![]() |
| রকমারি বৈশাখী খাবারের পসরা সাজিয়েছেন কেরানীগঞ্জের জিনজিরা বাজারের এক ব্যবসায়ী। |
দশম
শ্রেণির পাঁচজন শিক্ষার্থী চকবাজারে ইতিউতি ঘুরছে। এরা এসেছে নারায়ণগঞ্জের
রূপগঞ্জের কাজী আবদুল হামিদ উচ্চবিদ্যালয় থেকে। দোকানগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে
বৈশাখী খেলনাগুলো নেড়েচেড়ে দেখছে। দামদরও করছে। এদের মধ্যে তিনজনের হাতে
ঢাউস ব্যাগ। ব্যাগের তলানিতে কিছু ঝুনঝুনি, হাতপাখা, খেলনা ঢোল। কথা বলে
জানা গেল রূপগঞ্জ থেকে চকবাজারে আসার রহস্য! পয়লা বৈশাখ থেকে তিন দিনের
একটা মেলা বসবে ওদের স্কুল মাঠে। সেই মেলায় এবার একটা স্টল নিয়েছে সাত
বন্ধু মিলে। তারই পাঁচজন এসেছে স্টল ভরিয়ে তোলার জিনিসপত্র কিনতে। চৈত্রের
খরতাপেও যে জায়গাটি বৈশাখের সাজে সেজে উঠেছে, তার নাম চকবাজার। বৈশাখের
খেলনা থেকে শুরু করে একটা মেলা বা উৎসবকে পরিপূর্ণ করার সবকিছুই পাওয়া যায়
এখানে। কয়েক দিন ধরে সারা দেশের ব্যবসায়ীদের ভিড় বেড়েছে চকবাজারে। বৈশাখী
মেলা বা ঘরোয়া উৎসবের অনুষঙ্গ খুঁজে পাওয়ার আদি জায়গা তো এটাই। যেমন
শেরপুরের শ্রীবরদী থেকে এসেছেন শহীদ জামাল নামের এক ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী।
বিভিন্ন মেলায় ফেরি করে বেড়ান তিনি। দোকান সাজিয়ে তোলেন চকবাজারের নানা
ধরনের জিনিসপত্র দিয়ে। বৈশাখ উপলক্ষে শ্রীবরদী ও গারো পাহাড় এলাকায় মেলা
বসবে। তারই কেনাকাটা করছিলেন তিনি। কেনাকাটার ফাঁকে বললেন, ‘আমি আগে অন্য
ব্যবসা করতাম। কিন্তু কয়েক বছর ধরে বৈশাখ এলেই ব্যবসা বদলাই। এই সময় সবাই
একটা উৎসবের আমেজে থাকে। তাই ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো হয়।’ কথা হলো খাজা
ট্রেডার্সের মালিক সজীব মিয়ার সঙ্গে। বললেন, এই সময় সারা দেশ থেকে নতুন ও
পুরোনো ব্যবসায়ীরা আসেন। শুধু বৈশাখী মেলায় অংশ নেবার জন্য অনেকেই কয়েক
দিনের জন্য ব্যবসায়ী বনে যান। নতুন ও পুরোনো ব্যবসায়ীদের চাপ সামাল দিতে
বাড়তি মালামাল তোলা হয় দোকানে। সজীব মিয়া আরও বললেন, এ বছর বৈশাখ উপলক্ষে
আসা জিনিসপত্রের মধ্যে আছে কাগজের ফুল, বল, হাতপাখা, খেলনা হাতি-ঘোড়া,
একতারা, ডুগডুগি, ঢোল, ঘুড়ি-নাটাই, শলার ডিজাইন, মুখোশ, বাঁশিসহ নানান
জিনিসপত্র। এগুলো সাধারণত নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও সাভার থেকে আসে। পাশাপাশি
দেশের বিভিন্ন জায়গায় অর্ডার দিয়ে আনা হয়। কিন্তু সজীব মিয়ার কণ্ঠে
খানিকটা হতাশা। বলেন, গতবারের চেয়ে এবারের ব্যবসা-বাণিজ্য তুলনামূলক কম। গত
বছর যে পরিমাণ বিক্রি হয়েছিল, এবার এখন পর্যন্ত সেটা হয়নি। এখনো তো সময়
আছে। দেখা যাক কী হয়। জিনিসপত্রের দামও কম। কিন্তু শনির আখড়া থেকে মেলার
সামগ্রী কিনতে আসা ব্যবসায়ী আবদুস সালাম তাঁর কথার সঙ্গে মোটেও একমত নন।
কাঁধে রাখা শ খানেক লাঠি গাড়ি দেখিয়ে বললেন, ‘গত বছর এগুলি সাত শ থেকে সাড়ে
সাত শ টাকায় কিনেছি, এবার কিনলাম সাড়ে আট শ টাকায়। কম কই বলেন?’মেলার
প্রাচীন ঐতিহ্যের একটি হলো খাবার। বৈশাখী খাবারদাবার খুবই বৈচিত্র্যময়।
চকবাজারে তেমন খাবারের দোকানের খোঁজ পাওয়া গেল না। পাওয়া গেল তথ্য। নদীর
ওপারে জিনজিরায় পাওয়া যাবে বৈশাখীর মুড়ি-মুড়কি, মুরালি, কদমা। সেখানেই ছুট।
পৌঁছে দেখা গেল, জিনজিরায় বাজারের বেশ কয়েকটি দোকান ঢেকে গেছে খই, মুড়ি,
কদমার ঝুড়িতে। লোকনাথ স্টোরের মালিক খোকন পাল জানালেন, এখানে সারা দেশ থেকে
ক্রেতারা আসেন। ঢাকায় খাবারের যে ভ্যানে করে বা ভ্রাম্যমাণ খাবারের
দোকানগুলো বসে, এখান থেকেই খাবারগুলো তাঁরা কিনে নিয়ে যান। জানালেন, এ
বছর খাবারের তালিকাটা লম্বা। তিলা, কদমা, নকুল দানা, বাতাসা, মুরালি,
নিমকি, চিড়ার মোয়া, খই, মুড়কি, নারকেলের নাড়ু, গোল মিষ্টি ও নিমকি। আছে গুড়
দিয়ে মাখানো খই, সাদা খই ও মুড়ি। লোকনাথেই কেনাকাটা করছিলেন মুজিবুর
রহমান। বললেন, ‘লালবাগ থেকে এসেছি কেনাকাটা করতে। প্রতি বৈশাখেই
আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে সদাইপাতি পাঠাই। এটা আমাদের পারিবারিক রেওয়াজ।’ পাশের
দোকানি রাজন পাল বললেন, শুধু ব্যবসায়ীরাই তো আসেন না, জিনজিরাসহ পুরান
ঢাকার বেশির ভাগ লোকই আসেন এখানে সদাইপাতি করতে। এটা পুরান ঢাকার রেওয়াজ।
আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে তাঁরা সদাইপাতি পাঠিয়ে দেন। নববর্ষ আসতে দেরি নেই।
বর্ষবরণের বিচিত্র প্রস্তুতিও চলছে চকবাজারে, জিনজিরায়। শুধু এ দু জায়গার
কথাই বা বলি কেন, সারা দেশই তো সাজছে নববর্ষের পোশাকে।

No comments:
Post a Comment