![]() |
| থিতিনান পংশুধিরক |
সাম্প্রতিক
বছরে থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার যেভাবে বিপরীতমুখী রাজনৈতিক পথে ধাবিত হয়েছে,
যেটা একদম পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মধ্যে বেমানান। আধা শতকেরও বেশি পুরোনো
সামরিক একনায়কত্বের অবসান ঘটিয়ে মিয়ানমার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা
পুনরুদ্ধার করেছে। সাবেক রাজনৈতিক বন্দী অং সান সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর
ডেমোক্রেসির (এনএলডি) নেতৃত্বে বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ওদিকে গত
এক দশকে থাইল্যান্ড দুবার জনপ্রিয় শাসনব্যবস্থা থেকে সামরিক একনায়কতন্ত্রে
প্রত্যাবর্তন করেছে। প্রথম অভ্যুত্থানটি হয়েছিল ২০০৬ সালে আর দ্বিতীয়টি
২০১৪ সালে। কী কারণে এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এভাবে
বদলে গেল?
মিয়ানমার ২০০৩ সালেই গণতন্ত্রে উত্তরণের যাত্রা শুরু করে, সেবার দেশটির সামরিক শাসক সাত স্তরের এক রোডম্যাপ তৈরি করেন। সামরিক জান্তা অশনিসংকেতটা ঠিক দেখতে পেয়েছিল। তারা জানত, সহিংসতা ও নিপীড়নের মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা যাবে না। কারণ, আন্তর্জাতিক অবরোধ ও বিচ্ছিন্নতার কারণে একসময় না একসময় ঠিকই ভেঙে পড়তে হবে, সেটা তারা বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু যেটা তারা বুঝতে পারেনি সেটা হলো, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদারীকরণ কত দ্রুত ঘটবে। ২০১১ সালে যখন প্রকৃত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কার শুরু হলো, তখন সেখান থেকে পিছিয়ে আসার যে খেসারতটা মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে দিতে হয়েছে, তা ছিল অকল্পনীয়ভাবে বেশি। ২০১৫ সালের নির্বাচনে এনএলডি ভূমিধস বিজয় লাভ করে। কিন্তু সু চির পরিবারের সদস্যের বিদেশি নাগরিকত্ব থাকার কারণে যখন তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারলেন না, তখন তিনি এক নজিরবিহীন কাজ করলেন, রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম দেখাশোনা করার জন্য তিনি ‘রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা’ হলেন। আর প্রেসিডেন্ট হলেন থিন কিউ, যিনি সু চির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মানুষ। ওদিকে সামরিক বাহিনী সংবিধান মোতাবেক ২৫ শতাংশ সংরক্ষিত আসন ধরে রেখেছে (যেখানে সংবিধান সংশোধন করতে হলে ৭৫ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগে), স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও সীমান্ত মন্ত্রণালয়ের ওপরও তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। কিন্তু জেনারেলরা কথা রেখেছেন, তাঁরা সু চি ও এনএলডিকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিচ্ছেন।
দায়টা এখন সু চির কাঁধেই, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে রাখার জন্য যা করা দরকার, তাঁকে সেটা করতে হবে। অর্থাৎ তাঁকে খুব সতর্কভাবে পা ফেলতে হবে। কারণ, তিনি একদিকে সামরিক বাহিনীর অতীতের অপকর্মের বিচার চান, আবার ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতি সামাল দিতে চান। বড় পদক্ষেপ নিতে গেলে তাঁকে ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে। ফলে তাঁকে আপসের পথে হাঁটতে হবে। থাইল্যান্ডের নেতারাও এটা শিখতে পারেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার দল ও রাজতন্ত্রী রক্ষণশীল বিরোধীপক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে দেশটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে থমকে আছে। থাকসিনের দল পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ব্যাপক সফলতার সঙ্গে গণতন্ত্রায়ণ করেছে, ফলে ২০০১ সাল থেকে সব কটি নির্বাচনেই তারা জিতেছে। কিন্তু থাকসিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। ২০০৬ সালে গণবিক্ষোভ শুরু হয়, মাসাধিক কাল তা চলার পর সামরিক অভ্যুত্থান হয়। এরপর জেনারেলরা থাকসিনের নির্বাচনী সক্ষমতা কমানোর প্রাণান্ত চেষ্টা চালান। তাঁরা নতুন এক সংবিধানের খসড়া করেন, যেখানে সিনেটকে আধা-মনোনীত সংস্থা বানানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়, আর বিচার বিভাগের হাতে বেশি ক্ষমতা দেওয়া হয়। থাকসিনের পার্টি ও দলীয় রাজনীতিকেরা নিষিদ্ধ হন।
মিয়ানমার ২০০৩ সালেই গণতন্ত্রে উত্তরণের যাত্রা শুরু করে, সেবার দেশটির সামরিক শাসক সাত স্তরের এক রোডম্যাপ তৈরি করেন। সামরিক জান্তা অশনিসংকেতটা ঠিক দেখতে পেয়েছিল। তারা জানত, সহিংসতা ও নিপীড়নের মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা যাবে না। কারণ, আন্তর্জাতিক অবরোধ ও বিচ্ছিন্নতার কারণে একসময় না একসময় ঠিকই ভেঙে পড়তে হবে, সেটা তারা বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু যেটা তারা বুঝতে পারেনি সেটা হলো, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদারীকরণ কত দ্রুত ঘটবে। ২০১১ সালে যখন প্রকৃত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কার শুরু হলো, তখন সেখান থেকে পিছিয়ে আসার যে খেসারতটা মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে দিতে হয়েছে, তা ছিল অকল্পনীয়ভাবে বেশি। ২০১৫ সালের নির্বাচনে এনএলডি ভূমিধস বিজয় লাভ করে। কিন্তু সু চির পরিবারের সদস্যের বিদেশি নাগরিকত্ব থাকার কারণে যখন তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারলেন না, তখন তিনি এক নজিরবিহীন কাজ করলেন, রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম দেখাশোনা করার জন্য তিনি ‘রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা’ হলেন। আর প্রেসিডেন্ট হলেন থিন কিউ, যিনি সু চির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মানুষ। ওদিকে সামরিক বাহিনী সংবিধান মোতাবেক ২৫ শতাংশ সংরক্ষিত আসন ধরে রেখেছে (যেখানে সংবিধান সংশোধন করতে হলে ৭৫ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগে), স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও সীমান্ত মন্ত্রণালয়ের ওপরও তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। কিন্তু জেনারেলরা কথা রেখেছেন, তাঁরা সু চি ও এনএলডিকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিচ্ছেন।
দায়টা এখন সু চির কাঁধেই, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে রাখার জন্য যা করা দরকার, তাঁকে সেটা করতে হবে। অর্থাৎ তাঁকে খুব সতর্কভাবে পা ফেলতে হবে। কারণ, তিনি একদিকে সামরিক বাহিনীর অতীতের অপকর্মের বিচার চান, আবার ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতি সামাল দিতে চান। বড় পদক্ষেপ নিতে গেলে তাঁকে ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে। ফলে তাঁকে আপসের পথে হাঁটতে হবে। থাইল্যান্ডের নেতারাও এটা শিখতে পারেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার দল ও রাজতন্ত্রী রক্ষণশীল বিরোধীপক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে দেশটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে থমকে আছে। থাকসিনের দল পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ব্যাপক সফলতার সঙ্গে গণতন্ত্রায়ণ করেছে, ফলে ২০০১ সাল থেকে সব কটি নির্বাচনেই তারা জিতেছে। কিন্তু থাকসিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। ২০০৬ সালে গণবিক্ষোভ শুরু হয়, মাসাধিক কাল তা চলার পর সামরিক অভ্যুত্থান হয়। এরপর জেনারেলরা থাকসিনের নির্বাচনী সক্ষমতা কমানোর প্রাণান্ত চেষ্টা চালান। তাঁরা নতুন এক সংবিধানের খসড়া করেন, যেখানে সিনেটকে আধা-মনোনীত সংস্থা বানানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়, আর বিচার বিভাগের হাতে বেশি ক্ষমতা দেওয়া হয়। থাকসিনের পার্টি ও দলীয় রাজনীতিকেরা নিষিদ্ধ হন।
আর
থাকসিনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হওয়ায় তিনি নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন।
কিন্তু তা সত্ত্বেও থাকসিনের সমর্থক গোষ্ঠী গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষের সমর্থন
লাভ করে আবারও নির্বাচনে জেতে। যখন আদালত ২০০৮ সালে থাকসিনের দলের ক্ষমতায়
যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেন, তখনই বিরোধীরা ক্ষমতা দখল করে। কিন্তু কিছুদিনের
মধ্যেই তারা আবার হেরে যায়, ২০১১ সালে থাকসিনের বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা
নির্বাচনে জয়ী হন। থাকসিন সবই চেয়েছিলেন, কিন্তু শেষমেশ কিছুই পাননি। ২০১৩
সালের অক্টোবর মাসে ইংলাকের সরকার সাধারণ ক্ষমার বিল আনে, যার বদৌলতে
থাকসিনের বিরুদ্ধে আনীত সব ফৌজদারি মামলা তুলে নেওয়া হয়, এমনকি মামলার রায়ও
বাতিল করা হয়, যাতে তাঁর দেশে ফেরা সম্ভব হয়। কিন্তু এতে তাঁর বিরুদ্ধে
আরও তীব্র প্রতিবাদ সৃষ্টি হলে পরবর্তী মে মাসে আবারও সামরিক অভ্যুত্থান
হয়। থাই জেনারেলরা সরাসরি শাসন করতে শুরু করেন। নতুন সংবিধানের খসড়ায়
পুরোনো সামরিক শাসনের ভীতিকর পুনরুত্থান হয়। ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর পিস
অ্যান্ড অর্ডার এ বছরের আগস্টে এই খসড়া সংবিধানের ওপর গণভোট করবে, তাতে যদি
খসড়াটি গৃহীত হয় তাহলে ২০১৭ সালে দেশটিতে নির্বাচন হবে।
কিন্তু
এই খসড়ায় বলা হয়েছে, সেনা নিয়োজিত ২৫০ সদস্যের একটি সিনেট থাকবে, যাঁরা
পাঁচ বছরের জন্য ‘অন্তর্বর্তীকালীন’ কাজ করবেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাজ
সীমিত করায় তাঁদের হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা থাকবে। এই খসড়ায় আরও বলা হয়েছে,
প্রধানমন্ত্রীকে একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি হতেই হবে, এমন কথা নেই। ফলে
সামরিক বাহিনী প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়ে বসতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই নাগরিক
সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলো এই দৃশ্যমান অগণতান্ত্রিক সংবিধানের বিরুদ্ধে মাঠে
নেমেছে। এমনকি যাঁরা আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ
চেয়েছিলেন, তাঁরাও এখন দ্বিতীয়বার চিন্তা করছেন। থাই জেনারেলরা বহুদিন দেশ
শাসনের চিন্তা করছেন, যার জন্য ন্যূনতম মতানৈক্যও তাঁরা সহ্য করছেন না।
দেশটির সামনে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দিন। আসলে মিয়ানমারে যেমন আপসরফা হলো,
থাইল্যান্ডেও তেমনটা দরকার। যখন সব পক্ষই বুঝতে পারবে যে কেউ একতরফাভাবে
সবকিছু জিতে নিতে পারে না, তখনই দর-কষাকষি ও আলোচনার মাধ্যমে মেরুকরণ ও
রাজনৈতিক সংকট দূর করা সম্ভব। এই পর্যায়ে আসতে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের
৫০ বছর লেগে গেছে। মানুষ আশা করে, থাইল্যান্ড দ্রুতই সেই জায়গায় চলে যাবে।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
থিতিনান পংশুধিরক: ব্যাংককের চুলালোংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
থিতিনান পংশুধিরক: ব্যাংককের চুলালোংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক।

No comments:
Post a Comment