Monday, May 30, 2016

কাজ না করলে খামু কী

সন্তানদের সুখের জন্য একজন মা যে কত কষ্ট করতে পারেন, তার বাস্তব উদাহরণ মানিকগঞ্জের আরুয়া ইউনিয়নের বাউলিকান্দা গ্রামের মর্জিনা বেগম। ১৭ বছর আগে দুই শিশুসন্তান রেখে মর্জিনা বেগমের স্বামী ঢাকায় কাজের খোঁজে গিয়ে আর ফেরেননি। পরে জানতে পারেন তিনি মারা গেছেন। এরপর থেকেই শুরু হয় তার জীবনযুদ্ধ। সংসারের হাল ধরতে কখনো অন্যের বাড়িতে, কখনো আবার কাজ করেছেন ফসলের মাঠে। এখনো মর্জিনা বেগম কেয়ার বাংলাদেশের হয়ে ইউনিয়ন পরিষদের একজন তালিকাভুক্ত মাটি কাটা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু এই সংগ্রামী নারী তার ছেলেকে বানাচ্ছেন এমবিবিএস ডাক্তার। ছেলে রিপন বিশ্বাস ঢাকার একটি মেডিক্যাল কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্র। মেয়ে সুরমা আক্তার এইচএসসি পরীার্থী। তাকেও আইনজীবী বানাতে চান মা মর্জিনা। কথা হলো জেলার দৌলতপুরের ভাঙা আবুডাঙ্গা এলাকার প্রবীণ লালতারা বেওয়া নামের এক জনমদুখী মায়ের সাথে। জেলা শহরের এক বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এক মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র ছেলে ঢাকায় কাজ করে। বিয়ে করে তারা সন্তানসহ ঢাকায় থাকে। লালতারা জানালেনÑ ‘দুই সন্তান মাঝে মধ্যে ঈদে বাড়ি আসে। অন্যের বাড়িতে কাজ না করলে খামু কী?’
জমিলা বেগম। বয়স প্রায় ৬০ পেরিয়েছে। জোকা এলাকায় থাকেন অন্যের বাড়িতে আশ্রয়ে। তিনি জানান, স্বামী মানিক মিয়া বহু আগে তাকে ছেড়ে অন্যত্র বিয়ে করে সংসার করছেন। দুই মেয়ে ও এক ছেলেসন্তানকে নিয়ে তিনি বাবার বাড়ি বসবাস করছেন। ছেলেও বিয়েশাদি করে অন্যত্র থাকে। খোঁজ নেয় না বৃদ্ধ মায়ের। সন্তানের কথা জানতে চাইলে ধুলো-কালি মাখা গাল বেয়ে ঝরঝর করে জল বেরিয়ে গেল ঝলসানো চোখের। আড়ষ্ঠ কণ্ঠে জানালেন, মায়ের পরিচয় দিতে খুব লজ্জা লাগে তার ছেলের। তবুও দোয়া করি আল্লাহয় যেন ওদের সুখে রাখে। কথা হয় আরেক প্রবীণ দুঃখী জননী জরিনা বেগমের সাথে। বয়সের ভারে কান্ত সদর উপজেলার ভাটবাউর এলাকার ৬৫ বছরের জরিনার কষ্টের সীমা নেই। স্বামী নেই। সংসারে আছে চার মেয়ে ও দুই ছেলে। কেউ তার ভরণপোষণ করে না। ইটভাটায় কয়লা ভাঙার কাজ করে নিজের ও স্বামী পরিত্যক্তা মেয়ের দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোগাড় করতে হচ্ছে।
বললেন, ‘এই বয়সে আগুনে পুইড়া কাম করতে আর ভালো লাগে না। কিন্তু কী আর করুম, কপালে কষ্ট থাকলে তো করতেই অইবো। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই একটা দিনের জন্যও কাম ছাড়া বসে নেই। জানি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজ কইরাই মরতে অইবো।’ এদের একজন ফুলজান বেগম। বয়স ৫০-এর কাছাকাছি। সদর উপজেলার উকিয়ারা গ্রামের শহিদ উদ্দিনের মেয়ে ফুলজানের স্বামী হাকিম উদ্দিন সাত বছর আগে দুর্ঘটনায় মারা যান। রেখে যান চার সন্তান। স্বামীর মৃত্যুর পর তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। সন্তানদের মুখে দু’বেলা খাবার তুলে দিতে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে পড়েন কাজের সন্ধানে। কখনো মাটি কাটার কাজ, কখনো ইটভাটায় কয়লা ভাঙার কাজ আবার কখনো রাজমিস্ত্রির জোগান দিয়েছেন। ফুলজানের চেহারা রোদ ও আগুনের তাপে পুড়ে বিবর্ণ হয়ে গেলেও হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি। কথা বলার এক ফাঁকে দু’চোখের কোণে পানি টলমল করছিল। বারবার কাপড়ের আঁচল দিয়ে পানি মোছার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে কেঁদে ওঠেন হাউমাউ করে। শুধু বলেন, ‘আমাগোর মতো মানুষের কষ্টের কথা আপনে লেইখ্যা কী করবেন। এত কষ্ট কইরা পোলা দুইডারে বড় করছি। ওরা এহন ম্যালা ট্যাহা কামায়। শহরে থাহে (থাকে)। একবারও খবর নেয় না আমার। ওগো দেকবার খুউব মন চায়।’

No comments:

Post a Comment