সম্প্রতি
বঙ্গোপসাগরের সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ বাংলাদেশের ওপর দিয়ে অতিক্রম করার
সময় উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও ভোলায় প্রাণহানিসহ
ব্যাপক সম্পদের ক্ষতি করেছে। তার আগেও বাংলাদেশের সীমারেখার ওপর দিয়ে
ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, রেশমি, বিজলি, নার্গিস ও রোয়ানু বয়ে গেছে। আমাদের দেশ
প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও সাইক্লোন এখানে প্রচুর
হয়। আর এগুলোর বিধ্বংসী ক্ষমতাও অনেক। প্রলয়ঙ্করী আইলা আর সিডরের ক্ষতি
এখনো পুষিয়ে নিতে পারেনি ওই এলাকার মানুষেরা। তাই ঘূর্ণিঝড় মানেই ভয়,
আতঙ্ক। তারপরও ঘূর্ণিঝড়ের চমৎকার নামগুলো সবাইকে অবাক করে। তাই নামকরণ নিয়ে
মানুষের মধ্যে রয়েছে নানা কৌতূহল। কেনই বা এ নামকরণ অথবা ক’জনই বা জানে এই
নামের অর্থ। ২০০০ সালের আগে যেসব ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হতো সেগুলো শুধু
ঘূর্ণিঝড় কিংবা সাইক্লোন হিসেবে জানত সবাই। কিন্তু পরবর্তীতে যেসব
ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয় এর সাথে একটি সুন্দর ও অর্থবহ নাম যুক্ত হয়েছে। এর
মধ্যে বেশির ভাগের নামই মেয়েদের নামের সাথে মিল রয়েছে। ঝড়ের নামকরণ নিয়ে
সরস আলাপ আলোচনায় মেতে উঠেতে দেখা যায় অনেককেই। ঘূর্ণিঝড় সাধারণত
ধ্বংসযজ্ঞসহ ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। তারপরও এ ঘূর্ণিঝড়ের নাম নিয়ে রয়েছে
তর্ক-বিতর্ক। আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় ঘূর্ণিঝড়গুলোর বিভিন্ন
নামকরণ করা হয়, আবহাওয়া স্টেশনগুলো থেকে সংগৃহীত ঝড়ের তথ্য সবাইকে জানানোর
সুবিধার্থে। সমুদ্র উপকূলে সবাইকে সতর্ক করা, বিভিন্ন সঙ্কেত ও জলযানগুলোর
জন্য ঝড়ের খবর খুব সহজভাবে আদান-প্রদান করার জন্যই মূলত ঝড়ের নামকরণ করা
হয়ে থাকে। নামকরণ করে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার অধীনে বিভিন্ন আঞ্চলিক কমিটি।
যেমন বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট সব ঝড়ের নামকরণ করবে বিশ্ব আবহাওয়া
সংস্থার আটটি সদস্য রাষ্ট্র। এদের মধ্যে রয়েছেÑ বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ভারত,
পাকিস্তান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও ওমান। এই আটটি সদস্য
রাষ্ট্রের একটি প্যানেল হচ্ছে স্কেপে। এই আটটি দেশের নামকরণ করা হয়েছে
স্কেপে।
২০০০ সালে স্কেপের প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতিটি দেশে থেকে ১০টি করে
নাম জমা নেয়া হয় ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের জন্য। এখান থেকেই পরবর্তীতে
ঘূর্ণিঝড়গুলোর নামকরণ করা হয়। এ বছরের জন্য ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ আগেই ঠিক করা
হয়েছে। তবে একেক সময় একের দেশের প্রস্তাবিত নাম ব্যবহার করা হয় ঘূর্ণিঝড়ের
সময়। বাংলাদেশ থেকে পাঠানো বেশির ভাগ নাম মেয়েদের নামের অনুকরণে পাঠানো হয়
বলে আবহাওয়া অফিস জানায়। সম্প্রতি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে যে ঘূর্ণিঝড়
আঘাত হানে তার নামকরণ করা হয় রোয়ানু। রোয়ানু হচ্ছে মালদ্বীপের একটি ভাষা। যার বাংলা অর্থ নারকেলের ছোবড়ার দড়ি। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আইলা উপকূলীয়
জেলাগুলোতে আঘাত হেনেছিল ২০০৯ সালের ২৫ মে। ভারত মহাসাগর থেকে সৃষ্ট এ
ঘূর্ণিঝড়েরও নামকরণ করেন মালদ্বীপের আবহাওয়াবিদেরা। আইলা শব্দের অর্থ
ডলফিন। ২০০৮ সালে ৩ মে উত্তর ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের নাম ছিল
নার্গিস। এটি আঘাত হেনেছিল প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারে। এতে মিয়ানমারের
রাখাইন প্রদেশে ব্যাপাক ক্ষতি হয়। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশের
উপকূলীয় অঞ্চলে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হানে। সিডর সিংহলি শব্দ। যার
বাংলা অর্থ চোখ। সিডরের আঘাতে বাগেরহাটি ও খুলনা জেলাসহ অন্য জেলায় প্রায়
তিন সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। গৃহপালিত পশুপাখিসহ সম্পদের ব্যাপক
ক্ষতি হয়। এখন পর্যন্ত সিডরের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি অনেকে।
সিডরের
স্মৃতি মনে পড়লে ভয়ে আঁতকে ওঠেন উপকূলীয় বাসিন্দারা। এ ছাড়া ২০১০ সালে
সাইক্লোন লায়লা, ২০১১ সালে থেইন, ২০১২ সালে নিলম ও ২০১৩ সালে পাইলিন আঘাত
হানে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে। ২০১৩ সালে মহাসেন আঘাত হানে উপকূলীয় জেলা
চট্টগ্রাম, বরিশাল ও পটুয়াখালীতে। ঘূর্ণিঝড় হুদহুদ আঘাত হানে ওমানে। ঘূর্ণিঝড় ফাইলিন থাইল্যান্ডে আঘাত হানে রোয়ানুর পরে বঙ্গোপসাগরে ও ভারত
মহাসাগরে দক্ষিণএশিয়া অঞ্চলে কোনো ঝড়ের সৃষ্টি হলে এর নামকরণ করবে
মিয়ানমার। মিয়ানমারের দেয়া ঝড়ের নাম হবে কিয়ান্ট। মিয়ানমারের পরে নামটি হবে
অরব দেশ ওমানের নাদা। এভাবে পর্যায়ক্রমে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা,
থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ ও ভারত ঝড়ের নামকরণ করবে। আবহাওয়াবিদেরা জানিয়েছেন,
অনেক ঘূর্ণিঝড় সাগরে সৃষ্টি হয়ে সাগরেই দুর্বল হয়ে যাওয়ায় কারণে এসব
ঘূর্ণিঝড় পরিচিতি পায় না। সমুদ্রের ৫০ মিটার কিংবা তার অধিক গভীর অঞ্চলে
পানির তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রির অধিক হলে এবং পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফলে সৃষ্ট
কোরিওলিস শক্তির প্রভাবে কোনো অঞ্চলে বাতাস সোজা হয়ে প্রবাহিত না হয়ে উত্তর
গোলার্ধে ডান দিকে বেঁকে গেলে তখন ওই অঞ্চলে বায়ুমণ্ডলে নিম্ন ও মধ্য
স্তরের অধিক আর্দ্রতার কারণে ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়।

No comments:
Post a Comment