Monday, May 9, 2016

তবু টিকে থাকার পরীক্ষা

চ্যাম্পিয়ন! চ্যাম্পিয়ন!!
ঢাকার ফুটবলে হালের আলোচিত দল চট্টগ্রাম আবাহনীর অন্দরে এখন এই শব্দটাই উচ্চারিত হচ্ছে। পরশু ঢাকা আবাহনীকে হারিয়ে ঘরোয়া ফুটবলে প্রথম কোনো ট্রফি জয়। খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তারা নিজেদের চ্যাম্পিয়নের চেয়েও আসলে বেশি কিছু ভাবছেন। পরিশ্রম, শৃঙ্খলা, অর্থ ব্যয়, খেলোয়াড়দের চেষ্টা। চট্টগ্রাম আবাহনী মৌসুমের প্রথম ট্রফিটা নিজেদের করে নিয়েছে এসবেরই দারুণ রসায়নে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, পাঁচজন মূল খেলোয়াড় আদালতের নিষেধাজ্ঞায় গোটা টুর্নামেন্টেই ছিলেন দর্শক। সেই মামুনুল, নাসিরউদ্দিন, সোহেল রানাদের ছাড়াই চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাওয়া মানে বিশাল ব্যাপার। মামুনুল এ সাফল্যের পেছনে টিম স্পিরিটকেই রাখছেন সবকিছুর ওপরে, ‘আমরা না খেললেও দলকে উজ্জীবিত রেখেছি। দলীয় সংহতি ছিল দারুণ, সবাই শতভাগ দিয়েছে।’ গোলরক্ষক কোচ মোহাম্মদ পনিরের সংযোজন, ‘সাংগঠনিক কাজটা ছিল খুবই ভালো। হোটেল থাকার পরও শৃঙ্খলা ছিল দলে। কোনো দিক থেকে কোনো কমতি ছিল না। এসবের ফল এটা।’ স্বাভাবিকভাবেই উজ্জীবিত কর্মকর্তারা। ১০ লাখ টাকা বোনাসও দেওয়া হচ্ছে খেলোয়াড়দের। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে জয় উদ্‌যাপন ছাপিয়ে হোটেলেও তা ছড়িয়ে গিয়েছিল রাতে। বাড়তি পাওনা হিসেবে আজ একটি জমজমাট অনুষ্ঠানও পাচ্ছেন খেলোয়াড়েরা। গত নভেম্বরে নিজেদের আয়োজনে শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্লাব কাপ জেতার পর ঘরোয়া ফুটবলে খুঁটিটা শক্তটা করতে চেয়েছে চট্টগ্রাম আবাহনী। শেখ কামাল ট্রফি জয়ে ছিল একদল ভাড়াটে ফুটবলারের অবদান। এবার নিজস্ব খেলোয়াড় নিয়েই এল সাফল্য। বড় দল হওয়ার পথে আক্ষরিক অর্থেও এক ধাপ এগিয়েছে চট্টগ্রাম আবাহনী। কিন্তু বড় দল হিসেবে তারা টিকে থাকবে তো? উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেকে সন্দিহান। অন্য অনেক দলের মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামোই যে নেই চট্টগ্রাম আবাহনীর! শুধু কিছু খেলোয়াড় কিনেই তো আর বড় হওয়া যায় না। ঠিক এখানেই চট্টগ্রাম আবাহনী অনেক পিছিয়ে। এটি স্রেফ এক-দুজন ব্যক্তিনির্ভর ক্লাব। আশির দশকে জন্মের পর এত দিন যক্ষের ধনের মতো ক্লাবটাকে আগলে রেখেছেন চট্টগ্রামের সাংসদ সামশুল হক চৌধুরী, ক্লাবটির মহাসচিবও তিনি। এবার ক্লাবের ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে পাশে পেয়েছেন সাইফ পাওয়ারটেকের কর্ণধার ফুটবল-অনুরাগী তরফদার রুহুল আমিনকে। এই তরফদার রুহুল আমিন সরে গেলে চট্টগ্রাম আবাহনীর পেছনে টাকা খরচ করার লোক আপাতত নেই। হালে অবশ্য তিনি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ (বাংলাদেশ সুপার লিগ) নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কর্মকর্তারা বলছেন, রুহুল আমিন সাহেব দুই দিন পর আর আগ্রহ না দেখালে চট্টগ্রাম আবাহনী হোঁচট খাবে। আগামী বছর এটি বড় দল থাকবে, সেই নিশ্চয়তা তাঁরা কেউই পাচ্ছেন না! তার ওপর সামশুল হক চৌধুরী বাফুফের নির্বাচনে সহসভাপতি পদে হেরে একটু মনঃক্ষুণ্ন। ঢাকা আবাহনীর সঙ্গে স্বাধীনতা কাপের ফাইনালটা দেখতে আসেননি বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। সালাউদ্দিন পরিষদের এই প্রার্থীকে পরিষদের ভেতর থেকেই কলকাঠি নেড়ে হারানো হয়েছে বলে শোনা যায়। অনেকের অনুমান, সামশুল হক উদ্যম হারালে চট্টগ্রাম আবাহনীর গতিটা বাধাপ্রাপ্ত হবে। সেটা মনে করিয়ে দিয়ে এক কর্মকর্তা ফিরে তাকাচ্ছেন বাস্তবতার জমিনে, ‘আমাদের কোনো সিস্টেম গড়ে ওঠেনি। আমরা হলাম ভাসমান। আগামীকাল শীর্ষ কর্মকর্তারা উৎসাহ হারালে সবই শেষ!’ চট্টগ্রামের হালিশহরে প্রায় ২২ বিঘা জমি আছে ক্লাবের, কিন্তু সেখানে কোনো অবকাঠামোই গড়ে তোলা হয়নি। একটা মাঠ তো নয়ই, থাকার ব্যবস্থাও এত দিনে হয়নি। চট্টগ্রামে ভাড়া বাড়িতে থাকতে হয় খেলোয়াড়দের, ঢাকায় এসে ঠিকানা হোটেল। এবার স্বাধীনতা কাপের হোটেলে থাকা-খাওয়ার খরচই নাকি ৪০ লাখ টাকার ওপরে এসেছে। এভাবে বিপুল ব্যয় মিটিয়ে কত দিন হোটেল থেকে ক্যাম্প চালানো যাবে অনেকে সন্দিহান।
তরফদার রুহুল আমিন অবশ্য আশাবাদী মানুষ, ‘বড় দল হিসেবে আমরা আছি, থাকব। চট্টগ্রামে ক্লাবের জায়গায় আবাসন, স্টেডিয়াম, কোচিং সেন্টারসহ ক্লাবের স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করব। আমরা একটা দীর্ঘ মেয়াদের পরিকল্পনা নিচ্ছি। ইনশা আল্লাহ, সবই হয়ে যাবে।’ পরিকল্পনা করা সহজ। সেটির বাস্তবায়নই চট্টগ্রাম আবাহনীর সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

No comments:

Post a Comment