![]() |
| প্রথম দুই ম্যাচেই নজর কেড়েছেন ফিকরু তেফেরা |
গোল
করে ছোট্ট একটা দৌড়ে ডিগবাজি খাওয়া তাঁর অভ্যাস। ফিকরু তেফেরার কল্যাণে
দৃশ্যটা ঢাকার মাঠে নিয়মিত দেখা যাবে বলে আভাস মিলছে। শেখ রাসেল ক্রীড়া
চক্রের ইথিওপিয়ান স্ট্রাইকার চলতি স্বাধীনতা কাপে প্রথম দুই ম্যাচে ৪ গোল
করেছেন। তিনটিই ছিল গত পরশু। গোলের চেয়ে তাঁর ডিগবাজি উদ্যাপনও কম চোখ
টানছে না। বাংলাদেশের স্থানীয় কোনো ফুটবলার এখন আর দর্শক টানতে পারেন না।
যতই অবজ্ঞা করা হোক, বিদেশিদেরই (পড়ুন আফ্রিকানদেরই) যা একটু সেই ক্ষমতা
আছে। আশি-নব্বইয়ের দশকের পর সেরা বিদেশি হিসেবে সনি নর্দে মাঠে কিছু দর্শক
নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু দুই মৌসুম ঢাকায় কাটিয়ে কলকাতা মোহনবাগানকে ঠিকানা
বানিয়েছেন নর্দে। সেই থেকে আবার শূন্যতা। কে আবার মাঠে দর্শক টানবেন?
ফিকরু সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবেন কি না সময়ই বলবে। তবে তাঁর শুরুটা
আশা-জাগানিয়া। খেলে এসেছেন ভারতীয় সুপার লিগে (আইএসএল)। ৬ ফুট দীর্ঘ শরীর।
সহজেই চোখ যায় ন্যাড়া মাথার দিকে। যাক, মাঠে অন্তত এমন কাউকে পাওয়া গেল,
যাঁর দিকে চোখটা যায়! সেই ফিকরু তাঁর ঢাকার ফুটবলে আসার ব্যাপারটাকে
দেখছেন বড় পরিসরে। বসুন্ধরায় শেখ রাসেলের ক্যাম্পে ফুরফুরে সময় কাটানোর
ফাঁকে কাল দুপুরে বললেন, ‘আমি এ দেশে খেলছি, এটা এখানকার ফুটবলের জন্য
বিজ্ঞাপন হতে পারে। লোকে আমাকে চেনে, ভারতে আমি চেনা মুখ। এমন পরিচিত
খেলোয়াড় লে বাংলাদেশের ফুটবলে ভালোই হবে।’ হ্যাঁ, ফিকরু এসেই দেখালেন,
মাঠে বিনোদন দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর আছে। তবে বিনোদন মানে শুধু গোল নয়।
নিজেই বলছেন, ‘গোলের সংখ্যা বড় করে দেখি না। দলের জয়ই আসল। সেটি ১ গোলে
আসতে পারে, ৫ গোলেও...।’ ফিকরুর কোচ মারুফুল হকও এই দর্শনে বিশ্বাসী। এর
আগে নর্দে ছিল তাঁর ছাত্র, এখন ফিকরু। দুজনের মধ্যে পার্থক্য কী দেখলেন?
‘নর্দের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ছিল বলার মতো। তবে ট্যাকটিক্যাল ব্যাপারগুলোয়
ওকে কাঁচা দেখেছি। ১০ বা ৯ নম্বর পজিশন থেকে ওকে উইংয়ে যখন ৭ বা ১১ নম্বর
পজিশনে ব্যবহার করেছি, অনেক শিখিয়ে নিতে হয়েছে। কিন্তু ফিকরু সব জানে,
বোঝে—অভিজ্ঞ। এক ইশারাতেই বুঝে নিতে পারে কোচের চাওয়া। ট্যাকটিক্যাল
জ্ঞান দারুণ। হেডিং, শুটিং ভালো। একজন স্ট্রাইকারের প্রয়োজনীয় সব গুণই
ফিকরুর আছে’—বলেছেন মারুফ। পার্থক্য আছে আরেকটি জায়গায়। নর্দে ছিলেন
অন্তর্মুখী, ফিকরু চটপটে। তবে পেশাদারি মনোভাবে দুজনই সমান নম্বর পাবেন।
শেখ জামালের দুই স্ট্রাইকার ওয়েডসন ও এমেকা ডার্লিংটনও পেশাদার ফুটবলার,
ঢাকার মাঠে গোল করছেন নিয়মিত। কিন্তু মাঠে দর্শক টানার ক্ষমতা তাঁরা
দেখাতে পারেননি। ওয়েডসনকে তো ‘টিমম্যান নয়’ বলে দিলেন তাঁর সাবেক এক কোচ।
কিন্তু ফিকরুর মধ্যে ‘টিমম্যান’ গুণটা দেখে সতীর্থ গোলরক্ষক বিপ্লব
ভট্টাচার্য খুশি, ‘ফিকরু মানিয়ে নিয়েছে সবার সঙ্গে। প্রাণবন্ত থাকে।’
ফিকরুরও খুব একটা খারাপ লাগছে না বাংলাদেশের ফুটবল। তবে আইএসএলের সঙ্গে
ঢাকার ফুটবলের পার্থক্যটা দেখছেন সাদাচোখেই, ‘ঢাকায় ভালো খেলোয়াড় ও কোচ
আছে। সুযোগ-সুবিধাও খারাপ নয়। সব মিলিয়ে আমার ভালোই লাগছে। তবে ভারতে বড়
বড় তারকা খেলেন। বিশ্বমানের কোচরা আসেন। দেল পিয়েরো, আনেলকা, মাতেরাজ্জি,
রবার্তো কার্লোসদের সঙ্গে মেশার সুযোগ পেয়েছি। ওটা ছিল দারুণ ব্যাপার।’
অ্যাটলেটিকো ডি কলকাতার জার্সি গায়ে প্রথম আইএসএলেই ফিকরুকে পছন্দ করেন
বাংলাদেশের ক্লাব কর্মকর্তারা। ১২ ম্যাচে ৫ গোল—কলকাতার শিরোপা জয়ে রাখেন
অবদান। গত আইএসএলে পুরো ফিট ছিলেন না, তবে টুর্নামেন্টে নিজের একমাত্র
গোলটি সেমিফাইনালে করে চেন্নাইকে ফাইনালে তুলে দেন। চেন্নাই চ্যাম্পিয়নও
হয়েছে। প্রথম দুই আইএসএলেই চ্যাম্পিয়ন দলের ড্রেসিংরুমে থাকার অভিজ্ঞতা
তাঁর কাছে ‘অসাধারণ’। ২০০৪ পূর্ব আফ্রিকা কাপে চ্যাম্পিয়ন ইথিওপিয়ার
জার্সি গায়ে ৮ গোল করার সময়টাকে বললেন, ‘দারুণ’। তাঁর বয়স এখন ৩০। তবে ঝলক
কমেনি। দক্ষিণ আফ্রিকান স্ত্রী আর তিন সন্তানের জন্যই আরও ভালো খেলতে
চান। বাংলাদেশ পর্ব নিয়ে মজাও করতে পারছেন, ‘এখানকার ডালটা আমার ভালো
লেগেছে।’ শিখেছেন ‘কেমন আছ’ জাতীয় দু-একটা বাংলা কথা। তবে সব মনোযোগ
রাখছেন মাঠেই। যেখানে তিনি হয়ে উঠতে পারেন সনি নর্দের উত্তরসূরি!

No comments:
Post a Comment