Saturday, April 30, 2016

মহীয়সী আফিয়া দিল by হাসনাত আবদুল হাই

আফিয়া দিল
মহীয়সী অভিধায় কেউ তাঁকে সম্বোধন করেনি, কিন্তু করা হলে খুব মানানসই হতো এবং যথার্থ মনে করা যেত। মন ও মননের যেসব গুণ থাকলে একজন সাধারণ নারী মহীয়সী হয়ে ওঠেন, সে সবই তাঁর মধ্যে ছিল। এ বিষয়ে তিনি আদৌ সচেতন ছিলেন না; বরং বিনয়ের সঙ্গেই নিজের পরিচয় দিতেন। বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করে যে কয়েকজন নারী জ্ঞানে, মেধায় ও বৈদগ্ধে আন্তর্জাতিক মানের হতে পেরেছিলেন, তিনি নিঃসন্দেহে তাঁদের একজন। এই অর্জন নিয়ে তাঁর মনে কোনো শ্লাঘা ছিল না, এমনকি আত্মতৃপ্তিও নয়। সরলতায়, নম্রতায়, আন্তরিকতায় এবং ঔদার্যে তিনি ছিলেন অতুলনীয়া। নব্বই বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু অকাল নয়, তবু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি যেভাবে কর্মব্যস্ত জীবন কাটিয়েছেন, তার নিরিখে এই তিরোধানকে মেনে নেওয়া কষ্টকর। পঞ্চাশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি তাঁর নাম প্রথম শুনি। মেধাবী ছাত্রী এবং তারপর দক্ষ শিক্ষক হিসেবে তিনি তখন কিংবদন্তিপ্রায়। তাঁর সঙ্গে দেখা এবং পরিচিত হওয়ার জন্য আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ সময়, তখন তিনি আমেরিকাপ্রবাসী এবং মধ্য আশি বছর বয়সের গোধূলি লগ্নে প্রবেশ করেছেন। আমি কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়ে নিভৃতে সময় অতিবাহিত করছি এবং সত্তর বছর বয়সের সায়াহ্নে পৌঁছেছি। প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেললাম। ডাকলাম, ‘ভাবি’ নয়, ‘আপা’ বলে। বড় বোনের স্নেহে এবং আদরেই তিনি গ্রহণ করে নিলেন আমাকে। আমি তাঁর স্বামী আনোয়ার দিল, নারীনেত্রী মালেকা বেগম এবং সমাজকর্মী পারভীন আহমেদকে অবাক করে দিয়ে, মাথা নিচু করে আমার নতুন পাওয়া বড় বোনের পায়ের ধুলো নিলাম। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’ সম্বোধনে ধন্য করলেন আমাকে। আমার স্ত্রী তখন জীবিত। তাঁর রান্নার সুনাম ছিল। অন্যের মতো আফিয়া আপা এবং তাঁর স্বামীও আমাদের বাড়িতে খাওয়ার পর রান্নার প্রশংসা করেছেন। সেবার আমেরিকা যাওয়ার আগে আফিয়া আপা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘ঢাকায় এত কিছু খেলাম। লাউশাক খাওয়া হলো না।’ আমি সে কথা স্ত্রীকে বলার পর লাউশাক রান্না করে তাঁদের বাসায় যখন পৌঁছে দিলাম, দেখে বিশ্বাসই হতে চায় না আফিয়া আপার। সেই থেকে আমার স্ত্রী হয়ে গেল তাঁর আরও আপন। এত আপন যে দুই বছর পর তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সুদূর আমেরিকা থেকে টেলিফোন করে আমাকে শোক জানিয়েছিলেন এবং সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। এরপর স্বামী-স্ত্রী দুজনেই আমাকে প্রায়ই ফোন করে সমবেদনা জানাতেন এবং শোক ভোলার জন্য সাহস দিতেন। প্রতিবছরই ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো থেকে আফিয়া আপা এবং তাঁর স্বামী দুই মাসের জন্য ঢাকা আসতেন। কখনো কখনো আফিয়া আপা একাই এসেছেন। মনে হতো যেন ঘরের মানুষ ঘরে ফিরে এলেন। প্রতিবারই আমার জন্য নিয়ে আসতেন বই এবং পড়ার নানা উপকরণ। এর মধ্যে তাঁদের নিজেদের লেখা বইও থাকত। আমি তাঁদের দুজনের পড়াশোনার পরিধি এবং পাণ্ডিত্যের গভীরতা দেখে অবাক হতাম।ঢাকায় এসে বিভিন্ন লেখকের উল্লেখযোগ্য কী কী বই প্রকাশিত হয়ে বাজারে এসেছে, সেই খবর নিতেন।বুঝতাম, দেশ থেকে দূরে থাকলেও দেশের শিল্প-সাহিত্য এবং সংস্কৃতি সম্বন্ধে কৌতূহল এবং আগ্রহ ছিল গভীর। শিকড়ের টানেই যে তিনি দুর্বল শরীর নিয়েও প্রতিবছর ঢাকা আসতেন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে, সে বিষয়ে আমার সন্দেহ ছিল না। শুধু বইপত্রের খবর নয়, ঢাকায় কখন কোথায় কোন বিষয়ে সেমিনার বা কনফারেন্স হবে, তা জেনে নিতেন। সময় ও সুযোগ অনুযায়ী সেই সব অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার বাসনা প্রকাশ করতেন। শুধু শ্রোতা হিসেবে নয়, বক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ করা যায় কি না, সে বিষয়ে জানতে চাইতেন। এশিয়াটিক সোসাইটিতে বাংলা ভাষা ও ভাষাবিজ্ঞানের ওপর বক্তৃতা দিয়েছিলেন আফিয়া দিল। তাঁর সেই বক্তৃতা ছিল খুবই মনোজ্ঞ এবং পাণ্ডিত্যপূর্ণ। উপস্থিত শ্রোতারা প্রায়ই ছিলেন প্রবীণ বুদ্ধিজীবী। তাঁরা বক্তৃতা শেষে দীর্ঘ করতালি দিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। তিনি যে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য সম্বন্ধে কেবল অবহিত নন, একজন বিশেষজ্ঞও বটে, এ বিষয়ে কারও মনে সন্দেহ ছিল না। বাংলা একাডেমিতে আফিয়া দিল এবং তাঁর স্বামী আনোয়ার দিল বাংলা ভাষা ও একুশের ওপর যে মনোজ্ঞ আলোচনা করেছিলেন, তা শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিল। অধ্যাপক কবীর চৌধুরী ছিলেন তাঁদের বিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র। ইংরেজির ছাত্রী হিসেবে আফিয়া দিলের কাছে অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর ছিল বিশেষ সম্মানের স্থান। তিনি কবীর চৌধুরী ছাড়াও পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কে কী লিখছেন, তা জানতে আগ্রহ প্রকাশ করতেন। তিনি দেখা করতে চাইতেন বাংলাদেশের মুক্তমনা বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নতুন কী চর্চা হচ্ছে এবং সেই চর্চায় প্রধান প্রবণতাগুলো কী, তা জানার জন্য তাঁর আগ্রহ ছিল গভীর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে জ্ঞানচর্চার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ব্যবস্থায় তিনি এবং তাঁর স্বামী সহযোগিতা করতে পারেন কি না, সে বিষয়ে জানতে চেয়েছেন একাধিকবার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনকে বৈদেশিক মুদ্রায় নগদ আর্থিক সাহায্য দিয়েছিলেন তিনি ও তাঁর স্বামী। নিজেদের লাইব্রেরির অনেক বই তাঁরা উপহার দিয়েছিলেন ঢাকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের জন্য। কুমিল্লার পল্লী উন্নয়ন একাডেমির জন্যও উন্নয়নমূলক বই উপহার দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। বাংলাদেশের প্রতি আফিয়া দিলের প্রাণের আকর্ষণের জন্যই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এসব সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। প্রতিবছর আমেরিকা থেকে আফিয়া দিলের ঢাকায় আসার একটা প্রধান কারণ ছিল ঢাকার অদূরে নিজেদের গ্রামে তাঁর মায়ের নামে স্থাপিত উচ্চবিদ্যালয়ের পরিস্থিতি জানতে চাওয়া। এই স্কুলটি সম্পূর্ণই আফিয়া দিলের অনুদানে পরিচালিত। এর শিক্ষাগত মান সমুন্নত রাখার জন্য আফিয়া দিলের চেষ্টার শেষ ছিল না। এই সমাজসেবা তিনি করেছেন কোনো খ্যাতি বা প্রচার লাভের উদ্দেশ্য ছাড়াই, কেবলই শিক্ষার অনুরাগী হিসেবে। আফিয়া দিল একাধিক বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। তাঁর পড়ার বিশেষ ক্ষেত্র ছিল ভাষা ও ভাষাবিজ্ঞান। এই বিষয়েই তিনি আমেরিকার একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আফিয়া দিল ছিলেন সান ডিয়েগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর। লেখাপড়ার বিষয়ের মতো তাঁর লেখা বইয়েরও বিষয় ছিল ভাষা এবং ভাষাবিজ্ঞান। ঢাকার অ্যাডর্ন পাবলিকেশন থেকে ২০১১ সালে প্রকাশিত বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ মুভমেন্ট অ্যান্ড ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ একটি মূল্যবান আকরগ্রন্থ; যার সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে খুব কম গবেষণাকর্ম। ২০১৪ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর টু ট্রাডিশনস অব বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ, যে গ্রন্থে তিনি বাংলা ভাষায় মুসলমান ও হিন্দু উভয় শ্রেণির অবদানের ওপর গবেষণাভিত্তিক বক্তব্য রেখেছেন। এই বইটির সমকক্ষ আর কোনো গবেষণাগ্রন্থ এ পর্যন্ত বের হয়নি। ভাষা ও সাহিত্যের বাইরে বাংলার নারী প্রগতি ও মুক্তি আন্দোলন আফিয়া দিলকে আকৃষ্ট করেছে। ২০১০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের ড. নাজমা চৌধুরী, নারীনেত্রী মালেকা বেগম এবং রাবেয়া ভূঁইয়ার সঙ্গে সহযোগিতায় তিনি বেগম রোকেয়ার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য প্রকাশের জন্য একটি প্রামাণ্যগ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেন। এ কাজে তাঁদের সহযোগিতা করেন এশিয়াটিক সোসাইটির ড. সিরাজুল ইসলাম। বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বেগম রোকেয়ার অবদান স্থাপিত করে তাঁরা যে বইটি প্রকাশ করেছেন, তা আয়তনে যেমন বিশাল, তেমনি গুরুত্বেও প্রধান। প্রকৃতপক্ষে আফিয়া দিলের কোনো গবেষণাগ্রন্থই আকারে ক্ষীণ কলেবর ছিল না। এই অভিনবত্বের জন্যও তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি নিবেদিতপ্রাণ এমন পণ্ডিত ব্যক্তি সাম্প্রতিক ইতিহাসে কমই দেখা যায়। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের জন্য একটা বড় ক্ষতি হলো—এ কথা বলা যায়।
হাসনাত আবদুল হাই: কথাসাহিত্যিক ও সাবেক সচিব।

No comments:

Post a Comment