Saturday, April 23, 2016

ভবন ভাঙবে না, যদি...by আনিসুল হক

ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলার পথ হচ্ছে
নির্মাণবিধি মেনে ভবন বানানো
তোমরা ভয় দেখিয়ে করছ শাসন, জয় দেখিয়ে নয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই শিকল পরা ছল গানের পঙ্ক্তি। শাসন করার জন্য দুটোই লাগে, ভয়ও দেখাতে হয়, জয়ও দেখাতে হয়। আমেরিকার রাস্তায় রাতের বেলাতেও কেউ রাস্তার লাল বাতি সবুজ বাতির সংকেত অমান্য করে না, তার একটা কারণ নিশ্চয়ই সভ্যতা-ভব্যতা, কিন্তু আরেকটা কারণ হলো, রাস্তায় সক্রিয় ক্যামেরা। ছবি উঠছে, যে গাড়ি নিয়ম ভঙ্গ করছে, তার মালিকের ঠিকানায় ঠিকই জরিমানার চিঠি পৌঁছে যাচ্ছে। কিংবদন্তির মতো প্রচলিত আছে, একবার নিউইয়র্কে রাতের বেলা বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় অনেক মারাত্মক অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল। বাংলাদেশেও আমরা দেখেছি, মইনউদ্দীন–ফখরুদ্দীনের সরকার আসার পরে লোকে আয়কর দেওয়ার জন্য লাইন দেওয়া শুরু করেছিল, দামি দামি গাড়ি রাস্তায় ফেলে রেখে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। আইনের কঠোর প্রয়োগ, আইন অমান্য করে কেউ পার পাবে না, এই দৃষ্টান্ত অনেক সময়ই কাজে দেয়। লালন বলেছেন, ‘মন সহজে কি আর সই হবা, চিরকাল ইচ্ছা মনে আল ডিঙায়ে ঘাস খাবা।’ আল ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়ার প্রবৃত্তি মানুষ মাত্রেরই আছে। আবার ওই সীমানা লঙ্ঘন করতে গিয়েই যত বিপদ। আমরা যে অনেকেই এখতিয়ারের বাইরে যেতে পছন্দ করি, তার প্রমাণ অনেকই আছে। তবে বাংলাদেশে পেশাজীবীরা কেন দলীয় তকমা লাগাতে পছন্দ করেন, এই নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা হওয়া দরকার। একজন শিল্পপতি সফল শিল্পপতি হয়ে সন্তুষ্ট থাকেন না, তিনি রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়ে এমপি-মন্ত্রী হতে চান। একই কথা প্রযোজ্য একজন শিক্ষক, সাংবাদিক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, সামরিক-বেসামরিক আমলার বেলাতেও। রাজনীতি কোনো নির্দিষ্ট পেশা নয়, রাজনীতিবিদ তৈরির কোনো কারখানা বা বিশ্ববিদ্যালয় নেই, কাজেই সব পেশা থেকেই রাজনীতিবিদ আসবেন, তা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের পেশা বদলকারী রাজনীতিবিদেরা গাছেরটাও খান, তলারটাও কুড়ান। আমি ‘এ’ দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বা ‘বি’ দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, আবার একই সঙ্গে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সংবাদপত্রের সম্পাদক, কোর্টের উকিল। এতে স্বার্থের সংঘাত হয় কি না, সেটা একটু ভেবে দেখা উচিত। রাজনীতি মহত্তম পেশা, এই পেশাতে দেশের, মানবতার, পৃথিবীর উপকার (এবং অপকার) করার সুযোগ সবচেয়ে বেশি। কাজেই রাজনীতিতে মানুষ যাক, ভালো মানুষেরা, শিক্ষিত, সাহসী, নীতিনিষ্ঠ স্বপ্নবান মানুষেরা বেশি বেশি করে যাক, এটা তো আমরা চাইবই। দুই পরিচয় বোধ হয় খুব ভালো ফল দেয় না। যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রায় নিরঙ্কুশ। লিখিতভাবে বলা আছে, আমেরিকার সংবাদমাধ্যমের অধিকার আছে মিথ্যা কথা বলার, অশ্লীল জিনিস প্রকাশ করার। কিন্তু ওই দেশের সংবাদমাধ্যম নিজেরাই কোড অব এথিকস তৈরি করে নিয়েছে। তাতে বলা আছে, প্রেসিডেন্টের বহরের সঙ্গী হয়ে কোনো সাংবাদিক সফরে যাবেন না, খবর প্রকাশ করতে হলে নিজের খরচে সাংবাদিক ওই সফরে যাবেন। আর আমাদের দেশে আমরা ক্ষমতার আশীর্বাদ পেলে নিজেকে ধন্য মনে করি। একটুখানি করুণার জন্য কী যে কাঙালপনা করি। এটা কেবল সংবাদমাধ্যমে নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে। এখন অনেক সময় সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তৃতা শুনলে মনে হয় রাজনৈতিক দলের থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ভাষণ দিচ্ছেন। আমাদের দেশে কাঙালপনার এই প্রতিযোগিতাটা কেন আর কোত্থেকে এল? আমার ধারণা এর কারণ দুটো। এক. শতকের পর শতক ধরে উপনিবেশিত থাকা। ওই সময় দেখা গেছে, যাঁরা উপনিবেশী শাসকদের আনুকূল্য পাওয়ার চেষ্টা করেছেন, তাঁরা ভালো থেকেছেন। দুই. দারিদ্র্য। জনসংখ্যা বেশি, সম্পদ কম। সীমাহীন দারিদ্র্যের কারণে মানুষ ‘অস্তিত্বের সংগ্রাম, যোগ্যতমের উদ্বর্তনের’ নীতি গ্রহণ করেছে। এই দেশে আপনি ট্রাফিক কানুন মেনে গাড়ির পেছনে গাড়ি রেখে বসে থাকবেন, যেতে পারবেন না, কিন্তু কোনোরকমে লাইন ভেঙে খানিকটা রং সাইডে গেলেই আপনি পৌঁছে যাবেন মোকামে। এই কায়দাটা দেশের মানুষ শিখে গেছে।এখানে নেতৃত্বের সামনে, কর্তৃপক্ষের সামনে আছে দুটো বিকল্প। হয় তাঁরা ভয় দেখাবেন, নয় তাঁরা জয় দেখাবেন। দুটোও একসঙ্গে চলতে পারে। মানুষকে বোঝাতে হবে, সবাই নিয়ম মানলে সবাই লাভবান হবেন। যিনি নিয়ম মানবেন না, তিনি শাস্তি পাবেন। তাহলে কিন্তু সুশৃঙ্খলা ফিরে আসবে। কিন্তু আমাদের শাসকেরা এই দুটো পদ্ধতির একটাও অবলম্বন করতে চান না, তাঁরা গ্রহণ করেন তৈল পদ্ধতি। তাঁরা তেল গ্রহণ করেন এবং নাকে তেল দিয়ে ঘুমান। কোনো সমস্যাই তাঁরা স্বীকার করেন না, কাজেই সমাধানের জন্য ‘ভয় কিংবা জয়’ কোনো পদ্ধতিই অবলম্বন করার প্রয়োজন তাঁরা মনে করেন না। তারপরেও কিছু কাজ হয় কেন! কারণ কাজ করা লাভজনক। বড় বড় কাজে বেশি বেশি লাভ। স্ট্রাগল ফর এক্সিসটেন্স আর সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্টের নীতি অনুসারে কর্তারাও যতটা পারেন নিজের আখের গুছিয়ে নেন। টাকা কিন্তু মানুষকে নিরাপত্তাও দেয়। আপনি ব্যাংক থেকে এক শ কোটি টাকা নিয়ে শোধ করলেন না, সেই টাকার খানিকটা খরচ করলেই তো আপনি পেয়ে যাবেন আপনাকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য মানব-বলয়। তবে টাকাই সব নিরাপত্তা দেবে না। ক্ষমতাও না। যেমন ভূমিকম্পের বিপদ। দেশি-বিদেশি গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। আমাদের সিলেট-ময়মনসিংহের সঙ্গে মেঘালয়ের সীমান্তজুড়ে একটা বড় ফল্ট আছে, ফাটল বলা যাবে, যা ডাউকি ফল্ট নামে পরিচিত। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি গবেষক দল বলছেন, যেকোনো সময় এই বাংলাদেশে বড় ভূমিকম্প হতে পারে। ইন্ডিয়ান প্লট, ইউরোশিয়ান প্লেট, বার্মিজ প্লেট—তিন প্লেটের মিলনস্থলে বাংলাদেশ। ইন্ডিয়ান প্লেট উত্তর-পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে, বলা হচ্ছে, এই সরে যাওয়ার ফলেই হিমালয় পর্বতমালা গড়ে উঠেছে। ১৮৯৭ সালের আসাম ভূমিকম্পে সিলেটে ৫৪৫ জন মারা গিয়েছিলেন, ময়মনসিংহ-ঢাকা রেলসেতু ভেঙে গিয়েছিল, আর নৌপথ এলোমেলো হয়ে গিয়ে যোগাযোগ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। ত্রিপুরা থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ এমনকি রাজশাহীতে ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বহু। রিখটার স্কেলে ওই ভূমিকম্প ছিল ৮ দশমিক ৭, উৎপত্তিস্থল শিলং। এরপরে ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্পে ঢাকাসহ দেশের উত্তর ভাগের অনেক ভবন ধসে পড়েছিল। আরও অনেক ছোট ও মাঝারি ভূমিকম্প হয়েছে, কোনো কোনোটার উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশের ভেতরেই, ময়মনসিংহ কিংবা মানিকগঞ্জ কিংবা দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে।
ঢাকায় যদি বড় ভূমিকম্প হয়, কী হবে? অনেক ভবন ধসে পড়বে, রাস্তাঘাট এলোমেলো হয়ে যাবে, আমাদের মাটির নিচে আছে গ্যাসের পাইপ, সেসব ছিদ্র হয়ে যাবে, ভবনের নিচে চাপা পড়ে যত মানুষ মারা যাবে, তার চেয়েও বেশি মানুষ মারা যাবে অগ্নিকাণ্ডে। পানি থাকবে না, বিদ্যুৎ থাকবে না। আর উদ্ধারকারীরাও পৌঁছাতে পারবেন না। এক রানা প্লাজা ধসের পরই আমরা উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে ঠিকভাবে পারিনি। হাজার হাজার রানা প্লাজা নিয়ে আমরা কী করব? রাস্তাঘাট নেই, বিদ্যুৎ নেই, চারদিকে আগুন জ্বলছে, হাসপাতাল ভবন নিজেই ধ্বংস, দমকল বাহিনীর ভবনই ভেঙে গেছে, ওই অবস্থাটা কল্পনা করা সত্যি কঠিন। নদী উপচে বন্যা হতে পারে, সুনামি আঘাত হানতে পারে উপকূলে।
তাহলে আমাদের কী করা উচিত? এক নম্বর হলো, বিল্ডিং কোড মেনে ভবন বানানো উচিত। সঠিকভাবে নকশা করা ও সঠিকভাবে নির্মিত ভবন নেপালের ভূমিকম্পেও ভাঙেনি। নেপালে সব চুন-সুরকির ভবন ও মিস্ত্রি দিয়ে বানানো ভবন ভেঙেছে। দুই. ঢাকায় আমাদের বেশির ভাগ ভবনের নিচের তলায় গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা রাখতে গিয়ে কতগুলো খোলা কলাম বা পিলার রাখা আছে। ভূমিকম্পে ওই জায়গাটা মট করে ভেঙে যেতে পারে। এ থেকে রক্ষা পাওয়ার একটা উপায় হলো, ওই পিলারগুলোর মধ্যে ক্রস করে ইস্পাতের বার বসিয়ে দেওয়া। কিন্তু আমি যে অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে থাকি, সেটাতেই এটা করা যাবে না, কারণ তাতে গাড়ি রাখার জায়গা থাকে না। সম্প্রতি ঢাকার এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয় বিটিআইয়ের সহযোগিতায় একটা গবেষণা করেছে। অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তাঁরা একটা ভবনে গবেষণা করে দেখেছেন, নিচতলার ওই পিলারগুলোকে ইস্পাত দিয়ে মুড়ে দিলে তা ভূমিকম্পসহ হয়ে উঠতে পারে। এতে বাড়তি খরচও কম হবে, গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গাও কমবে না। এই গবেষণাটা আরেকটু বড় আকারে করে আমাদের সবগুলো ভবনে এই প্রতিরোধী ব্যবস্থা নেওয়া বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
এতক্ষণ ভয় দেখালাম, এবার একটু জয় দেখাই। আমার জীবদ্দশায় বাংলাদেশে ভূমিকম্পে ভবন ধসে একজনকেও মরতে দেখিনি। ভূমিকম্পে মানুষ মারা গেছে ভয় পেয়ে, লাফ দিয়ে, তাড়াহুড়ো করে সিঁড়িতে পড়ে বা পায়ের নিচে চাপা পড়ে। ঢাকায় বড় কাটরা, ছোট কাটরা এই ধরনের ভবনগুলো ১৭ শতকের, প্রায় সাড়ে তিন শ বছরের পুরোনো, এগুলো যখন ভাঙেনি, তখন বোঝা যাচ্ছে, ভালোভাবে নকশা করা ও বানানো ভবন ভূমিকম্পেও ভাঙে না। কাজেই ভূমিকম্প হলে নিজের ঘরে থাকাই শ্রেয়, খেয়াল রাখতে হবে, ছাদে, তাকে বা দেয়ালে রাখা কোনো ছবি বা ভারী জিনিস যেন মাথায় না পড়ে। মাথায় বালিশ নিয়ে বিমের নিচে কলামের পাশে যাওয়া যেতে পারে। কিন্তু আমার নিজের ধারণা, আমি যে ভবনে আছি, এটা যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে আরও হাজার খানেক ভবন ভাঙবে, কাজেই আমাকে উদ্ধার করতে কেউ আসতে বাস্তবে পারবে না। সে ক্ষেত্রে পরম করুণাময়ের নাম স্মরণ করে হাসিমুখে থাকাই শ্রেয়। কান্নাকাটি করলে মৃত্যু বিলম্বিত হবে না। দৌড়ালে মৃত্যুর আশঙ্কা বাড়বে। পায়ের নিচে চাপা পড়ে মরায় গৌরব বেশি নয়।
প্রতিবছর আমেরিকায় নিজের বিছানা থেকে পড়ে মারা যান ৪৫০ জন। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২০১৪ সালে মারা গেছে ১৬ হাজার ৮৪২। আইন সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে ২০১৪ সালে গুম হয়েছে ৮৮ জন। কাজেই ভূমিকম্পে মারা যাব, এই গ্যারান্টি কেউ আমাকে দিতে পারবে না। আর অনলাইনে ফেসবুকে যে দেখছেন এত তারিখে ভূমিকম্প হবে, তা একদমই ভুয়া। ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়ার পদ্ধতি এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।
ভূমিকম্পে আমাদের ভবনগুলো ভাঙবে না, যদি না আমরা ইস্পাতের বদলে বাঁশ দিয়ে থাকি। তা করলে ভূমিকম্প লাগবে না, হরতালকারীরা পিলার নাড়লেই ইমারত ধসে যাবে। মানেটা দাঁড়াল, আমাদের ভয় ভূমিকম্পে নয়, সুশাসনের অভাবে। জলাভূমি ভরাট করে ভবন বানানোর প্রতিযোগিতায়। বিল্ডিং কোড না মানায়। নির্মাণবিধি অমান্য করায়। নির্মাণকাজে পুকুরচুরিতে। এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণে। ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ থেকে বাঁচতেও সুশাসনের তাই বিকল্প নেই।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

No comments:

Post a Comment