তনুকে
চিনি অল্প ক’দিন হলো, তার অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর পত্রপত্রিকার মাধ্যমে।
কিন্তু সে যে প্রকৃতির হিংস্রতার শিকার, সে ধরনের হিংস্রতা ও অপরাধকে চিনি
বহু দিন ধরে। এ সব অপরাধ বাংলাদেশে নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিককালে প্রবল বেগে
বৃদ্ধি পেয়েছে এগুলো। অপরাধকে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক ফায়দা লুটের উৎসবও
বেড়েছে। ঘটনার সপ্তাহাধিককাল পর তনুর ডেড বডি প্রাপ্তিস্থান পরিদর্শনে গিয়ে
একটি সংগঠনের চেয়ারম্যান আশঙ্কা করলেন, আলামত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কারণ
স্থানটি পরিষ্কার করা হয়েছে। আমরা সাধারণ মানুষ কেউই জানি না, মৃতদেহ
পাওয়ার স্থল আর ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের স্থান অভিন্ন, নাকি একাধিক। যাহোক,
ডিজিটাল দুনিয়ায় স্বঘোষিত ডিজিটাল দেশে আলামত সংগ্রহ, এগুলোর ফিঙ্গার
স্ক্যানিং, অটোপসি, ফরেনসিক টেস্ট, আলামতগুলোর হাই রেজুলেশন ভিডিও ধারণ এবং
ফটোগ্রাফি ও অন্যান্য পরীক্ষা করতে ক’দিন সময় প্রয়োজন? উন্নত বিশ্ব ক্রাইম
ইনভেস্টিগেশনে যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করে, তা অর্জন করা কঠিন নয়; ঘটনার
সত্যতা জনসমক্ষে প্রকাশ করার সদিচ্ছাটাই মূল কথা। যেকোনো অপরাধের অস্ত্র
দুই ধরনের।
একটি বাহ্যিক এবং অন্যটি মনস্তাত্ত্বিক। একটি সৃষ্টি হয়
ফ্যাক্টরিতে আর অন্যটি মনোজগতে। মনের গোপন কোঠরে যে লাল ফিতার পাগলা ঘোড়া
দৌড়ায়, তার গতি যেন আলোর গতির চেয়ে বেশি। তবে মনের জগতে যে অপরাধপ্রবণতা
সৃষ্টি হয় তার পেছনে রয়েছে সমাজে বিচরণশীল ভয়ঙ্কর সব উপাদান-উপকরণ, বিকৃত
সংস্কৃতির ব্যাপকতা, আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য প্রদান আর
ত্রুটিপূর্ণ বিচারব্যবস্থা। তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগে স্মার্টফোন
একটি ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। স্মার্টফোনে শত শত কমিউনিকেশন
অ্যাপসের ব্যবহার মানুষের পড়ালেখা, ব্যবসায়, ব্যাংকিং, সামাজিক যোগাযোগসহ
জীবনের বিস্তৃত ক্ষেত্রকে যেমন সহজ করেছে, একই সাথে পাপ ও অপরাধের
মহাসাগরকে করেছে উন্মুক্ত। গবেষণায় প্রকাশ, iOS (iPhone OS) এবং Android
mobile operating systems ২০১০ সালে পর্নোগ্রাফি ভিডিও দেখার মাধ্যম
হিসেবে শতকরা হার ছিল ১২। তবে বর্তমানে তা প্রায় ৭০ শতাংশে ছুঁয়েছে। আর
বাংলাদেশের চিত্র হলো, এখন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদেরও প্রধান পছন্দ একটি
স্মার্টফোন।
এটি দিয়ে মন্দ কাজ, যেমন অনৈতিক ভিডিও কল করা যায়, ভয়েস রেকর্ড
করে প্রেরণ করা যায়, আবেদন সৃষ্টি করা যায়। তাই অনেক সচেতন অভিভাবক এখন
চিন্তিত। আরো ভয়ঙ্কর খবর হলো, নগরজীবনে তো ইন্টারনেট অ্যাকসেস সহজতর।
এদিকে, পল্লী অঞ্চলে অনেক স্কুল ফেরত ছেলে ও মেয়েরা বর্তমানে মোবাইলে গান
লোডের দোকান থেকে পর্নোভিডিও লোড করে নিয়ে যায় সস্তায়! এগুলো কোনো কল্পনা
নয়। মফস্বল সাংবাদিক বন্ধুদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য। গুগল তথ্য প্রকাশ
করেছে, বিশ্বব্যাপী তাদের সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করে পর্নো সাইটে প্রবেশের
ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় ১০টি শহরের মধ্যে ৬টিই পার্শ¦বর্তী দেশ ভারতে। সেখান
থেকে সংস্কৃতি আমদানি করা আমাদের কথিত মুক্তমনাদের এক ধরনের উপাসনায় পরিণত
হয়েছে। গত বছর নাটোরে ১৪ বছর বয়সী বন্ধুকে হত্যা করেছিল তার সহপাঠী অপর
দুই বন্ধু। গ্রেফতারের পর স্বেচ্ছায় জানায়, ভারতীয় সিরিয়াল দেখে তারা এ
কাজে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। তনু হত্যাকাণ্ডের মতো আরো অনেক ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের
নৃশংস ঘটনা বছরব্যাপী খবরের কাগজে দেখা যায়। মানুষের মধ্যে এসব পৈশাচিকতা
সৃষ্টি করছে বিদেশী অপসংস্কৃতির সুলভ প্রসার। বছর দুয়েক আগে রাজধানীর
পরিবাগের একটি সেমি আবাসিক ফ্ল্যাটে ধর্ষণের পর প্রেমিকাকে কথিত প্রেমিক
হত্যা করে চাপাতি দিয়ে টুকরো টুকরো করে রেখেছিল। মানুষের মনে যে পাশবিকতা
সৃষ্টি হয়, তা দূর করার জন্য প্রয়োজন শিক্ষা সংস্কৃতি ও সমাজের কাঠামোগত
পরিবর্তন।
স্মার্টফোন বন্ধ করা যাবে না। পর্নোসাইট নিয়ন্ত্রণ, বিশেষ করে
মোবাইল অ্যাকসেস বন্ধ করা সম্ভব। সবচেয়ে বেশি সম্ভব মানুষের মনকে পরিশুদ্ধ
করা। তার চেয়েও বেশি সম্ভব কোমলমতি শিশুদের শুরুতেই পরিশুদ্ধভাবে গড়ে তোলা।
কিন্তু সেদিকে নজর নেই কারো। কাঠামোগত পরিবর্তন ও নৈতিক শিক্ষার কথা বললেই
গা জ্বলে ওঠে অতি প্রগতিবাদীদের। আমাদের জ্ঞানধর জ্ঞানপাপীরা কাঠামোগত
নৈতিক পরিবর্তনকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে থাকেন। দেশে কোনো ধর্ষণ বা
হত্যাকাণ্ডের ঘটনা স্বার্থবাদীদের প্রয়োজনে যখন সরবে আলোচনায় উঠে আসে,
সেসময় স্বঘোষিত নারীবাদী মুক্তমনা সাংস্কৃতিক জোট ও গোষ্ঠী সর্বাধিক
প্রতিক্রিয়া দেখায়। অথচ অনেক নেত্রীই নারী অধিকারের নামে গণিকাবৃত্তির
বৈধতা প্রদানের জন্য নগরীতে পোস্টার সেঁটেছিলেন। চলমান ঘটনার কোনো একটি
কেন্দ্র করে মাঝে মাঝে তারা অতি প্রগতিশীল, অগ্নিবর্ষী বক্তা, প্রতিবাদের
মূর্তপ্রতীক হয়ে ওঠেন। অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও অপরাধ দমনের জন্য
কাঠামোগত রূপান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলেন না। ধর্ষণ-নির্যাতনের
প্রতিবাদ করার প্রকৃত ও প্রতীকী ভাষা বোঝা যায়। এক দিকে নগ্নতা ও যৌনতা,
নারী-পুরুষের বেপরোয়া আচরণে তরুণ প্রজন্মকে অপরাধে উস্কিয়ে দেয়া, অন্য দিকে
ধর্ষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অনেকের ক্ষেত্রে দ্বৈত চরিত্রের অভিনয়
মাত্র। এত লেখালেখি, রিপোর্টিং, সভা, মিছিল, সেমিনার, মানববন্ধনের পরও
ক্রমেই ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা বৃদ্ধিই পাচ্ছেÑ তাহলে আমরা বলতেই পারি,
গোড়ায় গলদ আছে। যারা ধর্মের শিক্ষাকে অবজ্ঞা করেন এবং ধর্মের রাষ্ট্রীয়
স্বীকৃতি দিতে চরম দ্বিধা যাদের, যারা পাশ্চাত্যের ভোগবাদী সভ্যতার অনুকরণে
নিজেদের ছেলেমেয়েদের কথিত স্বাধীনতার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন, তারাই যদি
ধর্ষণের প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে দৃশ্যমান হন তাহলে, এই প্রতিবাদ নিয়ে
সন্দেহ জাগে, এটা প্রকৃত নয়।
বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায়ের
গুরুদের সাথে ঘনিষ্ঠতা এবং তুলনামূলক অধ্যয়নের সুবাদে এটা নিশ্চিত করে বলতে
পারি, সব ধর্মই নৈতিক শিক্ষা এবং অপরাধ দমনের জন্য প্রধানত ধর্মীয় শিক্ষার
গুরুত্বের কথাই বলে। ব্যতিক্রম বলে শুধু নাস্তিকেরা। তাদের মতে, ধর্মীয়
শিক্ষায় মানুষ গোঁড়া হয়, মুক্তমনা হয় না। এ দেশে নাস্তিকেরা সংখ্যায়
নগণ্য, কিন্তু তাদের পেছনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রবল। তারা
বক্তৃতায়, শিক্ষাব্যবস্থায়, সংস্কৃতিচর্চায়, গণমাধ্যমে, সাহিত্যে যে
সভ্যতার খোরাক দিয়ে যাচ্ছেন তরুণ সমাজ সে সভ্যতায় গড়ে উঠছে। সেখানে
পাপ-পুণ্যের হিসাব-নিকাশে গড়মিল আছে। তাই আরো কত তনুর জন্ম হবে আর কত
হিংস্রতা মানুষ দেখবে, তা বলা মুশকিল। তনুর জন্য অনুশোচনা আর অনাগত
ভবিষ্যতে ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি সম্পর্কে সতর্কবার্তাই শেষ কথা।

No comments:
Post a Comment