 |
| অটিস্টিক শিশু |
২
এপ্রিল বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হয়েছে বিশ্ব অটিজম
সচেতনতা দিবস। এবার অটিজম দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘অটিজম লক্ষ্য ২০৩০:
স্নায়ুবিকাশের ভিন্নতার একীভূত সমাধান’। প্যারেন্টস ফোরাম ফর ডিফারেন্টলি
অ্যাবলের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট হিসেবে গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় দেখেছি
অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে বাবা-মায়েরা কত অসহায়। প্রতিটি ক্ষেত্রে এই শিশুটির
জন্য তাঁদের হাত-পা বাঁধা। এই শিশুদের কাছে পৌঁছাতে হবে। তবে তা
বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সঠিক পরিকল্পনা ও সঠিক দায়িত্ব বণ্টনের মাধ্যমে এই
শিশুদের জন্য কাজ করতে হবে। আর এ কাজ আমাদের আজ থেকেই শুরু করতে হবে।
আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ
পুতুলের কাছে আমরা, অর্থাৎ বিশেষ সন্তানের মা-বাবারা বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।
স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা বা অটিজমের বিষয়টি সায়মা ওয়াজেদের কারণেই আজ প্রচার
পেয়েছে। আমাদের সন্তানদের জন্য গঠন করা হয়েছে নিউরো ডেভেলপমেন্ট
ডিজঅ্যাবিলিটি প্রোটেকশন ট্রাস্ট অব বাংলাদেশ। এই বোর্ডের অনেকগুলো কাজ
আছে, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সেগুলো এখনো সম্পন্ন হয়নি। অটিস্টিক
শিশুদের সমস্যা সমাধানের জন্য একেবারে প্রথম থেকে কাজ শুরু করতে হবে। গোড়ার
জায়গাটিতে যেতে হবে, যেখানে সবচেয়ে প্রথমে মা তাঁর সন্তানকে নিয়ে যাবেন।
গ্রামের একজন মা যখন বুঝতে পারেন যে তাঁর সন্তানটি অন্য শিশুদের থেকে
আলাদা, তখন তিনি একেবারে অসহায় হয়ে পড়েন। কারণ তিনি কিন্তু জানেন না কী
করতে হবে। তিনি হয়তো প্রথমে কোনো স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র বা সদর হাসপাতালে
যাবেন। প্রশ্নটি হচ্ছে, ওই জায়গার স্বাস্থ্যকর্মীরা অটিজমের মতো জটিল
মানসিক ব্যাধি সম্পর্কে কতটুকু জানেন বা আদৌ জানেন কি না বা প্রশিক্ষিত কি
না? প্রশিক্ষিত হলে তার গুণগত মান ঠিক আছে কি না? শিশুর বেড়ে ওঠার যে
ধাপগুলো আছে, সেগুলো অটিজমে আক্রান্ত শিশুর জন্য প্রযোজ্য কি না, তা
স্বাস্থ্যকর্মীরা জানেন কি না। অটিস্টিক শিশুকে বিশেষ কী সেবা দিতে হবে, তা
কি তারা জানেন? অটিজম বা স্নায়বিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে কোন কোন বিষয়
সম্পৃক্ত থাকতে পারে, এ বিষয়ে তাঁরা কতটুকু জানেন এবং অভিজ্ঞতার ব্যাপ্তি
কতখানি? যদি জানা বা অভিজ্ঞতা না থাকে, তবে করণীয় কী হতে পারে এবং জানার
পদ্ধতি কী হবে? বিশেষ শিশুর মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে লুকানো প্রতিবন্ধকতা থাকতে
পারে। যেমন অনেক শিশু আছে ভিজুয়াল লার্নার, অনেকে সিলেকটিভ অডিটরি, অনেকে
অঙ্ক বা বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো বোঝে না। আবার অনেক শিশুর লার্নিং
ডিজঅ্যাবিলিটি অথবা ডিসলেক্সিয়া থাকতে পারে, এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে
পাঠ্যক্রম তৈরি করতে হবে ধরে নিলাম কোনো শিশুর স্নায়বিক বিকাশের
প্রতিবন্ধকতা আছে। তখন এই শিশুর জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? নিশ্চয়ই
শিশুটির মা-বাবাকে ধারণা দেওয়া হবে। সে ব্যাপারটি কতটুকু সহনীয়ভাবে,
মানসিকভাবে আঘাত করা এড়িয়ে, আতঙ্কিত না করে স্বাস্থ্যকর্মী কি মা-বাবাকে
বুঝিয়ে বলতে পারবেন? মা-বাবাকে ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের প্রশিক্ষণের
ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তাঁরা সন্তানের প্রতিবন্ধকতার ব্যাপারগুলোতে সঠিক
ও নির্ভুল জানতে ও বুঝতে পারেন এবং বাসায় সঠিকভাবে যত্ন নিতে পারেন।
প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে তার নিয়মিত ফলোআপের ব্যবস্থাও থাকতে হবে, যাতে বোঝা
যায় প্রশিক্ষণ অনুযায়ী মা-বাবা শিশুকে নিয়ে কাজ করতে পারছেন, নাকি কোথাও
জানা বা বোঝার ঘাটতি রয়ে গেছে। এরপর আসবে শিক্ষাব্যবস্থা। শিশুটির অবস্থার
ওপর ভিত্তি করে তার শিক্ষাব্যবস্থা নির্ধারণ করতে হবে। তাকে স্পেশাল স্কুল,
নাকি মূলধারার স্কুলে ভর্তি করা হবে? স্পেশাল স্কুলে গেলে সেই স্কুলের
ন্যূনতম মানদণ্ড কী হবে? স্কুলের স্পেশাল এডুকেটরদের ন্যূনতম শিক্ষাগত
যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা কতটুকু থাকবে? তাঁরা শিশুটির প্রয়োজন বা প্রতিবন্ধকতা
অনুযায়ী সাপোর্ট দিতে পারবেন কি না? কী কী শিক্ষা উপকরণ ও সরঞ্জাম থাকতে
হবে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত কী হবে, কোন ধরনের থেরাপি দেওয়া হবে—এসব
বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। অন্যদিকে অটিস্টিক শিশুর জন্য একীভূত শিক্ষার কথা
বলা হলে সে ক্ষেত্রেও কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। একীভূত শিক্ষা বলতে
অটিজম শিশুদের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একত্রীকরণকে বোঝায়। অটিজম শিশুরা
শিক্ষার দিক দিয়ে একটু পিছিয়ে থাকে। এই শিশুদের শুরু থেকে যদি স্বাভাবিক
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একত্রীকরণ করা হয়, তাহলে স্বাভাবিক শিক্ষার্থীদের
সঙ্গে মিশে তাড়াতাড়ি ভাষা শেখে। এ জন্য শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে
হবে। সহপাঠীদের এবং তাদের মা-বাবার কাছে শিশুটির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আছে
কি না তা দেখতে হবে। বিশেষ শিশুর মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে লুকানো প্রতিবন্ধকতা
থাকতে পারে। যেমন অনেক শিশু আছে ভিজুয়াল লার্নার, অনেকে সিলেকটিভ অডিটরি,
অনেকে অঙ্ক বা বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো বোঝে না। আবার অনেক শিশুর লার্নিং
ডিজঅ্যাবিলিটি অথবা ডিসলেক্সিয়া থাকতে পারে, এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে
পাঠ্যক্রম তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮০
হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে কতজন শিক্ষক আছেন, যাঁদের স্নায়বিক প্রতিবন্ধকতা
সম্বন্ধে ধারণা আছে? যদি না থেকে থাকে, তাহলে যে শিশুরা লার্নিং
ডিজঅ্যাবিলিটি, ডিসলেক্সিয়া বা ভিজুয়াল-লার্নার হিসেবে স্কুলে আসে, তারা
অন্য শিশুদের মতো পড়াশোনা করে এগিয়ে যেতে পারবে না বা বিশেষ মেধা থাকার পরও
স্কুল থেকে ঝরে যাবে। এটাও খেয়াল রাখতে হবে, যেন প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায়
যথাযথ বিষয়াবলি, শিক্ষা ও শিক্ষকের মানদণ্ড, শিক্ষার উপকরণের মতো
বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি অটিস্টিক শিশুর
বিভিন্ন থেরাপির প্রয়োজন; শুধু বিশেষ স্কুলেই নয়, মূলধারার স্কুলগুলোতেও
এটা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পুঁথিগত শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বাস্তব
জীবনের জন্য তৈরি করতে প্রি-ভকেশনাল ও ভকেশনালের পাঠ্যক্রম তৈরি করতে হবে।
এরপর একীভূত কর্মক্ষেত্রের বিষয়টি আসবে। অটিজম লক্ষ্য ২০৩০ অর্জন করতে হলে এ
সবই বিবেচনায় নিতে হবে এবং আরও কিছু সঠিক, পরিকল্পিত ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ
এখনই গ্রহণ করতে হবে।
সাজিদা রহমান: প্রেসিডেন্ট, প্যারেন্টস ফোরাম ফর ডিফারেন্টলি অ্যাবল।
No comments:
Post a Comment