![]() |
| আর কয়েক দিন পরেই বাঙালির প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখ।মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা তৈরি করছেন মাটির মুখোশসহ বিভিন্ন লোকজ সামগ্রী। |
ঘোষণাটি
এ রকম, ‘খাবিকা—খাবারের বিনিময়ে কাজ, ১ সরা=২ আইসক্রিম!’ টাঙানো আছে
জয়নুল গ্যালারির বাইরের দেয়ালে। ঠিক তার সামনেই কয়েকজন তরুণী গভীর মনোযোগে
তুলির আঁচড়ে সরায় নকশা করছেন। কাজ শেষ হলে এখান থেকে সরাগুলো চলে যাচ্ছে
সামনে রাখা আরেকটি টেবিলে, যেখানে থরে থরে সাজানো চিত্রিত সরা। আছে কাগজের
পাখি, টেপা পুতুল, দেয়ালে সাজানোর জন্য মুখোশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
চারুকলা অনুষদের ক্যাম্পাসের মূল দরজাটি দিয়ে ঢুকলে নিত্যদিনের এ চিত্র
জানান দিচ্ছে যে পয়লা বৈশাখ আসতে আর দেরি নেই। বর্ষবরণ অনুষ্ঠান উদ্যাপনের
তহবিল গঠনের জন্য চলছে এই কর্মযজ্ঞ। বাংলা পঞ্জিকার পাতায় চৈত্রের মাত্র
কয়েকটি দিন বাকি। শেষ দিকে প্রকৃতির মেজাজও বদলে গেছে। সকালে রোদ নিয়ে দিন
শুরু হলে দুপুরে মেঘলা আকাশ। বিকেলে হয়তো হালকা বৃষ্টি। কখনো কখনো চৈত্রের
দাপটে বাইরে থাকা মানুষের মাথার ঘাম পায়ে নামে। তাতে বর্ষবরণ উৎসবের
প্রস্তুতি থেমে যায় না। চারুকলা অনুষদে থাকে উৎসবমুখর পরিবেশ। গতকাল
মঙ্গলবার কর্মব্যস্ত চারুকলায় দেখা গেল অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন,
শিশির ভট্টাচার্য্যসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকেরা মহা ব্যস্ত। তাঁরা
চারুকলার বর্ষবরণ আবাহনের শিল্পকর্ম গড়ার নির্দেশনা দিচ্ছেন। বর্তমান
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করছেন সাবেক শিক্ষার্থীরাও। সরাচিত্র
সৃজন, কাগজ কেটে নানান প্রক্রিয়ায় নির্মিত মুখোশ, কাগজের ম্যাশের মুখোশ,
জলরঙে চিত্রকর্ম সৃজন ও শোভাযাত্রার মূল অনুষঙ্গ কাঠামো নির্মাণ—এই পাঁচটি
ভাগে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী সম্পৃক্ত রয়েছেন বিশাল এই আয়োজনে। এ কথা
জানালেন ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সুদীপ্ত শিকদার। রীতি অনুযায়ী শেষ বর্ষের
শিক্ষার্থীরাই এই মহাযজ্ঞে নেতৃত্ব দেন। এ আয়োজন সফল করতে বিপুল অর্থের
প্রয়োজন হলেও চারুকলা অনুষদ অতীতের মতো এবারও কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুদান
নেয়নি। বাংলা সংস্কৃতির শৈল্পিক উপস্থাপনায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নিজেদের
তৈরি শিল্পকর্ম ও চিত্রকর্ম বিক্রি করেই প্রতিবারের মতো এবারও এই আয়োজনের
তহবিল গঠন করছেন। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে চারুকলা অনুষদ ঘুরে দেখা যায়,
করিডরের উন্মুক্ত জায়গায় অস্থায়ীভাবে স্থাপিত বিশাল টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে
সারি সারি সরা। সেগুলোর ওপর রঙের প্রলেপ দিয়ে নানা অবয়ব ফুটিয়ে তুলছেন
শিক্ষার্থীরা। সরাচিত্রে মূর্ত হচ্ছে চিরন্তন বাংলার ডোরাকাটা বাঘ, গাঁয়ের
বধূর মুখচ্ছবি, সাপুড়ে, কাকতাড়ুয়া, হরেক রকমের পাখি, হাতি, লক্ষ্মীপ্যাঁচা,
বিড়াল, বাঘ, রাখালসহ বৈচিত্র্যময় লোকজ নানা বিষয়। বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে
৫০০ টাকায়। সরাচিত্রের সঙ্গে রয়েছে পাখি, কাগজের ফুল, বাঘের ছোট মুখোশ।
মুখোশগুলো বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায়। কাগজের পাখি বিক্রি হচ্ছে
১৫০ থেকে ২০০ টাকায়। নানা আকৃতির জলরঙের ছবি থেকে আগ্রহীরা বেছে নিচ্ছেন
পছন্দেরটা। শিক্ষার্থী সুদীপ্ত শিকদার জানালেন, ৫০০ থেকে শুরু হয়ে আড়াই
হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে ছোট আকৃতির চিত্রকর্মগুলো। আর বড়গুলো বিক্রি
হচ্ছে ৩ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকায়। সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা মূল্যের ছবিও থাকছে
এখানে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে আর্ট ক্যাম্পের আয়োজন করে শিক্ষক ও
প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের ছবি সংগ্রহ করা হবে বিক্রির জন্য। শুধু চারুকলা
অনুষদের শিক্ষার্থীরাই নন, নিজের আগ্রহে অনেকেই আসছেন এই কর্মযজ্ঞে শামিল
হতে। পটুয়া নাজির হোসেন তেমনই একজন। লোকজ আঙ্গিকে বাঘের ছবি এঁকে
আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছেন এই শিল্পী। গভীর মনোযোগ দিয়ে আঁকছিলেন।
জানালেন, প্রতিবছর স্বেচ্ছায় এখানে ছবি আঁকতে আসেন। তাঁর ছবিগুলো ১ হাজার
থেকে শুরু করে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই অর্থের পুরোটাই তহবিলে যোগ
হচ্ছে। অনুষদের মাঝখানে লিচুতলায় চলছে মঙ্গল শোভাযাত্রার কর্মযজ্ঞ। এ
প্রাঙ্গণে নবীন-প্রবীণ শিক্ষার্থীরা কাজে মেতে আছেন। কেউ বাঁশ-কাঠ কাটাকুটি
করছেন, কেউ কাগজ কাটছেন বিভিন্ন আকৃতির। কেউ আগুন জ্বেলে আঠা তৈরি করছেন।
এবারের শোভাযাত্রায় থাকবে ১০ থেকে ১২টি শিল্পকাঠামো বা ভাস্কর্য। তবে এখনো
সব প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। প্রতিবছর চলমান সময়ের বিবেচনায় একটি বিশেষ বিষয়
বা ভাবনা হয়ে ওঠে এই শোভাযাত্রার প্রধান অনুষঙ্গ। প্রাথমিকভাবে এ বছরের
শোভাযাত্রার ভাবনায় উঠে এসেছে মূল্যবোধের অবক্ষয়, এসেছে মা ও শিশুর
সম্পর্ক। এবারের স্লোগানে রবীন্দ্রনাথের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, ‘অন্তর মম
বিকশিত করো অন্তরতর হে’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক
নিসার হোসেন বলেন, ‘মা ও শিশুর মধুময় সম্পর্কটি সব সময়ই আমাদের সমাজে
ইতিবাচক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এখন মূল্যবোধের ক্ষয়িষ্ণুতার প্রভাবে
এই সম্পর্কটি ঠিক আগের মতো অটুট নেই বলে মনে হচ্ছে। বন্ধনটি কোথায় যেন আলগা
হয়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি ক্রমাগত ঘটছে শিশু নির্যাতনের ঘটনা। পত্রিকার
পাতায় এসব সংবাদ দেখে আঁতকে উঠি। এসব বিষয় সামনে রেখেই এবারের মঙ্গল
শোভাযাত্রার প্রস্তুতিপর্ব চলছে। পাশাপাশি বরাবরের মতো হাতি, ঘোড়া, হরিণ,
ময়ূর, পাখির কাঠামো তো থাকছেই। সবই হবে আমাদের চিরায়ত সংস্কৃতির ঐতিহ্য
অনুসারে।’ মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল উদ্দেশ্যটি উল্লেখ করে নিসার হোসেন বলেন,
‘শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পরিশ্রমে এই শোভাযাত্রা সর্বজনীন রূপ পেয়েছে।
সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক অবস্থানের কথাই প্রকাশ করে এই
শোভাযাত্রা।’ পয়লা বৈশাখের আগাম হার্দিক উত্তাপে যেন উষ্ণ হয়ে উঠেছে
চারুকলার পরিবেশ।

No comments:
Post a Comment