Wednesday, April 6, 2016

তবু হাল ছাড়ছে না বিরোধী দলগুলো by রজত রায়

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম পর্বের ভোটে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দলগুলো। এরপরও কমিশন নীরব। তবে দলগুলো এখনই হাল ছেড়ে দেওয়ার পক্ষপাতী নয়। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম পর্বের ভোট হয়েছে গত সোমবার। এদিন জঙ্গলমহলের ১৮টি আসনে ভোট গ্রহণ হয়। ছয় দফায় গোটা রাজ্যের ২৯৪টি আসনের ভোট গ্রহণ পর্ব শেষ হবে আগামী ৫ মে। ১৯ মে বাকি চার রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ফল ঘোষণা হবে। সোমবার ভোটের সময় ভোটকেন্দ্র বা পোলিং বুথের বাইরে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর দেখা মেলেনি। অথচ নির্বাচন কমিশন আগেই বারবার আশ্বাস দিয়েছিল, ভোটের আগে থেকেই, এবং ভোটের সময় বুথের ভেতরে ও বাইরে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থাকবে সাধারণ ভোটদাতাদের নিরাপত্তা দিতে। কিন্তু প্রথম দফার ভোটের সময়েই নির্বাচন কমিশন কথার খেলাপ করায় বিরোধী দলগুলো এবং নাগরিক সমাজ যথেষ্ট হতাশ ও উদ্বিগ্ন। কারণ, কেন্দ্রীয় বাহিনীর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে শাসক তূণমূল কংগ্রেসের কর্মী ও গুন্ডাবাহিনী গ্রামের পর গ্রামে ঢুকে ভোটদাতাদের শাসিয়েছে, কোথাও কোথাও ভোটকেন্দ্রে আসতে বাধা দিয়েছে। শাসক দলের সঙ্গী হয়ে রাজ্য পুলিশও একই কাজ করেছে। গত কয়েকটি নির্বাচনে রাজ্য পুলিশের এহেন ভূমিকা দেখেই পুরো ভোটপর্ব কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে করানোর দাবি উঠেছিল। নির্বাচন কমিশনও সেই দাবির গুরুত্ব স্বীকার করে মোট ৭০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী পশ্চিমবঙ্গের ভোটের জন্য নিয়ে এসেছে। তার মধ্যে শুধু জঙ্গলমহলেই রাখা হয়েছিল ৩৫০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী। তা সত্ত্বেও কেন কেন্দ্রীয় বাহিনীকে পোলিং বুথের বাইরে এলাকাভিত্তিক টহল দিতে দেখা গেল না, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও নির্বাচন কমিশন নীরব। আর তার ফলেই বিরোধী দলগুলোর তরফে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের মধ্যে গোপন আঁতাতের কথা বলা হচ্ছে। রাজ্য কংগ্রেস সভাপতি অঘীররঞ্জন চৌধুরী যেমন বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকায় তিনি হতাশ। কংগ্রেস নেতা আবদুল মান্নান মনে করেন, এসবই মোদিভাই ও দিদিভাইয়ের খেলা, নির্বাচন কমিশন তো ঠুঁটো জগন্নাথ। তাঁর মতো অনেকেরই ধারণা, রাজ্য বিজেপি যতই তূণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে হইচই করুক না কেন, তলায় তলায় দিল্লির বিজেপি নেতাদের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমঝোতা হয়ে গেছে। মোদির জনপ্রিয়তা এখন গোটা দেশেই তলানিতে। বিজেপি নেতারা ভালো করেই জানেন, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তাঁরা একক শক্তিতে জিতে সরকার গড়তে পারবেন না। তখন তাঁদের দরকার হবে বিভিন্ন রাজ্যের আঞ্চলিক দলগুলোর সমর্থন। কংগ্রেস ও বামপন্থীরা কখনোই বিজেপির হাত ধরবে না, উপরন্তু তারা পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী জোট করেছে। ফলে, মমতার তৃণমূল কংগ্রেসও আগ্রহী হতেই পারে বিজেপির দিকে হাত বাড়াতে। মমতার পক্ষে বিজেপির সঙ্গে বন্ধুত্ব নতুন ব্যাপার নয়। ১৯৯৮ থেকে ২০০৪, এই সময়ের মধ্যে তিন তিনবার লোকসভা নির্বাচনে মমতা বিজেপির জোটভুক্ত ছিলেন। কংগ্রেস নেতা আবদুল মান্নানের দাবি, মোদির নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী, আর মমতার নিয়ন্ত্রণে রাজ্য পুলিশ। ভোটের সময় দুই বাহিনীই নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তাদের নিয়ন্ত্রণ দিল্লি ও কলকাতা থেকে হচ্ছে, তাই কমিশন ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে পড়েছে। রাজ্য বিজেপি নেতারাও এসব সমালোচনার কথা জানেন। অস্বস্তি চাপা দিতে বিজেপি রাজ্য নেতা রাহুল সিংহ নরম সুরে বলছেন, ‘নির্বাচন কমিশনের যতটা কঠোর হাতে ভোট পরিচালনা করা দরকার ছিল, তাতে কিছু খামতি রয়ে গিয়েছে। আশা করি, কমিশন আগামী দিনে সেসব ভুল শুধরে নেবে।’ ভোটপর্ব যে খুব নির্বিঘ্নে হয়নি, তার ইঙ্গিত মেলে একটি তথ্য থেকে। মাত্র ১৮টি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোট হলেও ভোট শেষ হওয়ার দুই ঘণ্টা আগে পর্যন্ত কমিশনের কাছে ৫০০টিরও বেশি অভিযোগ জমা পড়ে। এসব অভিযোগের মধ্যে কয়েক জায়গায় বুথ দখল, ভোটদাতাদের ভয় দেখিয়ে ভোট দিতে আসা থেকে নিরস্ত করা, সাংবাদিকদের মারধর করা এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীকে টহল দিতে না দেখা, সবই রয়েছে। সবচেয়ে মারাত্মক হলো, কেন্দ্রীয় বাহিনী বুথের বাইরে শুধু নিষ্ক্রিয়ই ছিল না, শাসক দলের গুন্ডারা সাংবাদিকদের মারধর করে টিভি ক্যামেরা কেড়ে নিচ্ছে বা বিরোধী দলের পোলিং এজেন্টকে শাসক দলের গুন্ডারা মারধর করছে দেখেও কোথাও হস্তক্ষেপ করেনি। বিরোধী দলগুলো এসব অভিযোগের প্রতি কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও সাড়া মেলেনি। সমস্যা হলো, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ২০১৪ সালের ভোটের অভিজ্ঞতা মোটেই ভালো নয়। সেবারও নির্বাচন কমিশন ভোটের আগে প্রচুর হুংকার দিয়েছিল, ভোট লুট ঠেকানোর আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু ভোটের সময় কিছুই করেনি। এবারও অনেক আশ্বাস দিয়েছিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নাসিম জৈদি। কিন্তু প্রথম দিনের ভোটে দেখা গেল, কমিশনের কথায় ও কাজে বিস্তর ফারাক। তা সত্ত্বেও বাম শিবিরের হিসাব, জঙ্গলমহলের তিন জেলার মধ্যে পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার মোট নয়টি আসনে তাদের ভোটাররা ভালোই ভোট দিয়েছেন। অসুবিধা হয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরের নয়টি আসনে। নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনী তেমন সক্রিয় না হওয়ায় শাসক দলের কর্মী ও গুন্ডাবাহিনী দাপাদাপি করলেও সব জায়গায় তেমন সুবিধা করতে পারেনি বলেই তারা মনে করছে। তাই তারা এখনই প্রকাশ্যে বেশি হা-হুতাশ করতে নারাজ, পাছে তাতে দলের কর্মী-সমর্থকদের মনোবলে ধাক্কা লাগে এবং তার প্রভাব পড়ে পরের পাঁচ পর্বের ভোটে। বরং বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, যাতে কেন্দ্রীয় বাহিনী বুথের ভেতরে ও বাইরে সক্রিয় হয়, অন্যদিকে কর্মীদের মনোবল বাড়াতে বলছে, ভোট খুবই ভালো হয়েছে। সিপিএম রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র যেমন বলেছেন, জঙ্গলমহলের ভোটে প্রথম দিনেই সেখানকার মানুষ মমতাকে ছক্কা হাঁকিয়েছেন। সবার চোখ এখন ১১ এপ্রিলের দ্বিতীয় পর্বের ভোটের দিকে। বিরোধী শিবিরের আশঙ্কা, নির্বাচন কমিশন যদি তার আগে প্রকাশ্যে বিশেষ ঘোষণা করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা না বলে, তা হলে তৃণমূল কর্মীদের সাহস বাড়বে। তারা তখন রাজ্য পুলিশের মদদে কোনো রাখঢাক না করেই খোলাখুলি বুথ দখলে নামবে। যদি কমিশন ১১ এপ্রিল কড়া হাতে ভোট পরিচালনা করতে পারে, তা হলে বাকি সব কটি পর্বের ভোটই শান্তিপূর্ণ ও রিগিংমুক্ত হবে। নির্বাচন কমিশন এখন কী করে, সেদিকেই তাকিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ।

No comments:

Post a Comment