Wednesday, May 25, 2016

২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন সম্ভব

প্রথম আলো কার্যালয়ে গতকাল গোলটেবিল বৈঠকে
বক্তব্য দেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল
হক (ডানে)। পাশে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার
কান্ট্রি ডিরেক্টর শ্রীনিবাস বি রেড্ডি। প্রথম আলো
২০২১ সালের মধ্যে দেশ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন হবে। আর ২০২৫ সালের মধ্যে নিরসন হবে সব ধরনের শিশুশ্রম। সরকারের এই প্রত্যয়ের কথা জানালেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক। তবে এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় শিশুশ্রম নিরসনে যে কাজ করছে, তার মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। প্রথম আলো আয়োজিত ‘শিশুশ্রম নিরসনে আমাদের দায়িত্ব’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী এ কথা বলেন। কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে গতকাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী শিশুদের শ্রমে নিযুক্ত করাকে একধরনের ‘মানসিকতা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, অনেকেই বাইরে বড় বড় মানবাধিকারের কথা বলেন। অথচ তাঁরাই তাঁদের বাসায় শিশুদের গৃহশ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেন। এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। বৈঠকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় শিশুশ্রম সমীক্ষা ২০১৩-এর তথ্য দিয়ে উল্লেখ করা হয়, দেশে সাড়ে ৩৪ লাখ শিশু কর্মরত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৭ লাখ শিশু রয়েছে, যাদের কাজ শিশুশ্রমের আওতায় পড়েছে। বৈঠকে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন অনেক। তবে যেতে হবে আরও অনেক দূর। সরকারের নীতি, চেষ্টা, দাতাগোষ্ঠী, এনজিও এবং গণমাধ্যম একত্র হলে দেশে অনেক কিছুই করা সম্ভব। প্রথম আলো শিশুশ্রম নিরসনের বিষয়টিতে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে আলোচকেরা বলেন, ২০১৫-পরবর্তী জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যে (এসডিজি) ২০২৫ সালের মধ্যে দেশ থেকে সব ধরনের শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সম্মিলিত উদ্যোগ এবং যথাযথ বাজেট বরাদ্দ করা হলে তা অর্জন করা সম্ভব। বৈঠকে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব খোন্দকার মোস্তান হোসেন দেশে শিশুশ্রমের অবস্থান বিষয়ে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে গত কয়েক বছরে প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ে এক লাখ শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে সরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। চতুর্থ পর্যায়ের প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নজরুল ইসলাম খান বলেন, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা কার্যকর হলেই শিশুশ্রম কমে যাবে বা বন্ধ হয়ে যাবে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিচালক তোফায়েল আহমেদ শুধু শিশুশ্রম নিরসনের কথা না বলে শিশু এবং শৈশবকে গুরুত্ব দিয়ে লাইফ সাইকেল অ্যাপ্রোচে অগ্রসর হওয়ার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, বাবা-মা ভাবেন, পড়াশোনা করিয়ে কোনো লাভ হবে না। সেই তো সন্তানকে কাজেই দিতে হবে। তাই আগে থেকে কাজে দেওয়াটাকেই তাঁরা লাভজনক মনে করেন। আইএলওর দেশীয় পরিচালক শ্রীনিবাস বি রেড্ডি বলেন, শিশুশ্রমের পেছনে বাবা-মায়ের দারিদ্র্য একমাত্র কারণ নয়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং মনমানসিকতাও দায়ী। তিনি বিভিন্ন নীতি ও আইন বাস্তবায়ন, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনের বিষয়টিকে অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা এবং শিশুশ্রমিকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকার বিষয়টিতে জোর দেন। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ইন্সপেক্টর জেনারেল সৈয়দ আহম্মদ বলেন, এ পর্যন্ত শিশুশ্রম-সংক্রান্ত ৪৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। শিশুশ্রম বন্ধে মালিকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের চেয়ারপারসন এমরানুল হক চৌধুরী শিশুশ্রম নিরসনে স্কুলের শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দদায়ক করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে শিশুদের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেন।
জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) শিশু সুরক্ষা কর্মকর্তা জামিল হাসান বলেন, শিশুর বাবা-মায়ের জন্য শর্তযুক্ত কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়নে কত টাকা লাগবে, তার জন্যও বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। সেভ দ্য চিলড্রেনের এদেশীয় উপপরিচালক টিম হোয়েট বলেন, দেশের বিশালসংখ্যক শিশুকে শ্রম থেকে সরিয়ে আনতে হলে সম্মিলিত উদ্যোগ লাগবে। সরকার একা কিছু করতে পারবে না। মধ্যম আয়ের দেশে শিশুরা স্কুলে যাবে—এর কোনো বিকল্প নেই। ওয়ার্ল্ড ভিশনের ন্যাশনাল ডিরেক্টর ফ্রেড ইউটিভিন মনে করেন, শিশুশ্রম নিরসনে অঙ্গীকার এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রসর হলে এসডিজি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল ফারুক আহমেদের মতে, দেশের বিশাল অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত থেকে শিশুশ্রম নিরসন করা কঠিন। শিশুশ্রম নিরসনে সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি। ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেশন কমিটি অন ওয়ার্কার্স এডুকেশনের চেয়ারপারসন শুক্কুর মাহমুদ শিশুশ্রম বন্ধে বাবা-মায়েদের অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন। বাংলাদেশ টেক্সটাইল অ্যান্ড গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স লীগের সহসভাপতি মরিয়ম আক্তার বলেন, শতভাগ কমপ্লায়েন্সের আওতায় আসা কারখানায় হয়তো শিশুশ্রম নেই, তবে ছোটখাটো কারখানাগুলোতে এখনো শিশুদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে।

No comments:

Post a Comment