Tuesday, May 24, 2016

জঙ্গি হামলা ও হত্যা বেড়েই চলেছে by আহমেদ জায়িফ

মাসওয়ারি হিসাবে গত দেড় বছরে দেশে জঙ্গি হামলা ও হত্যার হার বেড়েছে। গত বছরের প্রথম পাঁচ মাসে চারটি হামলায় ১১ জন নিহন হন। এ বছরের একই সময়ে হামলার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৩। নিহত হয়েছেন ১৪ জন। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যার মধ্য দিয়ে জঙ্গি হামলার ঘটনা দেশে-বিদেশে আলোচনায় আসে। তবে ওই বছরের জুন ও জুলাই—দুই মাস হামলা ও হত্যার ঘটনায় বিরতি থাকলেও আগস্ট থেকে আবার শুরু হয়। বছরটির শেষ পাঁচ মাসে ২৫টি হামলায় নিহত হন মোট ১৯ জন। সেই হিসাবে গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি মে মাস পর্যন্ত গড়ে চারটি করে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। কেবল গত মাসেই পাঁচটি হামলায় ছয়জন নিহত হন। সব মিলিয়ে গত ১৬ মাসে ৪২টি হামলায় ৪৪ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৬টিতে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএস (ইসলামিক স্টেট) এবং ৮টিতে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশের (একিউআইএস) কথিত বাংলাদেশ শাখা আনসার আল ইসলাম দায় স্বীকার করেছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার কুষ্টিয়ায় বাউল অনুসারী হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক মীর সানাউর রহমান হত্যার ঘটনার দায়ও স্বীকার করেছে আইএস। তবে শুরু থেকেই সরকার জোরের সঙ্গে বলে আসছে, এ দেশে আইএস বা আল-কায়েদার অস্তিত্ব নেই। দেশীয় জঙ্গিরা এসব হামলায় জড়িত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে আইএস ও আল-কায়েদা এখন একটি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থায় আছে। আমরা মানি বা না মানি, এই দুটোর প্রভাবে বাংলাদেশে হামলার সংখ্যাটা বাড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘সিরিয়া বা আফগানিস্তান থেকে তো আইএস আসবে না। আমাদের এখানে আল-কায়েদার মনোভাবাপন্ন লোকজন আগে থেকেই আছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আইএস। এই দুয়েরই লক্ষ্য হলো শরিয়াভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। এখানকার তরুণেরা এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে এসব কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি এখন আর এগুলো জঙ্গিরা করছে বলব না। এগুলো হচ্ছে টার্গেট কিলিং। একেকটা সাবজেক্ট নিয়ে আসছে আর টার্গেট কিলিং করছে। দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্যই এগুলো করা হচ্ছে। আইএস-ফাইএস কিছুই নাই এ দেশে।’ দেশে এ ধরনের একের পর এক হত্যার ঘটনায় উদ্বিগ্ন বিদেশি কূটনীতিকেরাও। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত সাতটি দেশের ঢাকায় নিযুক্ত কূটনীতিকেরা গত রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর কাছে উদ্বেগের কথা জানান। তাঁরা অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সহিংসতার বৃত্ত ভাঙতে এবং ঝুঁকিতে থাকা সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। একই দিন সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভা হয়। সভা শেষে কমিটির সভাপতি শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু সাংবাদিকদের বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ৩৭টি হামলা ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে ২৫টির সঙ্গে সরাসরি জেএমবি (জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ) জড়িত। আর আটটির সঙ্গে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (পরিবর্তিত নাম আনসার আল ইসলাম) এবং বাকি চারটির সঙ্গে অন্যান্য জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠন জড়িত। এসব ঘটনায় আইএসের সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আমির হোসেন আমু বলেন, ওই ৩৭টি ঘটনার মধ্যে কেবল চারটি মামলার তদন্ত শেষ করে পুলিশ অভিযোগপত্র দিয়েছে। দুটি মামলা বিচারাধীন আছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৪৬ জনকে। যাঁদের মধ্যে ৪৯ জন আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। এর আগে ৩ মে সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হকও একই তথ্য দিয়েছিলেন। ওই দিন তিনি বলেন, ৩৭টি হামলার মধ্যে ৩৪টি ‘ডিটেক্টেড’ বা মূল রহস্য উদ্‌ঘাটিত হয়েছে। ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ সফল হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে একই কায়দায় হামলা-হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়নি; বরং বেড়ে চলছে। আর এসব হামলার শিকার হচ্ছে বিভিন্ন ধর্মীয় ও গোষ্ঠীগত সংখ্যালঘুসহ ভিন্ন মতাবলম্বীরা। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামে হামলার শিকার হচ্ছেন তাঁরা। এসব হামলা ঠেকাতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এমনকি ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনারও সুরাহা করতে পারছে না তারা। অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘আমরা এগুলো প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছি। গ্রামে গ্রাম-পুলিশ, শহরে পুলিশ ছাড়াও কমিউনিটি পুলিশ প্রতিরোধ করবে। এ ছাড়া সামাজিক আন্দোলনেরও ডাক দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক নেতারাও তাঁদের বক্তব্যে প্রতিরোধের ডাক দিচ্ছেন।
সর্বদলীয় এবং সর্বধর্মীয় ঐক্যের মাধ্যমেই প্রতিরোধ করা হবে।’ জঙ্গি হামলাসংক্রান্ত মামলাগুলোর সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের তৈরি একটি তালিকা ৩ মে আইজিপির সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া হয়। সে তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৩৭টি ঘটনার মধ্যে ২৪টিতে হামলার শিকার হয়েছেন বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ গোষ্ঠীগত (শিয়া ও তরিকতপন্থী) ও ভিন্ন মতাবলম্বীরা। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১৫টি জেলায় এসব হামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি হামলায় ১৪ জনকে হত্যা, ৪টিতে হত্যাচেষ্টা এবং ৬টি হামলা হয়েছে ধর্মীয় উৎসব ও স্থাপনায়। এর বাইরে চলতি মাসের প্রথম তিন সপ্তাহে তিনটি হামলা হয়েছে। হামলার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন হিন্দু পুরোহিত, সাধু, খ্রিষ্টান যাজক, বৌদ্ধ ভিক্ষু, বাহাই সম্প্রদায়ের নেতা, পীরের অনুসারী, মাজারের খাদেম, শিয়া অনুসারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ধর্মান্তরিত ব্যক্তি, ব্লগার এবং সমকামীদের অধিকারকর্মী। এসব হামলার ঘটনার মধ্যে কেবল তিনটি মামলা—ঢাকায় ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান হত্যা, চট্টগ্রামে কথিত ল্যাংটা ফকির রহমত উল্লাহ ও তাঁর খাদেমকে হত্যা এবং আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতি ও আট হত্যার মামলার তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। বাকি মামলাগুলোর তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। তাঁরা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারেননি, কবে নাগাদ তদন্ত শেষ হবে, কবেই বা অভিযোগপত্র দিতে পারবেন। গত বছরের ২৪ নভেম্বর ফরিদপুরে দুর্বৃত্তদের কোপে আহত হন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতা অলোক সেন। পুলিশ বলছে, হামলাটি সন্ত্রাসী বা জঙ্গিগোষ্ঠী ঘটিয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তখন সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. এনায়েত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে কোনো তথ্য উদ্‌ঘাটন করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার সঙ্গে তাঁদের সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া যায়নি। সাতজনই জামিনে আছেন। গত ২২ ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে সন্ত গৌড়ীয় মঠের অধ্যক্ষ যজ্ঞেশ্বর রায়কে গলা কেটে হত্যা করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দেবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) মো. আইয়ুব আলী প্রথম আলোকে বলেন, ওই ঘটনায় সাতজন গ্রেপ্তার আছেন। তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বাকিদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সব আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। কবে নাগাদ অভিযোগপত্র দেওয়া হবে, জানতে চাইলে এই তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘আমার ইচ্ছার ওপর সবকিছু নির্ভর করবে না। এখানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যা বলবেন, সেভাবেই হবে।’ রাজশাহীর বাগমারায় আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের মসজিদে গত ২৫ ডিসেম্বর বোমা হামলা হয়। তাতে হামলাকারী নিজেও নিহত হয়। পুলিশ এ ঘটনার কোনো কিনারা করা তো দূরের কথা, নিহত ব্যক্তির পরিচয়ও উদ্‌ঘাটন করতে পারেনি। সর্বশেষ ৫ মে নিহত ব্যক্তি এবং অপর একজনের ছবি সংবাদপত্রে ছাপিয়ে লাশের পরিচয় উদ্ধারের জন্য ৫০ হাজার টাকা এবং পলাতক ব্যক্তির সন্ধানের জন্য আরও ৫০ হাজার টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেছে পুলিশ। এ বিষয়ে রাজশাহীর পুলিশ সুপার নিশারুল আরিফ প্রথম আলোকে বলেন, অনেক দিক থেকে তথ্য আসছে, এগুলো যাচাই-বাছাই করতে হবে। পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায় গির্জার যাজক লুক সরকারকে হত্যাচেষ্টার মামলায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে দুজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বিমান কুমার দাশ প্রথম আলোকে বলেন, মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তাই অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে না। গত বছরের ১২ নভেম্বর নীলফামারীর সৈয়দপুরে শিয়া সম্প্রদায়ের প্রতীকী কারবালার খাদেম হাসনাইনকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়।
এ ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নীলফামারী ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাবুল আকতার প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁরা কিছু সূত্র পেয়েছেন। সেগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হামলাটি কারা করেছে, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের মতে, ‘এসব ঘটনায় আমাদের প্রশাসন ও পুলিশের যতটা তৎপর হওয়া দরকার, ততটুকু দেখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে কেন যেন একটু শিথিলতা দেখা যায়। এটা আসলে কেন হচ্ছে, তা বোঝা যাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক বিভাজন প্রকট। এটা সমাজের একদম তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কেবল শক্তি প্রয়োগ করে সমাধান পাওয়া যাবে না। এ জন্য সমষ্টিগতভাবে কাজ করতে হবে। কোনো তরুণ ওই সব মতাদর্শের দিকে ঝুঁকছেন কি না, তাঁর খোঁজ রাখতে হবে। (প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর, রাজশাহী এবং বগুড়া, দিনাজপুর, ফরিদপুর, পঞ্চগড়, পাবনা ও সৈয়দপুর প্রতিনিধি)

No comments:

Post a Comment