![]() |
| অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী |
রেজাউল
করিম স্যারকে হত্যা করা হয়েছে—এই সংবাদটা পাই আমার ছেলের জন্মের দুদিন পর,
তখনো আমি হাসপাতালে। ছেলের জন্মোত্তর কিছু জটিলতার কারণে তখন বেশ চিন্তিতই
ছিলাম। সত্যি কথা বলতে, হয়তো সে কারণেই তখন কিছু ভাবতে পারছিলাম না।
কিন্তু দিন যত বাড়তে থাকল, ততই স্মৃতিপটে বিভিন্ন ছবি একের পর এক ভেসে উঠতে
শুরু করে। ২০০১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে যখন ভর্তি হই,
তার কিছুদিন পরই রেজাউল করিম সিদ্দিকী স্যার বিভাগের চেয়ারম্যান হন, যিনি
আরকেএস নামেই সুপরিচিত ছিলেন। এ কথা বলতে একদমই সংশয় নেই, যে কজন শিক্ষককে
দেখে মনে হতো তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তাঁদের মধ্যে তিনি ছিলেন
অন্যতম। আমাদের ইংরেজি সাহিত্য পড়ার প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে তিনি প্রায়ই
রাগারাগি করলেও পড়াটা ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা তিনি সব সময়ই করতেন।
জোর দিয়ে বলতেন, ‘সাহিত্যকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করো, তা সে যে ভাষাতেই
হোক।’ আজকের যুগে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা যেখানে দুপুরের পর
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতে ছোটেন, সেখানে রেজাউল করিম স্যার
দুপুরের পর ছাত্রদের নিয়ে নানা তৎপরতায় মেতে উঠতেন। উৎসাহের কোনো কমতি ছিল
না তাঁর। সেতার বাজানো, গান গাওয়া, ছোট পত্রিকা সম্পাদনা করা, চলচ্চিত্র
সমালোচনা, গল্প-কবিতা লেখা—সবকিছুতেই অপরিমেয় উৎসাহ ছিল তাঁর। যারা তাঁর
কাছে যেত, তাদের তিনি হাতে ধরে অনেক কিছুই শেখাতেন। আমার এক সহপাঠী প্রথম
বর্ষে খারাপ ফলাফল করলেও তাঁর সান্নিধ্যে এসে শেষমেশ বেশ ভালো ফল করে। সে
এখন রাজশাহীর নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য পড়াচ্ছে। বন্ধুটির
সঙ্গে কথা না হলেও এখন ওর মনের অবস্থা কেমন, তা এত দূরে থেকেও আমি ঠিকই
আন্দাজ করতে পারছি। তাঁকে একজন প্রকৃত শিক্ষক মনে হতো যেসব কারণে, এর একটি
কারণ তিনি ছাত্রদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। আমাদের প্রথম
বর্ষের পরীক্ষার ফলাফল বেরোলে চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি চেষ্টা করেছিলেন,
যাতে শিক্ষকেরা ক্লাসে ছাত্রদের খাতার ভুলগুলো সরাসরি দেখিয়ে দেন। কিন্তু
তাঁর ভাষ্য অনুসারে, কোনো শিক্ষকই তাতে রাজি হননি। বলা বাহুল্য, তিনি ছাড়া।
তিনি যে পত্রের খাতা দেখেছিলেন, সেখান থেকে অনেকের ভুলত্রুটি টুকে এনে
ক্লাসে আমাদের দেখিয়েছিলেন (আর কোনো শিক্ষক তখন এ কাজ করেছিলেন বলে আমার
জানা নেই, করে থাকলে অজ্ঞানতার জন্য ক্ষমা করবেন)। এমনকি নিজের ছাত্রদের
ভালোর জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে ঝগড়াও করেছেন। সে কথা তিনি
ক্লাসে আমাদের কাছে বলতেন। তাঁর যুক্তি ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে
আমাদের জানার অধিকার আছে, এই প্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিচালিত হয়। তবে তিনি কখনো
হানিকর কাজ করতে ছাত্রদের উসকে দেননি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি
বিভাগের একধরনের নাক-উঁচু ভাব ছিল। বলা যায়, সেটাও তাঁর কারণে ভেঙে পড়তে
শুরু করে। ২০০৩ বা ২০০৪ সালে তাঁর নেতৃত্বে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি
বিভাগ বাংলা নববর্ষে প্রথম প্রকাশ্য অনুষ্ঠান করে, সেটি হয়েছিল প্রশাসন
ভবনের পেছনের আমতলায়, যদি আমার স্মৃতি প্রতারক না হয়। সেই অনুষ্ঠান নিয়ে
অনেক শিক্ষক উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু তাতেও তিনি দমেননি। তারপর থেকে
এখনো ইংরেজি বিভাগ নানা প্রকাশ্য অনুষ্ঠান করছে। খেলাধুলাতেও তাঁর আগ্রহের
কমতি ছিল না। তিনি নিজেই আন্তবিভাগীয় ক্রিকেট ও ফুটবল টুর্নামেন্টের জন্য
দল গঠন করতেন, এমনকি খেলার আগে প্রস্তুতির সময়ও মাঠে উপস্থিত থাকতেন। আমি
ক্রিকেট খেলতাম। একবার ম্যাচের আগে প্র্যাকটিসের সময় তিনি উপস্থিত হলেন,
তখন আমি নেটে ব্যাটিং অনুশীলন করছি। হঠাৎ আমার একটি জোরালো কাভার ড্রাইভ
স্যারের দিকে চলে গেল, তিন-চারজন মিলেও সে বলের গতি রুখতে পারল না, বলটা
গিয়ে লাগল সোজা স্যারের পায়ে! সত্যি কথা বলছি, এ নিয়ে স্যারের বিন্দুমাত্র
অভিযোগ ছিল না, যদিও আমি তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলাম। তিনি রাগারাগি করতেন
অনেক, কিন্তু কখনোই সে রাগ পুষে রাখতেন না। কারও ক্ষতি হোক—সেটা তিনি
চাইতেন না। আমাদের বিদায় অনুষ্ঠানেও তিনি যথারীতি কোনো এক কারণে রাগারাগি
শুরু করেন, কিন্তু পরদিন তিনি বিভাগীয় চেয়ারম্যানসহ আমাদের কাছেও তার জন্য
দুঃখ প্রকাশ করেন। আজকের যুগে এমন শিক্ষক পাওয়া সত্যিই ভার। তাঁকে কে বা
কারা কী কারণে হত্যা করল, সে প্রসঙ্গে এখন যাচ্ছি না, কিন্তু এই
হত্যাকাণ্ডের ফলে সামগ্রিকভাবে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হলো। আমরা তাঁর
হত্যাকাণ্ডসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।

No comments:
Post a Comment