বুধবার
২০ এপ্রিল রিপোর্টার্স স্যঁ ফ্রঁতিয়ে (উইদাউট বর্ডারস) বা আরএসএফ
সাম্প্রতিক যে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচক প্রকাশ করেছে, তাতে বলা হয়েছে, গত
বছর বিশ্বে গণমাধ্যমগুলোর স্বাধীনতা দুর্বল হয়েছে। এই অবনতিকে ‘গভীর ও
বিচলিত হওয়ার মতো’ অভিহিত করে তারা বলেছে, বিশ্বের সব অংশেই গণমাধ্যমের
স্বাধীনতায় ভাটা পড়েছে। সূচকটিকে ২০১৬ সালের সূচক বলা হলেও কার্যত এতে
২০১৫-এর চিত্রই প্রতিফলিত। এই সূচকের প্রচলন খুব বেশি দিনের নয়, মাত্র এক
যুগের মতো। ২০০৩ সালে শুরু হওয়া সূচকটি তৈরিতে যেসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া
হয়, তার মধ্যে আছে গণমাধ্যমের প্রকৃত স্বাধীনতা, স্বনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ
সেন্সরশিপ, আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার। এবারের প্রতিবেদনে
আরএসএফের মূল্যায়নের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় রয়েছে দুটি। একটিতে
গণমাধ্যমের জন্য আতঙ্কজনক পরিবেশ সৃষ্টির প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়েছে,
‘বিশ্বনেতারা বৈধ সাংবাদিকতা নিয়ে একধরনের নির্যাতনমূলক ভীতি বা মানসিক
বৈকল্য সৃষ্টির প্রয়াস চালাচ্ছেন।’ আর দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে ‘অপপ্রচারের এক
নতুন যুগের সূচনার আশঙ্কা’ সম্পর্কে সতর্কবাণী। প্রথমটির ক্ষেত্রে বলা
হয়েছে যে অনেক দেশের সরকারই মাত্রা ছাড়ানো বিতর্কের ভয়ে গণমাধ্যমের ওপর
নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় ও
ব্যক্তিমালিকানার গণমাধ্যমে স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রচার ক্রমশই বিপদাপন্ন
হয়ে উঠছে আদর্শগত হুমকি—বিশেষত ধর্মীয় আদর্শ, যা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার
প্রতি বৈরী। বৃহদাকায় প্রচারযন্ত্রের কাছ থেকেও এই হুমকি আসছে। বিশ্বজুড়ে
বড় বাণিজ্যিক গোষ্ঠীগুলো (অলির্গাক) গণমাধ্যমের মালিকানা কিনে নিচ্ছে এবং
চাপ সৃষ্টি করছে। সরকারের চাপের সঙ্গে এই চাপ যুক্ত হওয়ায় জটিলতা আরও
বাড়ছে। আরএসএফের মহাসচিব ক্রিস্টোফা ডি লয়া সংবাদ সংস্থা এএফপিকে বলেছেন,
নতুন প্রযুক্তির কারণে ক্ষমতাসীনদের জন্য কাজটি ক্রমেই সহজ হয়ে উঠছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, সংক্ষিপ্ত বার্তা বা খুদে বার্তা যা এসএমএস নামে
পরিচিত, তার মাধ্যমে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা। প্রতিবেদনে বলা হয় যে কিছু কিছু
সরকার ইন্টারনেট বন্ধ রাখা এবং অবকাঠামো বা সম্প্রচারের সরঞ্জাম ধ্বংস করে
দেওয়ার মতো পদক্ষেপও গ্রহণ করছে। ওপরের উপসর্গগগুলোর প্রতিটিই আমাদের
পাঠকদের চেনা। অজ্ঞাত ফোন থেকে এ ধরনের হুমকি পাওয়ার অভিজ্ঞতা যে এই পেশার
জন্য নতুন উপদ্রব, সেটি আমাদের উপমহাদেশে এই পেশায় নিয়োজিতরা এখন প্রায়
মেনেই নিয়েছেন। প্রযুক্তি ব্যবহারে জনবিতর্ক নিয়ন্ত্রণে সরকারগুলো যে কতটা
বেপরোয়া হয়ে উঠছে, তার আরও অনেক নজির বিদ্যমান। তা সে ফেসবুকের মতো
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম নিয়ন্ত্রণেই হোক অথবা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭
ধারার মতো কালাকানুন প্রয়োগেই হোক। আরএসএফের বৈশ্বিক সূচকে আগেরবার
বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৬ আর এবার তা ১৪৪। এ দুই ধাপ অগ্রগতিতে ‘এ দেশে
গণমাধ্যম ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা অতীতের তুলনায় অনেক বেশি সুরক্ষিত’ বলে
প্রমাণিত হয়েছে এমন মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল
সোবহান চৌধুরী (প্রথম আলো, ২১ এপ্রিল, ২০১৬)। বাংলাদেশে সংবিধান ও ইসলাম
সম্পর্কে আলোচনা বিপজ্জনক বলে আরএসএফ যে মন্তব্য করেছে, তিনি সেই অংশটুকু
অবশ্য ‘বাস্তবসম্মত নয়’ বলে নাকচ করে দিয়েছেন। এসএমএসে হুমকি কিংবা ফেসবুক ও
ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখার মতো অভিজ্ঞতার বিষয়ে অতীতের সঙ্গে তুলনা কতটা
বাস্তবসম্মত, সে কথা না হয় না-ই তুললাম। কিন্তু সংবিধান রক্ষা,
ক্ষমতাসীনদের চেতনার ব্যাখ্যা গ্রহণের বাধ্যবাধকতা এবং ধর্মীয় অনুভূতির
প্রশ্নে অসহিষ্ণুতার প্রমাণ তো হরহামেশাই পাওয়া যায়। ১১ থেকে ১৩ এপ্রিল
লন্ডনের ওপেন ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হলো কমনওয়েলথ সাংবাদিক সমিতির
ত্রিবার্ষিক সম্মেলন। ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানার
লক্ষ্যে অনেকগুলো সেমিনার আয়োজন করে তারা। সেখানে উদ্বোধনী অধিবেশনে ৫৩টি
দেশের সংস্থা, কমনওয়েলথের নতুন মহাসচিব ব্যারনেস প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড
বলেন, গণতন্ত্রের জন্য মত প্রকাশের স্বাধীনতা একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান।
তবে, সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব
জার্নালিস্টসকে (আইএফজে) উদ্ধৃত করে তিনি বলেন যে দুঃখজনক সত্য হলো, এ বছর
ইতিমধ্যে ২৪ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ সংস্থা, ইউনেসকোকে উদ্ধৃত
করে তিনি বলেন, গত এক দশকে সাংবাদিক হত্যার ৯০ শতাংশ মামলারই নিষ্পত্তি
হয়নি। ওই একই অনুষ্ঠানে ব্রিটেনে কানাডার হাইকমিশনার গর্ডন ক্যাম্পবেল আরও
কিছু হতাশাজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা ফ্রিডম
হাউসের পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে তিনি জানান যে কমনওয়েলথের ৫৩টি দেশের মধ্যে
সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেই গণমাধ্যম পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে পারছে না। ৯টি দেশে
একেবারেই স্বাধীনতা নেই আর ১৮টিতে আছে আংশিক স্বাধীনতা।
ওই দিনের নৈশভোজে অতিথি ছিলেন কমনওয়েলথ প্রেস ইউনিয়ন ট্রাস্টের ডিরেক্টর, ব্রিটেনের ১৬১ বছরের পুরোনো পত্রিকা দ্য টেলিগ্রাফ-এর নির্বাহী পরিচালক লর্ড গাই ব্ল্যাক। তিনি বলেন যে রাজনীতিকদের মুখে মুক্ত গণমাধ্যমকে সমর্থনের কথা শুনে আমি অভ্যস্ত, তবে সাধারণত তাঁরা তাঁদের নিজের দেশের বদলে অন্যের দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসেন। কমনওয়েলথের তিনটি দেশ—জ্যামাইকা, কানাডা ও নিউজিল্যান্ডের নাম উল্লেখ করে লর্ড ব্ল্যাক বলেন যে বিশ্বে মুক্ত গণমাধ্যমের তালিকার শীর্ষে যে ১০টি রাষ্ট্র, তার মধ্যে এদের অবস্থান সমুজ্জ্বল। কিন্তু, এই একই কমনওয়েলথের অনেকগুলো দেশ বছরের পর বছর তালিকার তলায় পড়ে আছে—যাদের মধ্যে তিনি উগান্ডা, পাকিস্তান, রুয়ান্ডা, বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার নাম উল্লেখ করে বলেন যে এসব দেশে গণমাধ্যম কঠোরভাবে এবং কখনো কখনো নিবর্তনমূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত। যেসব দেশে সংবাদমাধ্যম চাপের মুখে আছে, সেখানে সমস্যার উৎস দুটি বলে তিনি মন্তব্য করেন। প্রথমটি আইনের মাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ, যেখানে মানহানির দায়কে ফৌজদারি অপরাধ এবং রাষ্ট্রদ্রোহের বিধান করে রাজনীতিকেরা বিতর্ককে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তিনি ধর্মের অবমাননাবিষয়ক আইন এবং ইন্টারনেটের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের আইনকেও এই সমস্যার উৎস বলে উল্লেখ করেন। তিনি এর সঙ্গে সম্প্রতি সন্ত্রাস দমন আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্বের চেষ্টার কথাও বলেন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পথে দ্বিতীয় প্রধান বাধা, তাঁর মতে সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা। লর্ড ব্ল্যাক বলেন যে রিপোর্টার ও সম্পাদকেরা যদি শারীরিক সহিংসতা এমনকি মৃত্যুর হুমকি থেকে মুক্ত থাকতে না পারেন, তাহলে মুক্ত সাংবাদিকতা সম্ভব নয়।
কমনওয়েলথ সাংবাদিক সমিতিতে কয়েক মেয়াদে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার। তিনি বর্তমানে এই সংস্থার প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস। অন্য একটি অধিবেশনে বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর মুখ থেকেও হতাশার কথা শুনি। তিনি দেশের সর্বাধিক প্রচারিত ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে৭২টি মামলাকে হয়রানির নতুন নজির হিসেবে বর্ণনা করেন। সংবাদপত্রে বেসরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধে সরকারি পদক্ষেপের কথাও তিনি শোনান।
পরদিন শুনি মালদ্বীপের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদের মুখে তাঁর দেশের বর্তমান অবস্থার কথা। সেখানে দেশটির সবচেয়ে পুরোনো পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া, সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার এবং তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা, টেলিভিশন কেন্দ্রে হামলা এবং আইন পাল্টে মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধে রূপান্তরের নানা বিবরণ তিনি তুলে ধরেন। ক্ষমতা হারালে রাজনীতিকেরা যা বলেন, তা তাঁরা আদতে বিশ্বাস করেন না—এটি মোটামুটি প্রমাণিত বিষয়; সেহেতু নাশিদের কথা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু, তারপরও তাঁর বক্তৃতার একটি অংশ আমার অকপট স্বীকারোক্তি বলেই মনে হয়েছে। তিনি বলছিলেন যে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীরা ঘুম থেকে উঠে সকালে যখন কোনো কাগজ হাতে নেন, তখন তাঁরা তাঁদের ভালো কাজ কতটা ভালো প্রচার পেল, সেটাই যে সবচেয়ে আগে দেখতে চান ব্যাপারটি তা নয়; বরং তাঁরা আগে দেখেন, যে তথ্যটি তিনি গোপন রাখতে চেয়েছেন, সেটা কেউ প্রকাশ করে দিয়েছে কি না। কারণ, সরকার মন্দ জিনিস গোপন করতে চায়। ভালো খবর আরও ভালো প্রচারের জন্য স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ওপর তারা নির্ভর করে না, সে জন্য সরকারি নানা মাধ্যম তাদের হাতেই আছে। রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকানার গণমাধ্যমে স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রচার ক্রমশই বিপদাপন্ন হয়ে উঠছে আদর্শগত হুমকি—বিশেষত ধর্মীয় আদর্শ, যা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি বৈরী আরএসএফের বৈশ্বিক সূচকেই আবার একটু ফিরে যাই। বাংলাদেশের চেয়ে পাকিস্তানের অবস্থা যে খারাপ, সেটা মোটামুটি সবারই জানা। কিন্তু, ভারত? বিশ্বের বৃহত্তম সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশ? বাংলাদেশের থেকে তাদের অবস্থান মাত্র ১১ ধাপ ওপরে। কিন্তু, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের স্পর্শকাতরতা প্রায় একই মাত্রায়। আরএসএফ বলছে, ভারতেও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো খুব সহজেই ক্ষুব্ধ হয় এবং সাংবাদিক ও ব্লগাররা হামলার মুখে পড়েন। সরকারের স্পর্শকাতরতার কারণে কাশ্মীরে সংবাদসংগ্রহ করা সাংবাদিকদের জন্য এখনো দুরূহ। আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাংবাদিকদের সুরক্ষার বিষয়ে নির্বিকার উল্লেখ করে আরএসএফ বলছে, সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা সেখানে ক্রমশই জোরদার হচ্ছে।
মুক্ত গণমাধ্যম কি তাহলে এই উপমহাদেশে অধরাই থেকে যাবে? তাহলে গণতন্ত্রেরই বা ভবিষ্যৎ কী?
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।
ওই দিনের নৈশভোজে অতিথি ছিলেন কমনওয়েলথ প্রেস ইউনিয়ন ট্রাস্টের ডিরেক্টর, ব্রিটেনের ১৬১ বছরের পুরোনো পত্রিকা দ্য টেলিগ্রাফ-এর নির্বাহী পরিচালক লর্ড গাই ব্ল্যাক। তিনি বলেন যে রাজনীতিকদের মুখে মুক্ত গণমাধ্যমকে সমর্থনের কথা শুনে আমি অভ্যস্ত, তবে সাধারণত তাঁরা তাঁদের নিজের দেশের বদলে অন্যের দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসেন। কমনওয়েলথের তিনটি দেশ—জ্যামাইকা, কানাডা ও নিউজিল্যান্ডের নাম উল্লেখ করে লর্ড ব্ল্যাক বলেন যে বিশ্বে মুক্ত গণমাধ্যমের তালিকার শীর্ষে যে ১০টি রাষ্ট্র, তার মধ্যে এদের অবস্থান সমুজ্জ্বল। কিন্তু, এই একই কমনওয়েলথের অনেকগুলো দেশ বছরের পর বছর তালিকার তলায় পড়ে আছে—যাদের মধ্যে তিনি উগান্ডা, পাকিস্তান, রুয়ান্ডা, বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার নাম উল্লেখ করে বলেন যে এসব দেশে গণমাধ্যম কঠোরভাবে এবং কখনো কখনো নিবর্তনমূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত। যেসব দেশে সংবাদমাধ্যম চাপের মুখে আছে, সেখানে সমস্যার উৎস দুটি বলে তিনি মন্তব্য করেন। প্রথমটি আইনের মাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ, যেখানে মানহানির দায়কে ফৌজদারি অপরাধ এবং রাষ্ট্রদ্রোহের বিধান করে রাজনীতিকেরা বিতর্ককে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তিনি ধর্মের অবমাননাবিষয়ক আইন এবং ইন্টারনেটের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের আইনকেও এই সমস্যার উৎস বলে উল্লেখ করেন। তিনি এর সঙ্গে সম্প্রতি সন্ত্রাস দমন আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্বের চেষ্টার কথাও বলেন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পথে দ্বিতীয় প্রধান বাধা, তাঁর মতে সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা। লর্ড ব্ল্যাক বলেন যে রিপোর্টার ও সম্পাদকেরা যদি শারীরিক সহিংসতা এমনকি মৃত্যুর হুমকি থেকে মুক্ত থাকতে না পারেন, তাহলে মুক্ত সাংবাদিকতা সম্ভব নয়।
কমনওয়েলথ সাংবাদিক সমিতিতে কয়েক মেয়াদে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার। তিনি বর্তমানে এই সংস্থার প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস। অন্য একটি অধিবেশনে বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর মুখ থেকেও হতাশার কথা শুনি। তিনি দেশের সর্বাধিক প্রচারিত ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে৭২টি মামলাকে হয়রানির নতুন নজির হিসেবে বর্ণনা করেন। সংবাদপত্রে বেসরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধে সরকারি পদক্ষেপের কথাও তিনি শোনান।
পরদিন শুনি মালদ্বীপের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদের মুখে তাঁর দেশের বর্তমান অবস্থার কথা। সেখানে দেশটির সবচেয়ে পুরোনো পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া, সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার এবং তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা, টেলিভিশন কেন্দ্রে হামলা এবং আইন পাল্টে মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধে রূপান্তরের নানা বিবরণ তিনি তুলে ধরেন। ক্ষমতা হারালে রাজনীতিকেরা যা বলেন, তা তাঁরা আদতে বিশ্বাস করেন না—এটি মোটামুটি প্রমাণিত বিষয়; সেহেতু নাশিদের কথা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু, তারপরও তাঁর বক্তৃতার একটি অংশ আমার অকপট স্বীকারোক্তি বলেই মনে হয়েছে। তিনি বলছিলেন যে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীরা ঘুম থেকে উঠে সকালে যখন কোনো কাগজ হাতে নেন, তখন তাঁরা তাঁদের ভালো কাজ কতটা ভালো প্রচার পেল, সেটাই যে সবচেয়ে আগে দেখতে চান ব্যাপারটি তা নয়; বরং তাঁরা আগে দেখেন, যে তথ্যটি তিনি গোপন রাখতে চেয়েছেন, সেটা কেউ প্রকাশ করে দিয়েছে কি না। কারণ, সরকার মন্দ জিনিস গোপন করতে চায়। ভালো খবর আরও ভালো প্রচারের জন্য স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ওপর তারা নির্ভর করে না, সে জন্য সরকারি নানা মাধ্যম তাদের হাতেই আছে। রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকানার গণমাধ্যমে স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রচার ক্রমশই বিপদাপন্ন হয়ে উঠছে আদর্শগত হুমকি—বিশেষত ধর্মীয় আদর্শ, যা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি বৈরী আরএসএফের বৈশ্বিক সূচকেই আবার একটু ফিরে যাই। বাংলাদেশের চেয়ে পাকিস্তানের অবস্থা যে খারাপ, সেটা মোটামুটি সবারই জানা। কিন্তু, ভারত? বিশ্বের বৃহত্তম সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশ? বাংলাদেশের থেকে তাদের অবস্থান মাত্র ১১ ধাপ ওপরে। কিন্তু, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের স্পর্শকাতরতা প্রায় একই মাত্রায়। আরএসএফ বলছে, ভারতেও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো খুব সহজেই ক্ষুব্ধ হয় এবং সাংবাদিক ও ব্লগাররা হামলার মুখে পড়েন। সরকারের স্পর্শকাতরতার কারণে কাশ্মীরে সংবাদসংগ্রহ করা সাংবাদিকদের জন্য এখনো দুরূহ। আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাংবাদিকদের সুরক্ষার বিষয়ে নির্বিকার উল্লেখ করে আরএসএফ বলছে, সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা সেখানে ক্রমশই জোরদার হচ্ছে।
মুক্ত গণমাধ্যম কি তাহলে এই উপমহাদেশে অধরাই থেকে যাবে? তাহলে গণতন্ত্রেরই বা ভবিষ্যৎ কী?
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

No comments:
Post a Comment