Saturday, May 14, 2016

লাখো জিপিএ-৫, ভালো না খারাপ?

গতকালের পত্রিকায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ছবি ছাপা হয়েছে, তারা হাসছে, নাচছে, আনন্দে ফেটে পড়ছে, এটা দেখতে আপনাদের কেমন লাগে? আমার কিন্তু ভালোই লাগে। এ বছর আটটা সাধারণ শিক্ষা বোর্ড থেকে মাধ্যমিক পাস করেছে ১১ লাখ ৫৩ হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রী। আর সব মিলিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার। ডেনমার্কের জনসংখ্যাই ৫৬ লাখ, ফিনল্যান্ডের ৫৪ লাখ, আইসল্যান্ডের ৩ লাখ ৩০ হাজার। লাতিন আমেরিকার লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ তাঁর নোবেল পুরস্কার ভাষণে বলেছিলেন, লাতিন আমেরিকায় যত শিশু জন্মায়, তা প্রতিবছর নিউইয়র্কের জনসংখ্যাকে ছয় গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। আমরা বলব, আমাদের যত ছেলেমেয়ে মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পায়, তিন বছরে তা আইসল্যান্ডের জনসংখ্যাকে দ্বিগুণ করে দিতে পারে।
সংখ্যা বা পরিমাণ আমাদের একটা বিশাল শক্তি। আমাদের জনসংখ্যার বেশির ভাগ তরুণ, এরা লেখাপড়া করছে, এরা উৎপাদনশীলতায় আর সৃজনশীলতায় টগবগ করে ফুটছে। এক বছরে যত ছেলেমেয়ে মাধ্যমিক পাস করে বেরোচ্ছে, তাদের সবাই যদি দৈনিক পত্রিকা পড়তে শুরু করে, এক বছরেই বাংলাদেশে খবরের কাগজের পাঠক বেড়ে হবে দ্বিগুণ। এদের সবাই যদি টুথব্রাশ ব্যবহার করতে শুরু করে, এক বছরে ৬০ লাখ টুথব্রাশ বিক্রি হয়ে যাবে—শুধু এবারের মাধ্যমিক পাস শিক্ষার্থীদের দ্বারা। এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভেতর থেকে অনেকেই বেরিয়ে আসবে, যারা ভবিষ্যৎ জীবনে পরিচয় দেবে মেধার চূড়ান্ত বিকাশ ও প্রকাশের। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিদ্যায়তনে যাবে, সেখানেও তারা নাম করবে। কেউ হবে গবেষক, কেউ হবে উদ্যোক্তা, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ ভাবুক, কেউ কর্মী, কেউ শিল্পী। মানুষ একটা আশ্চর্য সম্ভাবনার নাম। বাংলাদেশে বৃক্ষের জন্ম ও বিকাশের জন্য নরম মাটিরও দরকার পড়ে না। এখানে দেয়ালের ওপরে গাছ জন্মে, ইটের ফাঁকে জন্মে, এমনকি গাছের ওপরে গাছ জন্মে।
আমাদের ভবনগুলোর দেয়ালে দেয়ালে সবুজ শেওলা। আমাদের ছাতায়, আমাদের জুতায়, আমাদের বইয়ে বইয়ে ছত্রাক জন্মে ছেয়ে থাকে, ব্যাঙের ছাতার মতো কথাটা এখানে শাব্দিক অর্থেই নিতে হবে। কাজেই এই লাখ লাখ ছেলেমেয়ে যখন কর্মজীবনে প্রবেশ করবে, আমরা একটা ইতিবাচক কর্মমুখর আলোকিত বাংলাদেশ পাব, এটা আশা করা যায়। অনেক বড় হিমালয় পর্বতমালা আছে বলেই আমরা একটা এভারেস্ট পাই। আমাদের শিক্ষার্থীসংখ্যা বেশি, এখান থেকে এভারেস্টতুল্য মানুষ পাব, এটা আমরা আশা করতেই পারি। কিন্তু আমাদের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই হবে। সেটা যেমন প্রাথমিক স্তরে, তেমনি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও। কতগুলো সাধারণ ও উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যা তো আছেই। এক নম্বর হলো, আমাদের লেখাপড়ার উদ্দেশ্যই হলো গাড়িঘোড়া চড়া। অর্থাৎ গরিব এই দেশের মানুষ দারিদ্র্য দূর করার উপায় হিসেবে লেখাপড়া শেখে। কৃষকের ছেলে ম্যাট্রিক পাস করে বিপদে পড়ে, কারণ আর সে হালচাষ করতে যেতে পারবে না, তাকে একটা পিয়নের চাকরি জোগাড় করতে হবে। আর যদি সে ছাত্র ভালো হয়, তাহলে তো আকাশই কেবল তার সীমা, সে জজ-ব্যারিস্টার তো হতে পারেই, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হতে পারে, আমেরিকার বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকও হতে পারে। কিন্তু ধরা যাক, বিল গেটসের ছেলে তাহলে পড়াশোনা করবে কেন?
তার তো গাড়িঘোড়া চড়ার জন্য লেখাপড়ার দরকার নেই! উত্তরাধিকার সূত্রেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটা দুর্বলতা ছিল, সেটা ঔপনিবেশিক আমল থেকে পাওয়া, লেখাপড়ার উদ্দেশ্য হলো কেরানি তৈরি। ছুটির ঘণ্টা নামে একটা বাংলা চলচ্চিত্র ছিল। সেই চলচ্চিত্রে স্কুলের একটা ক্লাসে একটা মোটাসোটা হাবাগোবা ছাত্র ছিল, তাকে সবাই ডাকত ‘বাবা গণেশ’ বলে। আমাদের ছোটবেলায় স্কুলে দু-চারটা বাবা গণেশ থাকত। তার বাবা হয়তো মনিহারি দোকানদার বা মিষ্টির দোকানের মালিক। শিক্ষকেরা তাদের খোঁটা দিতেন, তুই লেখাপড়া করে কী করবি, দুই দিন পরে তো গিয়ে দোকানের গদিতে বসবি। মানে আমাদের শিক্ষকদের কারও কারও ধারণা ছিল যে ব্যবসা জিনিসটা ভালো না। কেউ হতাশ হয়ো না। দুটো জিনিস অর্জনের চেষ্টা করো। এক. দক্ষতা। দুই. জ্ঞান। জীবন একটা আনন্দের নাম। এটা যাপন করাটাই একটা সফলতা। আইনস্টাইন বলেছেন, ‘জীবন বাইসাইকেল চালানোর মতো, ভারসাম্য বজায় রাখতে এটা চালিয়ে যেতেই হয়।’
কবি নির্মলেন্দু গ্ুণ বছর দুয়েক আগে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর একটা হাসপাতালে নীত হন।
তখন তাঁকে দেখতে যেতাম। কেবিনে বসে বসে দুজনে গল্প করতাম। তাঁকে বললাম, ‘গুণদা, আপনি কবি, বিখ্যাত মানুষ, আপনি কবিতা লেখেন। কিন্তু এই যে একজন উদ্যোক্তা এই হাসপাতালটা বানিয়েছেন, কত লোকের চাকরি হচ্ছে, কত মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছে, এইটা কি কম মূল্যবান?’ তিনি আমার সঙ্গে একমত হয়েছিলেন। কাজেই কেউ যদি উদ্যোক্তা হয় এবং তাতে সফল হয়, সেটাও কিন্তু দেশের ও দশের অনেক কাজে লাগে। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা আগে হতে চাইত ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার। এখন নাকি বিজ্ঞানে আগ্রহ কমে গেছে, ছেলেমেয়েরা বাণিজ্য বিভাগে পড়তে চায়। এমবিএ, বিবিএ করতে চায়। তা সে ডাক্তারই হোক, ইঞ্জিনিয়ারই হোক, ব্যবসায়িক পেশাজীবীই হোক, রাজনীতিবিদই হোক, সে যেন ভালোত্বটা অর্জন করে, মানে ডাক্তার হলে ভালো ডাক্তার হয়, ইঞ্জিনিয়ার হলে ভালো ইঞ্জিনিয়ার হয়, নেতা হলে ভালো নেতা হয়, ব্যবসায়ী হলে ভালো ব্যবসায়ী হয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, ভালো মানুষ হোক।
এখানে অভিভাবকেরা এবং ওয়াকিবহাল মহল দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। আমাদের দেশে শতকরা ৯৯ ভাগ ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়। পাঁচ বছর পড়ার পর তাদের অনেকেই খবরের কাগজ, চিঠিপত্র ঠিকভাবে পড়তে পারে না, হিসাব-নিকাশ করতে পারে না। কয়েকটা লাইন শুদ্ধভাবে লিখতে পারে না। আমি কি ভয়ে ভয়ে একটা কথা বলব, এক পৃষ্ঠা বাংলা লিখতে দিলে আমরা বেশির ভাগই পুরোটা নির্ভুল লিখতে পারব না। এটা একটা ভয়াবহ দুঃসংবাদ। এরপরে আছে পরীক্ষার মান। প্রাপ্ত ফলের সঙ্গে পরীক্ষার্থীর বাস্তব দক্ষতা, জ্ঞান ও অর্জনের পার্থক্য। এবার যারা এসএসসি পাস করল, তাদের সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। কিন্তু এবার যারা এইচএসসি দিচ্ছে? তাদের সারাক্ষণ ফেসবুকে পাওয়া যায়। কেন পাওয়া যায়, কর্তৃপক্ষ খোঁজ নিয়ে দেখতে পারে। আর আছে কোচিং সেন্টার। এদের কাজ পরীক্ষার্থীদের কোনো একটা বিষয় সম্পর্কে, জগৎ সম্পর্কে, জীবন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া নয়, কোনো একটা বিষয়ে কী করে বেশি নম্বর পাওয়া যায়, তা শেখানো। অর্থাৎ গাড়ি চালানো না শিখেই গাড়ি চালানোর পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার কৌশলগুলো আমাদের শিক্ষার্থীরা রপ্ত করে। এখন শুনছি, কোনো ব্যাচে মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় যারা প্রথম দিকে ছিল, তারা একটা এলাকার একই কোচিং সেন্টার থেকে আসা, তারা কলেজে এসে আর ঠিকমতো পাসও করতে পারছে না। এরই প্রতিফলন আমরা দেখেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরা গণহারে ফেল করেছে।
তাহলে আশার জায়গাটা কোথায়? আশার জায়গাটা হলো, পরিমাণগত বিশালতার ভেতর থেকে গুণগত উৎকর্ষও আমরা পাব। মানুষ এক আশ্চর্য সম্ভাবনাময় প্রাণী। মুস্তাফিজ উঠে আসবে সাতক্ষীরার গ্রাম থেকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আসবেন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া থেকে, গোপালগঞ্জ থেকে যেখানে যেতে দুদিন লাগত। যাকে বলা হয় স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আইনস্টাইন, সেই এফ আর খান তো ঢাকারই সন্তান। জীবনানন্দ দাশ এসেছেন বরিশাল থেকে। সম্প্রতি ব্রেকথ্রু পুরস্কার পাওয়া বাংলাদেশের দুই বিজ্ঞানী—দীপঙ্কর তালুকদার উঠে এসেছেন বরগুনা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে, আর সেলিম শাহরিয়ার এসেছেন পাবনার বেড়া থেকে। অর্থাৎ ব্যক্তিমানুষের ভেতরে প্রতিভা থাকলে তা পাথুরে বাধা অতিক্রম করেও মাথা তুলে দাঁড়ায়। কিন্তু শিক্ষার গড় মান যে নেমে গেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর তা উদ্বেগজনকও। আমাদের যে শ্রমিকেরা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে যাচ্ছেন, তাঁরা যদি একটুখানি প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা নিয়ে যেতে পারেন, তাঁরা শ্রমিক থেকে উত্তীর্ণ হবেন পেশাজীবীতে। অন্যদিকে ১৩ কোটি মানুষ কীভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে, যদি তারা লেখাপড়া না-ই জানবে? এসএমএসও তো তারা পড়তে পারে।
লাখো ছেলেমেয়ের জিপিএ-৫ পাওয়া নিয়ে তাই আমাদের দুশ্চিন্তার ব্যাপার আছে, আশাবাদী হওয়ারও ব্যাপার আছে। এই বিপুলসংখ্যক ছেলেমেয়ের কৃতকার্যতা ঘরে ঘরে একটা আশাবাদের হাওয়া বইয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জেও মানুষ ভাবছে, তাদের ছেলেমেয়েরা মানুষ হবে, তাদের দিন পাল্টাবে। এই আশাবাদ ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করবে, আমাদের জাতি সামনের দিকে এগোবে। আর যারা জিপিএ-৫ পায় না? জীবন কাউকেই খালি হাতে ফেরায় না। বাস্তব জীবনে ভালো ফল করা আর খারাপ ফল করা ছেলেমেয়েদের মধ্যে যে কে ভালো করবে, আগে থেকে বলা যায় না। সেই যে বিল গেটসের নামে প্রচলিত উক্তিটি, ‘আমি হার্ভার্ডে কয়েকটা বিষয়ে ফেল করেছিলাম আর আমার এক বন্ধু সব বিষয়ে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিল। আমার সেই বন্ধুটি এখন আমার প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি করে।’ কাজেই শিক্ষার্থীদের বলব, কেউ হতাশ হয়ো না। দুটো জিনিস অর্জনের চেষ্টা করো। এক. দক্ষতা। দুই. জ্ঞান। জীবন একটা আনন্দের নাম। এটা যাপন করাটাই একটা সফলতা। আইনস্টাইন বলেছেন, ‘জীবন বাইসাইকেল চালানোর মতো, ভারসাম্য বজায় রাখতে এটা চালিয়ে যেতেই হয়।’ কিন্তু সবটা মিলিয়ে আমরা চাইব, ভালো মানুষ। সুন্দর মানুষ। আমাদের দেশে দেখতে পাই, তথাকথিত শিক্ষিত মানুষেরা, ভালো ফল করা মানুষেরা দুর্নীতি করে। ডাক্তার সাহেব হয়তো রোগীর পথ্য থেকে চুরি করেন, ইঞ্জিনিয়ার সাহেব লোহার বদলে ভবনে বাঁশ দেন।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার বলেন, সফলতা নয়, কাম্য হওয়া উচিত সার্থকতা। তিনি বলেন, ফুলের রং হলো সফলতা, সৌরভ হলো সার্থকতা। আমি একটু বেয়াদবি করি, স্যারের কথাটাকে সম্প্রসারিত করি, কুমড়ো ফুল থেকে ফল হয়, এটা হলো সফলতা, আর গোলাপ ফুল থেকে ফল হয় না, বীজ হয় না, কিন্তু তার আছে সৌন্দর্য ও সৌরভ। এটা হলো সার্থকতা। আমরা যেমন সফল মানুষ চাই, আমরা তেমনি সার্থক মানুষও চাইব, মোটের ওপর চাইব ভালো মানুষ। সবটা মিলিয়েই আমাদের এই অপরূপ মানবজনম।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

No comments:

Post a Comment