Wednesday, May 11, 2016

‘জিঙ্গা’ নিয়ে পেলের হাহাকার

১৯৫৮ বিশ্বকাপে চমক জাগিয়ে আবির্ভাব, এরপর থেকে সুন্দর ফুটবলের প্রতিশব্দ হয়ে আছেন পেলে। একসময়ের চোখের পলকে প্রতিপক্ষকে নাচিয়ে বেড়ানো ফরোয়ার্ড এখন একটু দুর্বল হয়ে পড়েছেন শারীরিকভাবে। হাঁটতে হয় এক হাতে ছড়ি ধরে, অন্য হাত ভর দিয়ে থাকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীর কাঁধে। পায়ে জোর হয়তো আগের মতো নেই, তবে কণ্ঠটাতে এখনো ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সৌন্দর্যের জন্য একই আর্তি পেলের। ইএসপিএনের ডেভিড হিরশের সঙ্গে সাক্ষাৎকারটিতে ব্রাজিল কিংবদন্তি অনেক কথাই বললেন দেশের ফুটবল নিয়ে। সঙ্গে ছিল ইয়োহান ক্রুইফের প্রসঙ্গ, সেরা ফুটবলারের তর্ক। আর ছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা...
ডেভিড হিরশে: দুই বছর আগে শেষবার আপনাকে যখন দেখেছিলাম, মনে আছে? তার কদিন আগেই সিএনএন একটি টুইটে জানিয়েছিল আপনি মারা গেছেন...
পেলে: (হেসে) আমার মনে হয়, ওই গল্প ম্যারাডোনার বানানো!
হিরশে: তো কেমন আছেন?
পেলে: ভালোই। ব্রাজিলে আমার ডান নিতম্বে একটা অপারেশন করিয়েছি, কাজ হয়নি। তাই এখন আমেরিকার এক ডাক্তারকে দেখাতে যাচ্ছি। (সাক্ষাৎকার চলার মধ্যেই ব্রাজিলের যুবদলের কিংবদন্তি কোচ উইলসন এগিডিও ঢুকলেন পেলের সঙ্গে দেখা করতে। অনেক দিনের বন্ধু দুজন, এগিডিও ঢুকতেই পর্তুগিজ ভাষায় পেলের সঙ্গে তাঁর খুনসুটি শুরু হয়ে গেল)
উইলসন এগিডিও: (পাশেই দেয়ালে একটি ছড়ি ছিল, সেটি দেখিয়ে) ওটা তোমার?
পেলে: (হেসে) ওগুলো আমার নতুন বুট।
এগিডিও: তোমার নাতিকে কখনো খেলতে দেখেছ? (পেলের নাতি ম্যালকম ডিলুকা এগিডিওর অনূর্ধ্ব-১১ দলে খেলে)
পেলে: না, তবে ওর খেলার ভিডিও দেখেছি। পায়ের কাজ ভালোই, ভালো শটও নিতে পারে। আমি অবশ্য ওকে মজা করে বলি, দাদার মতো হতে গেলে নাদুসনুদুস ভাবটা কমাতে হবে।
এগিডিও: লাইসের খবর শুনেছ? (লাইস আরাউজো পেলের একটি দাতব্য কাজ সালভাদরের ফাভেলা প্রকল্প থেকে উঠে আসা প্রথম মেয়ে-ফুটবলার, যে বৃত্তি নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডাতে গেছে, কদিন আগে ব্রাজিলের অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের দলেও ডাক পেয়েছে)
পেলে: ওকে নিয়ে অনেক গর্ব হয় আমার। মার্তা (মেয়েদের ফুটবলে একসময় টানা পাঁচবার ব্যালন ডি’অর জয়ী ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড, ডাকনাম ‘স্কার্ট পরা পেলে’) তো চিরদিন খেলে যাবে না, আমাদের মেয়েদের দলে এমন নতুন প্রতিভা দরকার।
(সাক্ষাৎকারের পরের অংশটুকু চালিয়ে গেছেন ইএসপিএনের ডেভিড হিরশে)
হিরশে: প্রতিভা তো ব্রাজিলের ছেলেদের দলে আরও বেশি দরকার...
পেলে: হ্যাঁ, নেইমার একা তো কিছু করতে পারবে না। বিশ্বকাপে জার্মানি ম্যাচে ও খেলেনি, কী হয়েছে তা তো দেখেছেনই।
হিরশে: নেইমারের মতো এমন আরও কজন কেন নেই? যে দেশে কিনা এক বিশ্বকাপেই এই মানের চারজন ছিলেন (১৯৭০ বিশ্বকাপজয়ী দল), আরেকটি বিশ্বকাপে ছিলেন তিনজন (২০০২ বিশ্বকাপজয়ী দল)? সব ‘সাম্বা বয়েজ’ কোথায় হারিয়ে গেল?
পেলে: আমি, গারসন, রিভেলিনো ও টোস্টাও সবাই-ই ‘নাম্বার টেন’ ছিলাম। কিন্তু তবু কোচ (১৯৭০ বিশ্বকাপে ব্রাজিল কোচ মারিও জাগালো) আমাদের সবাইকে একসঙ্গে মাঠে দেখতে চেয়েছিলেন এবং সবাইকে জায়গা করে দেওয়া যায়, এমন একটা ছকও তৈরি করেছিলেন। জাপানেও ঠিক তা-ই। আমাদের রোনালদো, রোনালদিনহো ও রিভালদো ছিল, যাদের সবারই ছিল ব্যক্তিগত ঝলক। সেটিই আমাদের আরেকবার বিশ্বকাপ জেতাল। কিন্তু এখন আমাদের এমন একজন কোচ আছেন (কার্লোস দুঙ্গা), যাঁর কিনা ব্যক্তিগত এমন দক্ষতার প্রতি কোনো আগ্রহই নেই।
হিরশে: কদিন আগেই নিশ্চিত হলো, নেইমার কোপা আমেরিকা নয়, শুধু অলিম্পিকে খেলবেন। সিদ্ধান্তটার সঙ্গে আপনি একমত?
পেলে: হ্যাঁ। অলিম্পিকের আয়োজক আমরা। ভালো কিছু করে দেখানো এবার তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ, যেন বিশ্বকাপ দুঃস্বপ্ন নিয়ে মানুষের কান্না বন্ধ হয়। বিশ্বকাপের দল থেকে মাত্র চারজনকেই অলিম্পিকের ২৩ সদস্যের দলে নিয়েছেন দুঙ্গা। তবে আমার এখনো ভয় আছে, নেইমারকে সাহায্য করার মতো তেমন কোনো সৃষ্টিশীল খেলোয়াড় তো এখানেও নেই। বিশ্বকাপেও একই অবস্থা ছিল।
হিরশে: তার মানে কি এটা বোঝাতে চাচ্ছেন যে, ফ্রেড-হাল্কদের মতো খেলোয়াড়েরা সৃষ্টিশীল নন?
পেলে: (হাসি) ওরা স্কলারির (২০১৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কোচ লুইস ফেলিপে স্কলারি) ধরনের খেলোয়াড়—দৌড়াবে, বলের জন্য লড়বে, কিন্তু জিঙ্গা ছিল না ওদের মধ্যে। দক্ষিণ আমেরিকার অন্য দেশগুলো—আর্জেন্টিনা, চিলি, এমনকি ইকুয়েডরও এখন ব্রাজিলের চেয়ে সুন্দর ফুটবল খেলে। এর ফলে কী হয়েছে, তা তো সর্বশেষ দুটি কোপা আমেরিকাতেই দেখেছেন। দুবারই আমরা প্যারাগুয়ের কাছে হারলাম, টাইব্রেকারে।
হিরশে: সুন্দর ফুটবলের প্রসঙ্গেই বলতে হচ্ছে, ইয়োহান ক্রুইফ কিছুদিন আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর বিপক্ষে কখনো খেলেছেন?
পেলে: না, সে আমার পরে এসেছে। তবে বিপক্ষে না খেললেও তাকে খেলতে দেখেছি। আমার জীবৎকালে দেখা সেরা পাঁচ ইউরোপিয়ান খেলোয়াড়ের তালিকায় ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, জর্জ বেস্ট, আলফ্রেডো ডি স্টেফানো ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে ওকে রাখব।
হিরশে: শুধু ইউরোপ, বিশ্বে নয়?
পেলে: বিশ্বজুড়ে হিসাব করলে একই গ্রুপে ম্যারাডোনা ও মেসিকেও রাখব।
হিরশে: এই দলে নিজেকে কত নম্বরে রাখবেন?
পেলে: আমার ক্যারিয়ারে এমন দুটি সময় এসেছে, যখন মনে হচ্ছিল আমিই সেরা, ১৯৬২ সালে সান্তোসে যখন কুতিনহোর সঙ্গে খেলছিলাম, আর ১৯৭০-এ জাতীয় দলে যখন টোস্টাওয়ের সঙ্গে। তবে এখন যুগ ভিন্ন, খেলার ধরনও বদলে গেছে। আর মেসি-রোনালদোও এখনো খেলে যাচ্ছে। তুলনাটাতে তাই শেষ কথা বলা যাচ্ছে না।
‘জিঙ্গা’ মানে...
পেলের সাক্ষাৎকারে বেশ কয়েকবারই একটা শব্দ উঠে এসেছে—জিঙ্গা। অর্থ কী শব্দটার? পর্তুগিজ ভাষায় শব্দটার মানে ‘শরীরের দুলুনি’। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে আছে এই জিঙ্গা। শব্দটার উৎপত্তি হয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের সময়। পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ক্রীতদাসদের যখন ব্রাজিলে নিয়ে আসা হতো, কঠোর পরিশ্রমের ধকল থেকে মনোযোগটা সরিয়ে নিতে একটু বিনোদনের জন্য দাসদের অবলম্বন ছিল ‘জিঙ্গা’। সেটিকে প্রথম ফুটবলের–বিনোদনের অনুষঙ্গ করে তুলেছেন পেলে। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে সেমিফাইনাল ও সুইডেনের বিপক্ষে ফাইনালে নৃত্যপর ভঙ্গিতে হঠাৎ শরীর দুলিয়ে একদিকে সরে যাওয়ার জাদু দেখিয়েছিলেন ১৭ বছর বয়সী পেলে। এরপর থেকে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের সৃষ্টিশীলতার প্রতীক হয়ে ফুটবল অভিধানে ঢুকে গেছে শব্দটা—জিঙ্গা।
বিশ্বকাপে৭-১নিয়ে
এটা নিয়ে কথা বলতে গেলেই দুঃখ হয় আমার। ম্যাচটা দেখার সময়ই কেঁদেছিলাম। সেটি শুধু স্কোর দেখে নয়। আমি কেঁদেছিলাম, কারণ আমাদের ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের আনন্দটাই কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ নিয়ে
হয়তো এই গ্রীষ্মের অলিম্পিক ও কোপা আমেরিকায় আমরা বিশ্বকে দেখিয়ে দিতে পারব, ব্রাজিল কীভাবে ফুটবল খেলে! কিন্তু সেটা সহজও হবে না। আমি ভয় পাচ্ছি, কারণ আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি।

No comments:

Post a Comment