Saturday, May 14, 2016

সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণের হার বাংলাদেশে

খেলাপি ঋণের হার
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) গভর্নর রঘুরাম রাজন খুবই চিন্তিত দেশটির খেলাপি ঋণ নিয়ে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) চলতি মাসেই এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, এশিয়া-প্যাসিফিক দেশগুলোর মধ্যে ভারতের খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি। যেমন ভারতে ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্য দেশগুলোর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ায় খেলাপি ঋণ ২ দশমিক ৪ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ২ দশমিক ৭ শতাংশ, ফিলিপাইনে ১ দশমিক ৯ শতাংশ, জাপানে ১ দশমিক ৬ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ, চীনে ১ দশমিক ৫ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় ১ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে দশমিক ৯ শতাংশ, হংকংয়ে দশমিক ৭ শতাংশ ও দক্ষিণ কোরিয়ায় দশমিক ৬ শতাংশ। ভারতের অর্থনীতিতে খেলাপি ঋণ কয়েক মাস ধরেই অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে রয়েছে। যদিও আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল আদালতের একটি রায় থেকে। গত এপ্রিলে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশ করার পক্ষে মত দেন। যদিও শুরুতে রিজার্ভ ব্যাংক এতে আপত্তি জানিয়েছিল। তবে এখন খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে দেশটি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নানা রকম নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। রঘুরাম রাজন এ নিয়ে যথেষ্ট দৌড়ঝাঁপ করছেন।
আইএমএফের ওই প্রতিবেদনে এশিয়া-প্যাসিফিক দেশগুলোর মধ্যে ভারতের খেলাপি ঋণই সর্বোচ্চ বলে মত দেওয়া হয়েছে। তবে পরিস্থিতি খানিকটা ভিন্ন। কারণ, প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তথ্য নেই। আন্তর্জাতিক অর্থনীতির আকার বিবেচনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি ততটা বড় নয় বলেই হয়তো বাদ পড়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন খেলাপি ঋণের হার মোট দেওয়া ঋণের ৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। তবে অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ধরলে তা ১৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। আর কেবল সরকারি ব্যাংকগুলোর তথ্য নিলে অত্যন্ত সংকটজনক চেহারাই পাওয়া যাবে। যেমন রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ২১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। আর কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের খেলাপির হার ২৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে দেশের ব্যাংক খাতে গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। এর বাইরে অবশ্য অবলোপন বা রাইট-অফ করা হয়েছে আরও ৪০ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের এই পরিমাণ দেশের মোট উন্নয়ন বাজেটের প্রায় সমান। এই অর্থ দিয়ে অন্তত চারটি পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অবশ্য আরেকটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের একটি বিশ্লেষণ দিয়েছে।
আইএমএফ গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার আর্টিকেল ফোর মিশন শেষ করেছে। মিশন শেষে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আইএমএফ বলছে, বাংলাদেশে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ অত্যন্ত বেশি। আর সামগ্রিকভাবেও দেশের খেলাপি ঋণের হার অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। আর এই উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণেই বাংলাদেশে ঋণের সুদের হারও বেশি। আইএমএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল এশিয়ায় নয়, সব দেশ মিলিয়েই বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি। আইএমএফ এ ক্ষেত্রে ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সময়ের খেলাপি ঋণের হিসাব বিবেচনায় নিয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে বিশ্বের অন্যান্য উঠতি অর্থনীতির (ইমার্জিং ইকোনমি) দেশগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৮ শতাংশের কিছু বেশি। বাংলাদেশ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার গড় হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়াকে বাদ দিয়ে এশিয়ার বাকি উঠতি অর্থনীতির দেশগুলোর খেলাপি ঋণের গড় হার ৪ শতাংশের সামান্য বেশি। এর বাইরে অগ্রসর অর্থনীতির দেশগুলোর খেলাপি ঋণ ৪ শতাংশ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর খেলাপি ঋণ ২ শতাংশের কিছু বেশি।
এদিকে খেলাপি ঋণের হার নিয়ে বিশ্বব্যাংকেরও একটি তালিকা রয়েছে। সেই তালিকায় এমন কিছু দেশ আছে, যাদের খেলাপি ঋণের মোট হার বাংলাদেশের চেয়েও বেশি। এই দেশগুলোর বেশির ভাগই নানা ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে আছে। আবার কিছু দেশ আছে, যাদের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির তুলনা করা সহজ নয়। বিশ্বব্যাংকের ওয়েবসাইটে দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, আফগানিস্তানের খেলাপি ঋণের হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। আলবেনিয়ার খেলাপি ঋণ আরও বেশি, প্রায় ২১ শতাংশ। তবে সবচেয়ে বেশি খেলাপি চরম অর্থনৈতিক সংকটে থাকা গ্রিসে, ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ। আর ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ সান মারিনোর, প্রায় ৪৬ শতাংশ। অন্যান্য দেশের মধ্যে জিবুতির খেলাপি ঋণ ২০ শতাংশ, ক্রোয়েশিয়ার ১৭ শতাংশ, হাঙ্গেরির প্রায় ১৩ শতাংশ, আয়ারল্যান্ডের প্রায় ১৯ শতাংশ, মালদোভার প্রায় সাড়ে ১৪ শতাংশ, মন্টেনেগ্রোর প্রায় ১৭ শতাংশ, রোমানিয়ার ১৪ শতাংশ এবং সার্বিয়ার খেলাপি ঋণের হার প্রায় ২৩ শতাংশ। অবলোপন এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় বড় ঋণের পুনর্গঠন বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার ২০ শতাংশের কাছাকাছিই চলে যাবে। এখন দেখা যাক বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর এ বিষয়ে আদৌ কোনো কিছু করবেন কি না।

No comments:

Post a Comment