![]() |
| মানপ্রিত সিং আনন্দ |
যুক্তরাষ্ট্রের
উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মানপ্রিত সিং আনন্দ মনে করেন, অর্থনৈতিক
উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা অভাবিত। ‘উন্নয়নের
মডেল’ হিসেবে স্বীকৃত এই দেশকে উগ্র জঙ্গিবাদের মতো সমস্যা এড়াতে সর্বত
সহযোগিতা দিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত। সেই লক্ষ্যে তারা ইতিমধ্যে একযোগে
কাজ করে যাচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার ওয়াশিংটন ডিসিতে রক্ষণশীল গবেষণা
প্রতিষ্ঠান হেরিটেজ ফাউন্ডেশন কর্তৃক আয়োজিত ‘জঙ্গিবাদ ঠেকাতে বাংলাদেশ কী
করতে পারে?’ শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে মানপ্রিত সিং আনন্দ এই মন্তব্য
করেন। যুক্তরাষ্ট্রের উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক
বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্জন এক কথায় ‘তুলনাহীন’। যেহেতু বাংলাদেশের
ব্যাপারে আমরা এতটা আশাবাদী, তাই বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থানে
যুক্তরাষ্ট্র এতটা উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারকে এই পরিস্থিতি
মোকাবিলায় সব রকম সহযোগিতা প্রদানে যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ। দুই সরকারের
সর্বোচ্চ পর্যায়ে এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। গত সপ্তাহে ঢাকায় মার্কিন
দূতাবাসের একজন সাবেক কর্মী ও ইউএসএআইডির কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে
মানপ্রিত সিং আনন্দ বলেন, বাংলাদেশকে কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সে
ব্যাপারে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। সে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সহকারী
পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল ইতিমধ্যে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে
গেছেন। মার্কিন উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ‘মধ্যপন্থী ও
সহিষ্ণু’ দেশ হিসেবে তার উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখুক—যুক্তরাষ্ট্র সে
ব্যাপারে আগ্রহী। সে লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে
ব্যক্তি স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্য রক্ষা করা। তিনি উগ্র
জঙ্গিবাদের কারণ চিহ্নিত করার বদলে ব্যক্তিস্বাধীনতা সংকুচিত করা বা
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দোষী সাব্যস্ত করার যেকোনো প্রবণতা অনুসরণের
বিরুদ্ধে মত রাখেন। তিনি বলেন, সহিংস কর্মকাণ্ডের জন্য যারা দায়ী, তাদের
বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের শাসন ও মত
প্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখা অত্যন্ত জরুরি। আলোচনায় অংশ নিয়ে
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের দক্ষিণ এশিয়া-বিষয়ক পরিচালক সামিনা আহমেদ
বলেন, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে উগ্র জঙ্গিবাদ যে পর্যায়ে পৌঁছেছে,
বাংলাদেশ সেখান থেকে অনেক দূরে। তবে উগ্রবাদ যাতে শিকড় না গাড়তে পারে, সে
জন্য এখন থেকেই সচেতন থাকতে হবে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক
দলের অব্যাহত দ্বন্দ্ব যে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে, জঙ্গিবাদের
বিস্তারে তা সহায়ক। বিরোধী বিএনপি এত দিন সরকার পতনের যে এক দফা এজেন্ডা
অনুসরণ করে আসছিল, তা থেকে সরে আসছে—বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন,
বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে ‘রাজনৈতিক উপশমে’ উদ্যোগী হওয়া। সে লক্ষ্যে
আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে সর্বাধিকার দেওয়া উচিত বলে তিনি
মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, জিএসপি প্রদানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যে
শর্তারোপ করেছে; মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও
যুক্তরাষ্ট্র অনুরূপ শর্তারোপ করতে পারে। ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক
আলী রীয়াজ বলেন, গত ১৪ মাসে উগ্র জঙ্গিবাদীদের হাতে আক্রমণের সংখ্যা তাঁর
হিসাব অনুসারে ৩৫, যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি। তিনি বলেন, এই সময়ের মধ্যে
জঙ্গিবাদের ব্যাপারে সরকারের অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে। একসময়
ভিন্নমতাবলম্বী ব্লগারদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সংহতি প্রকাশ করেছিলেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তিনি উল্টো ব্লগারদের ইসলামবিরোধী মন্তব্যের জন্য
দোষারোপ করেছেন। উগ্রবাদীদের বিচারকার্যে সরকারের ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে
তিনি বলেন, দেশে একধরনের ‘অপরাধ করেও শাস্তি না পাওয়ার সংস্কৃতি’ জন্ম
নিয়েছে। এর ফলে যে সহায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা জঙ্গিবাদের বিস্তৃতির
জন্য সহায়ক। আলোচনা শেষে প্রথম আলোকে আলী রীয়াজ বলেন, জঙ্গিবাদ প্রতিহত
করতে হলে একদিকে যেমন চাই সন্ত্রাসবাদবিরোধী প্রচেষ্টা শক্তিশালী করা,
তেমনি দরকার সন্ত্রাসবাদের বিস্তৃতিতে সহায়ক পরিস্থিতির মোকাবিলা। সে জন্য
যা জরুরি তা হলো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সবার অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি, আইনের
শাসন প্রতিষ্ঠা, অপরকে দোষারোপের প্রবণতা পরিহার এবং অপরাধ করেও পার
পাওয়ার ব্যবস্থা বন্ধ করা।

No comments:
Post a Comment