Tuesday, May 24, 2016

১৫ জেলায় ১ লাখ ১০ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত

সাগরপাড়ের এই জায়গার নাম তলাইয়ারপাড়া। জনপদের চিহ্ন হিসেবে
সেখানে এখন কেবল কয়েকটি গাছ ও বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপ রয়েছে।
বাদবাকি এলাকা গত শনিবারের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে প্রায়
নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর খানখানাবাদ
ইউনিয়নের প্রেমাশিয়া বাজারের পাশের এই জনপদে
এখন আর মানুষের কোলাহল নেই, আছে সাগরের
গর্জন l ছবি: জুয়েল শীল
ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে উপকূলীয় ১৫টি জেলায় ১ লাখ ১০ হাজার ৬৮৪টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আংশিক ও পুরোপুরি মিলিয়ে প্রায় ৮০ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারা গেছে অন্তত ২৪ জন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের করা ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব থেকে পাওয়া গেছে এসব তথ্য। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে চট্টগ্রামের বাঁশখালী, ভোলার তজুমদ্দিন এবং কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকা। এসব জায়গায় অসংখ্য মানুষ খোলা আকাশের নিচে বাস করছে। তিন দিন পরও ক্ষতিগ্রস্ত অনেক এলাকায় ত্রাণ পৌঁছায়নি। আহত ব্যক্তিরা পাচ্ছে না চিকিৎসাসেবা। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ ভেঙে কিংবা সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে প্লাবিত হয়েছে অনেক গ্রাম। ইউনাইটেড নেশনস অফিস ফর দ্য কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাফেয়ার্সের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, রোয়ানুর আঘাতে মোট ১০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৮০ হাজার বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নির্মিত উপকূলীয় বেড়িবাঁধগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তবে বেড়িবাঁধের মোট ক্ষতির কোনো হিসাব এখনো সরকারিভাবে তৈরি হয়নি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকেও ফসলের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব তৈরি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। ১১ জেলা থেকে পাওয়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রোয়ানুতে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২২ হাজার ১৫২টি বাড়িঘর এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৬ হাজার ২৭৮টি। ঢাকার বাইরের প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক, কার্যালয় ও প্রতিনিধিরা জানান: ঘূর্ণিঝড়ে ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অসংখ্য মানুষ খোলা আকাশের নিচে বাস করছে। তিন দিন পরও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ত্রাণ পৌঁছায়নি। আহত ব্যক্তিরা পাচ্ছে না চিকিৎসাসেবা। গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, তজুমদ্দিন উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের এলাকা এখন শুধুই ধ্বংসস্তূপ। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা ঝড়ে উড়ে যাওয়া মালামাল, আসবাব, ঘরের চাল, খুঁটি ও টিন খুঁজতে নেমেছে। বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে খুঁটিগুলো ভেঙে পড়ে রয়েছে। খেতের ফসল ও পুকুর ডুবে রয়েছে। স্থানীয় ব্যক্তিরা বলেন, গত শুক্রবার থেকে বিদ্যুৎ নেই। বিদ্যুৎ আসবে এমন কোনো তৎপরতাও দেখা যাচ্ছে না। পল্লী বিদ্যুৎ ঢিমেতালে কাজ করছে। অধিকাংশ ঘরে চাল নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, রাতের বেলা অনেকটা খোলা আকাশের নিচে থাকছে বাসিন্দারা। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর খানখানাবাদ ইউনিয়নে বেড়িবাঁধ না থাকায় প্রায় সব ঘরবাড়ি ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে ও জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে গেছে। ইউনিয়নের সাড়ে ছয় হাজার ঘরের প্রায় সব কটিতে পানি ঢুকেছে।
দুই থেকে আড়াই হাজার ঘর ঝোড়ো হাওয়া ও জলোচ্ছ্বাসে একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। গতকাল স্থানীয় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী ত্রাণ বিতরণ করতে গেলে স্থানীয় ব্যক্তিরা মন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, তাঁরা ত্রাণ চান না, বেড়িবাঁধ চান। বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শামসুজ্জামান বলেন, ঘূর্ণিঝড়ে উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও অনেক ঘরবাড়ি। চিংড়িঘের ও লবণের মাঠ তলিয়ে গেছে। কক্সবাজারের প্রায় ৬১ কিলোমিটার ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে জেলার পাঁচটি উপজেলার অন্তত ১০ হাজার ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। বিলীন হয়েছে এসব এলাকার অন্তত ২৫ হাজার ঘরবাড়ি। গৃহহীন লাখো মানুষ খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। সেখানে খাবার ও সুপেয় পানির তীব্র সংকট চলছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে উপকূলের ১২ হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিলীন এবং আরও ১০ হাজার ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। নোয়াখালীতে ঝড়ের আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাতিয়া উপজেলা। সেখানে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে এবং ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন সূত্র থেকে জানা যায়, জলোচ্ছ্বাসে প্রায় আড়াই হাজার পুকুর ও মাছের খামার ভেসে গেছে। হাতিয়ার ইউএনও আবু হাসনাত মো. মঈন উদ্দিন বলেন, প্রাথমিক হিসাবে আট শ ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ এবং নয় হাজার ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় পাউবোর কর্মকর্তারা বলেন, নলচিরা চর, সুখচর ও তমরুদ্দি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার প্রায় ছয় কিলোমিটার বেড়িবাঁধ পুরো ভেঙে গেছে। আরও নয় কিলোমিটার বাঁধ আংশিক ভেঙে গেছে। বরিশালের গৌরনদী, আগৈলঝাড়া ও উজিরপুর উপজেলায় পানবরজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তিন উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গৌরনদী, আগৈলঝাড়া ও উজিরপুর উপজেলার অধিকাংশ কৃষক পানচাষি। এ তিন উপজেলার ২ হাজার ৫৮৫ হেক্টর জমিতে পান চাষ করা হয়। জলোচ্ছ্বাস ও টানা বর্ষণে সেখানকার পাঁচ শ হেক্টর জমির পানবরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার পরিবার আয়ের একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। বরগুনার বেতাগী উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাড়ে ২১ হাজার কৃষক। উপজেলা কৃষি বিভাগের হিসাবে প্রায় ৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পটুয়াখালীতে রোয়ানুর প্রভাবে টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে ইটভাটার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কাঁচা ইট ধসে পড়েছে, আবার চুল্লি দেবে ভেতরে সাজানো কাঁচা ইটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
 

No comments:

Post a Comment