
জন্য’ এবং বাহাত্তরে বলা হয় ‘সকল নাগরিকের জন্য’। সকল নাগরিক ও জনগণ বলতে
রাষ্ট্রের সবচেয়ে নির্মল চরিত্রের মানুষটি, সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি এবং
সবচেয়ে জঘন্য অপরাধী ও সবচেয়ে দুর্বল শিশি-বোতল কুড়ানো কিশোরীটিও
রয়েছে। নাগরিকদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা নাম রয়েছে। কারও নাম তনু বা মনু,
নূরজাহান, ইয়াসমিন বা পূর্ণিমা, কারও নাম সৈয়দ আবুল মকসুদ, কারও নাম
আল্লামা শাহ সুফি সৈয়দ হক্কুল্লাহ আল মাদানী, কারও নাম তারিনী চরণ সূত্রধর।
যার যে নামই হোক না কেন, নামের আড়ালে রয়েছে একজন মানুষ। তার ধর্ম, বর্ণ,
জাতিসত্তা যা-ই হোক, তাদের প্রত্যেকের রাষ্ট্র থেকে ‘সুবিচার’ প্রাপ্য।
কেউ অবিচারের শিকার হবে, মানুষ হিসেবে তার অবস্থান যেখানেই হোক না কেন, তা
রাষ্ট্র তার দলিলে বলেনি। আজ প্রায় প্রতিদিন বাংলার নারী ধর্ষিত ও খুন
হচ্ছে। সব ধর্ষণ ও খুনের বিচার হয় এবং অপরাধী শাস্তি পায়—এমন কথা আমরা বলতে
পারব না। অনেক ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত পর্যন্ত হয় না। বিচার তো পরের কথা।
দু-একটি ঘটনা গণমাধ্যমের কারণে ঝড় তোলে। যেমন দিনাজপুরের হতভাগিনী
ইয়াসমিনের ঘটনাটি। দুঃখিনী ইয়াসমিন পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা
দিনাজপুরের দশমাইল নামক জায়গায় ধর্ষিত ও খুন হয়েছিল। ঘটনাটি ধামাচাপা
দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু গণমাধ্যমে হত্যাকাণ্ডটি ব্যাপক প্রচার পায়।
আমরাও নিন্দা করে উপসম্পাদকীয় লিখি। সাধারণ মানুষ, রাজনীতির লোক, বিভিন্ন
পেশাজীবী প্রভৃতি প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ করেন। বিস্ময়কর প্রতিবাদ ছিল আমাদের
নারী সংগঠনের নেত্রীদের। তাঁরা তাঁদের প্রতিবাদ দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ
রাখেননি। দেশ-বিদেশে তাঁদের আন্দোলন ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। পুলিশ সদস্যদের
অপরাধের দায় তাঁরা চাপিয়ে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ঘাড়ে। তাঁদের বক্তব্য
ছিল: এ কেমন নারী সরকারপ্রধান যে দেশে নারী ধর্ষিত ও খুন হয়! ওই সময়
বেইজিংয়ে বিশ্ব নারী সম্মেলন হয়। অপ্রত্যাশিতভাবে চীন সরকারের আমন্ত্রণে
বাংলাদেশের এক প্রতিনিধিদলের প্রধান হিসেবে আমি চীন যাই নারী সম্মেলন শেষ
হওয়ার অব্যবহিত পরে। বেইজিং বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন সেরে বাইরে বেরোতেই
‘বাংলাদেশ’ নাম লেখা প্ল্যাকার্ড দেখেই বুক ভরে যায়। বঙ্গ ভদ্রমহিলাদেরও
উপস্থিতি দেখি। কেউ চেনা, অনেকে অচেনা। প্ল্যাকার্ডগুলোতে শুধু বাংলাদেশ
নয়, লেখা ‘ইয়াসমিন’ শব্দটি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নারীনেত্রীদের জানানো
হয়েছিল বাংলাদেশে ইয়াসমিন নামে এক নারীকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে।
হোটেলে পৌঁছার কিছুক্ষণ পর আমাদের রাষ্ট্রদূত মোস্তাফিজুর রহমান আমাকে
ফোন করেন যাত্রায় কোনো অসুবিধা হয়েছিল কি না ইত্যাদি জানতে। তিনি ছিলেন
আমার আগের পরিচিত। আমি এলিফ্যান্ট রোডে থাকার সময় জাহানারা ইমামের বাড়িতে
আমরা দীর্ঘ আড্ডা দিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা
হতো। মিসেস ইমাম তাঁকে ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন। তাঁকে বললাম,
ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডের এখানে প্রতিবাদের কারণ কী? তিনি বললেন, আমার জন্যও
বিষয়টি বিব্রতকর, তবে আমার কিছু করার ছিল না। তাঁরা স্বাধীনভাবে এখানে
এসেছেন সম্মেলনে যোগ দিতে। সরকারি প্রতিনিধিদল দেখাশোনার দায়িত্ব আমার।
ঢাকা বা দিনাজপুরের প্রতিবাদ বেইজিংয়ে গিয়ে করার যৌক্তিকতা আমিও দেখিনি।
আর একটি নারী নির্যাতনের ঘটনাও বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের বাইরে উত্তাল তরঙ্গের
সৃষ্টি করে। সেটি মৌলভীবাজারের নূরজাহান হত্যাকাণ্ড। অভাগিনী নূরজাহান
হয়েছিল গ্রাম্য ধর্মান্ধদের ফতোয়ার শিকার। সুতরাং ঘটনা হিসেবে সেটিতে যোগ
হয়েছিল ভিন্ন মাত্রা। তাকে পাথর ছুড়ে পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয়েছিল। ঘটনা
ঘটার মাস দুই পরে আমি দিল্লি যাই। তিনমূর্তি ভবনে নেহরু মিউজিয়াম ও
লাইব্রেরিতে আমি কিছুদিন মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে কাজ করি। একদিন মিউজিয়ামের
ডিরেক্টর মি. বালাকৃষ্ণাণ আমাকে বলেন, বিবাহবহির্ভূত যৌনাচারের অপরাধে
বাংলাদেশে কি মেয়েদের পাথর ছুড়ে হত্যা করা হয়? তাঁকে বলেছিলাম, গ্রাম্য
মোড়ল ও ফতোয়াবাজদের নির্যাতনের শিকার আমাদের অগণিত নারী। তবে মাটিতে
পুঁতে পাথর ছুড়ে হত্যার ঘটনাটি নতুন ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা। দিল্লিতে আমার থাকা
অবস্থাতেই বাংলাদেশ হাইকমিশন ঘেরাও করেছিল বাংলাদেশের নারী সংগঠনগুলোর
ভগ্নিপ্রতিম সংগঠনগুলো। নূরজাহান হত্যাকাণ্ডের বিচারের চেয়ে বাংলাদেশে যে
ইসলামি মৌলবাদের উত্থান ঘটেছে, সে বিষয়টিই প্রাধান্য পেয়েছিল বিক্ষোভ
সমাবেশে। দক্ষ কূটনীতিক ফারুক সোবহান পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন। যা হোক,
ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে এবং অপরাধীদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড
কার্যকর হয়েছে। নূরজাহান হত্যাকাণ্ডের খুনিদেরও বিচার হয়েছে। আরও অনেক
ধর্ষণ ও হত্যার বিচার ও শাস্তি হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের
ঠিকমতো চার্জশিটই হয়নি। সুতরাং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে
বঞ্চিত হয়েছে, যা সাংবিধানিক অঙ্গীকারের বরখেলাপ। তনু হত্যাকাণ্ড নিয়ে
নারীসংক্রান্ত এনজিও এবং নারী সংগঠনগুলোর চেয়ে সাধারণ মেয়ে শিক্ষার্থীরাই
বরং রাজপথে আর্তনাদ করছেন। সারা দেশের বিভিন্ন সংগঠনও সভা-সমাবেশ ও
বিক্ষোভ করছে। তনুকে তঁার বাবা-মা আর ফিরে পাবেন না, কিন্তু হত্যার
ন্যায়বিচারও কি তাঁরা পাবেন না? ওর পরিবার শুধু নয়, সুবিচার চায় সমগ্র
দেশের মানুষ। কিন্তু গভীর বেদনার বিষয় যে দেশবাসী আশাবাদী হতে পারছে না।
বরং তনুর বাবা-মা, ভাইদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত অনেকেই। সম্ভাব্য
অপরাধীদের চেয়ে তনুর মা-বাবাকে নিয়েই বেশি টানাটানি হচ্ছে। তাঁদের বাড়িতে
পুলিশ যাচ্ছে মধ্যরাতে। তার কারণ তাঁদের শ্রেণিগত অবস্থান। আমাদের রাষ্ট্র
শ্রেণিবিভক্ত: একদিকে প্রবল আরেক দিকে দুর্বল। মানুষকে বিধাতা অপরাধ বা পাপ
করার কুপ্রবৃত্তি দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। অপরাধপ্রবণতা প্রতিটি মানুষের
মধ্যেই রয়েছে। তার সঙ্গে তার ধর্ম, বর্ণ, জাতি, পেশার কোনো সম্পর্ক নেই।
কোনো পেশার কোনো সদস্য যখন কোনো অপরাধ করে, তার দায় সেই পেশা বা
প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায় না। সভ্যজগতে যৌন অপরাধকে জঘন্য অপরাধ—ক্ষমাহীন
অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। কার কেমন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবস্থান, কে কোন
পেশার সদস্য, তা বিবেচনার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। ব্রিজের নিচে বাস করা
মানুষটি যৌন অপরাধ করলে বা খুন করলে যে শাস্তি পাবে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ
আসনে অধিষ্ঠিত যিনি, তিনি করলেও একই শাস্তি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের
(আইএমএফ) প্রধান পৃথিবীর কোনো সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের চেয়ে কম মর্যাদা
বা প্রতিপত্তির অধিকারী নন। তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। ইতালির
ধনকুবের ও প্রধানমন্ত্রীকে যৌন অপরাধীর সাজা ভোগ করতে হয়েছে। বহু দেশের
বড় বড় রাজনীতিক ও সেনাবাহিনীর জেনারেল পর্যন্ত যৌন অপরাধের শাস্তি থেকে
বাঁচতে পারেননি। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন ক্ষমা চেয়ে অভিশংসনের থেকে বেঁচে
গেছেন। কিছুদিন আগেই ভারতের এক সম্পাদক কারারুদ্ধ হয়েছেন যৌন হয়রানির
অভিযোগে। বহু লেখক-সাহিত্যিক জেল খেটেছেন যৌন অপরাধে। খুন নয়, যৌন
অপরাধে অতি জনপ্রিয় আইরিশ কবি ও নাট্যকার অস্কার ওয়াইল্ড দুই বছর জেল খেটে
মারা যান। যৌন অপরাধ করে ব্যক্তি—সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান নয়। সুতরাং
ব্যক্তিকে বাঁচাতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা নষ্ট করা খুব বড় রকমের
নির্বুদ্ধিতা। জাতিসংঘের বহুজাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে
যৌন অপরাধের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। ১ এপ্রিল (২০১৬)
জাতিসংঘ জানিয়েছে, ১০৮টি অভিযোগ পাওয়া গেছে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে।
‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি’ দেওয়া হবে অপরাধী সৈন্যদের, যারা সবাই ফরাসি।
আমাদের পুলিশ ও সেনাসদস্যরা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করে শুধু যে
ডলার অর্জন করছেন তা নয়, সুনামও অর্জন করেছেন। তনুর ঘটনা হোক বা যে ঘটনাই
হোক, বহির্বিশ্বে যদি কোনো খারাপ বার্তা পৌঁছে দেয়, তা হবে খুবই বেদনার
ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। কোন রাষ্ট্রের কয়টা ব্রিজ, ফ্লাইওভার ও উঁচু
দালান আছে, তা দিয়ে সেই রাষ্ট্রের মহত্ত্ব পরিমাপ করা হয় না। রাষ্ট্রের
মর্যাদা পরিমাপ করা হয় রাষ্ট্রটিতে কতটা আইনের শাসন আছে, নাগরিকদের অধিকার
কতটা সুরক্ষিত এবং সেখানে সবচেয়ে দুর্বল মানুষটি কতটা সুবিচার পায়, তা
দিয়ে। কোনো ব্যক্তিই, তা সে যে-ই হোক বা যে পেশারই হোক, বড় নয়,
প্রতিষ্ঠান বড়, তার চেয়ে বড় দেশ। যেকোনো অজুহাতেই রাষ্ট্রের মর্যাদা নষ্ট
করা খুব বড় রকমের অন্যায়।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment