Saturday, May 28, 2016

মধুমাসে মধু ফলের খোঁজে

জ্যৈষ্ঠ মাস আমাদের দেশে মধুমাস নামেই খ্যাত। কারণ এ সময়ে পাওয়া যায় আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল, আনারসের মতো মজার ফল। ভালো আম-লিচু মানেই রাজশাহীর আম ও লিচু। এত দূরে গিয়ে আম-লিচুর বাগান দেখা হয়ে ওঠে না। তবে অনেকেরই হয়তো জানা নেই, ঢাকার কাছে গাজীপুরের নরসিংদীতে লিচু, কাঁঠাল ও আনারস খুব ভালো হয়। এবার আম, কাঁঠাল, লিচু ও আনারসের বাগান দেখতে আমরা পরিকল্পনা করি ধীমানের বাড়ি নরসিংদীর পলাশে যাওয়ার। অবশ্য ধীমানের আগ্রহেই যাওয়া।
১ জ্যৈষ্ঠ সকাল ৭টা নাগাদ গাড়িতে গিয়ে বসলাম নরসিংদীর উদ্দেশে। দিনটি ছিল শনিবার। তাই যানজটের ঝামেলা অতটা পোহাতে হয়নি। সকাল ১০টায় নরসিংদী জেলা থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে পলাশ উপজেলায় গ্রামে গিয়ে পৌঁছলাম। জেলা শহর থেকে উপজেলা। উপজেলা থেকে গ্রামে প্রবেশপথে যেদিকেই চোখ পড়ছিল সব দিকেই শুধু বাগান আর বাগান। কলার বাগান, লিচু, কাঁঠাল, আম, জাম, আনারস ছাড়াও ধুন্দল, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, চালকুমড়াসহ আরো নানা জাতের সবজির বাগান। এ ছাড়াও ছিল বিশাল বিশাল পুকুর জুড়ে মাছের খামার। চোখে পড়ছিল না এলাকার বাজারহাট ছাড়া রাস্তায় তেমন কোনো মানুষের পদচারণা। পথ চলতে চলতে এক সময় গাড়ি গিয়ে থামল ঠিক ধীমানদের বাড়ির দোরগোড়ায়। গ্রামে পা রেখে অবাক হই এমন একটি সম্পূর্ণ যান্ত্রিক কোলাহলমুক্ত গ্রাম থাকতে পারে তিলোত্তমা ঢাকার এত কাছে। যেখানে কান পাতলে শুধু পাখির গান, নির্মল বাতাসের শব্দ, দু’চোখ ভরে ফসলের মাঠ ও সবুজের সমারোহ চোখে পড়ে। ধীমানের পরিবার, গ্রামের ঠিক ৮-১০টা মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো। আমরা পৌঁছা মাত্রই আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে উঠল। আপ্যায়ন পর্ব সারে নিজ গাছের যাবতীয় ফল দিয়েই। এর কিছু অংশ মুখে দিয়ে ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পড়লাম গ্রাম দেখতে। দু’চোখ ভরে দেখলাম আম পেকে পেকে কিভাবে গাছের তলায় পড়ছে। পাকা জাম পিচঢালা পথটিকে তার মধুরসে মাখিয়ে দিচ্ছে। পুকুরের মাছেরা খাবারের সন্ধানে পানির উপরি ভাগে মুখ উঁচিয়ে উঁকি মারছে। পায়ের শব্দ পেয়েও পাখিরা থমকে যাচ্ছে। রেখেছে চোখে চোখ। হ্যাঁ, ধীমানদের গ্রামটিতে পর্যটকদের জন্য থাকা-খাওয়ার তেমন সুব্যবস্থা নেই। নেই নিকটজন, আত্মীয়দের বাড়ি ছাড়া রাত যাপনের তেমন কোনো আশ্রয়। নেই ফাস্টফুডের নামী-দামি বিশেষ কোনো রেস্তোরাঁ। তবে যারা ঢাকায় থাকেন বিষমুক্ত ফল, সবজি, মাছ বিশুদ্ধ বায়ু সেবন করতে চান। চান দিনের কিছুটা অংশ শহরের কোলাহল থেকে মুক্ত রাখতে। ভ্রমণের সাথে সাথে আত্মীয়-পরিজনদের জন্য নিজ হাতে ফল, সবজি ও মাছ সংগ্রহ করতে। তাদের জন্যই নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার খানের বাড়ি একটি আদর্শ গ্রাম। ৩ ঘণ্টার মতো এখানে অবস্থান করে ফেরার পথে, ধীমানদের গাছের আম, লিচু, কাঁঠাল, আনারস ও জাম সংগ্রহ করে নিলাম। এর সাথে আনলাম এদের ওদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আন্তরিকতা, যা ভাবতে ভাবতে ঢাকায় ফেরার পথে চোখে পড়ছিল তালগাছ থেকে রশি বেঁধে পানিতালের পির নামানোর বিরল দৃশ্য। ক্ষেত থেকে তরতাজা সবজি তোলা। জাল পেতে মাছ উঠানো। শিং, কৈ, মাগুরের দাপাদাপি। সবজি বিক্রেতার ঝুড়িতে তাজা ফুল না ঝরা শসা। গাছে পাকা আম, কাঁঠাল পাখিদের খুঁটে খুঁটে খাওয়ার দৃশ্য। সে মুহূর্তে মনে হচ্ছিল সব যেন আমার বহমান গাড়িতে তুলে আনি। এনে পরিচিতজনের মাঝে দিই বিলিয়ে। কিন্তু আমাদের ছোট গাড়িতে জায়গা কম থাকায় অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। বিষমুক্ত সে ফল-সবজি স্বজনদের দিলে তারাও খুব খুশি হয়েছিল। সব মিলিয়ে চমৎকার একটি দিন। যেমন মাটি-মানুষের কাছাকাছি যেতে পারার, তেমনি প্রকৃতির অকৃত্রিম দান ফল ও সবজি দেখে প্রাণ জুড়ানোর।

No comments:

Post a Comment