![]() |
| মা জিয়ান |
৫০
বছর আগে এই মাসে মাও সে তুং চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু করেন। তার পরের
১০ বছর দেশটিতে আদর্শের নামে হত্যা, নির্যাতন ও সহিংসতা চালানো হয়েছে, যার
আসল লক্ষ্য ছিল মাওয়ের ক্ষমতা বাড়ানো। কিন্তু ওই সময়ের ধ্বংসাত্মক
কর্মকাণ্ডের জের নিয়ে আলোচনা না করে চীনা সরকার বরং তার পরিসর আরও সীমিত
করে আনছে। আর গত তিন দশকে বাজার উদারীকরণের ফলে যে সম্পদ সৃষ্টি হয়েছে,
চীনা নাগরিকেরা তাতেই মগ্ন। তারা একরকম সন্তুষ্ট। কিন্তু চীনা প্রেসিডেন্ট
শি জিন পিং যেভাবে দেশের ভেতরে নির্মম শুদ্ধি অভিযান চালাচ্ছেন এবং
ব্যক্তিপূজার রীতি চালু করছেন, তাতে অতীতকে এভাবে ধামাচাপা দেওয়া মোটেও
নিরীহ ব্যাপার নয়। ১৯৬৬ সালে মাও সে তুং বম্বার্ড দ্য হেডকোয়ার্টার-মাই
বিগ-ক্যারেক্টার পোস্টার নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন, যার লক্ষ্য ছিল
কমিউনিস্ট পার্টি থেকে ‘শীর্ষস্থানীয় পুঁজিবাদীদের’ বিতাড়ন করা। তাঁদের
মধ্যে ছিলেন তখনকার পার্টি সভাপতি লিউ শাওচি। সেই ‘পোস্টারে’ মাও চীনের
তরুণদের প্রতি আহ্বান জানান, ‘সম্রাটকে ঘোড়া থেকে নামিয়ে ফেলো, আর তৃণমূল
থেকে বিপ্লব শুরু করো।’
তরুণেরা বেশ আগ্রহ নিয়েই মাওয়ের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল। ‘লাল বাহিনীর’ ছাত্রদের আধা সামরিক বাহিনী দেশজুড়েই মাওয়ের ইচ্ছাপূরণে মাঠে নেমে পড়ে। দেখা গেল, ১০০ দিনের মধ্যে মাও সে তুং দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বড় নেতাদের অপসারণ করে ফেলেন, যার মধ্যে ছিলেন লিউ শাওচি ও দেং জিয়াও পিং। কিন্তু মাওয়ের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষই শুধু হামলার শিকার হয়নি। সে বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই লাল বাহিনী ১ হাজার ৭০০ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করে। এসব মানুষকে পিটিয়ে মারা হয়েছিল অথবা আত্মহত্যায় বাধ্য করা হয়েছিল। এ ছাড়া তারা প্রায় এক লাখ বেইজিংবাসীর বাড়িঘর ও অস্থাবর সম্পত্তি পুড়িয়ে তাদের দেশছাড়া করে। বিশেষ করে, শিক্ষকেরা খুব নাজুক অবস্থায় ছিলেন। লাল বাহিনীর সদস্যরা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখামাত্র সেখানকার শিক্ষক ও প্রশাসকদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার এই লাল বাহিনীর ওপর চড়াও হতেও মাওয়ের বেশি সময় লাগেনি। একসময় তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, লাল বাহিনীর সদস্যরা পুঁজিবাদীদের ‘অনুচর’। সারা দেশে সামরিক আইন জারি করে মাও সে তুং লাল বাহিনীতে নতুন সদস্য নিয়োগ দিলেন, যারা ছিল নতুন সর্বহারা বিপ্লবী। কখনো কখনো তিনি বাহিনীর মূল সদস্যদের ‘নতুন করে শিক্ষালাভের’ জন্য দূরবর্তী গ্রামগুলোতে পাঠাতেন। শি তো নিজের ঘরেই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রভাব দেখেছেন।
তরুণেরা বেশ আগ্রহ নিয়েই মাওয়ের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল। ‘লাল বাহিনীর’ ছাত্রদের আধা সামরিক বাহিনী দেশজুড়েই মাওয়ের ইচ্ছাপূরণে মাঠে নেমে পড়ে। দেখা গেল, ১০০ দিনের মধ্যে মাও সে তুং দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বড় নেতাদের অপসারণ করে ফেলেন, যার মধ্যে ছিলেন লিউ শাওচি ও দেং জিয়াও পিং। কিন্তু মাওয়ের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষই শুধু হামলার শিকার হয়নি। সে বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই লাল বাহিনী ১ হাজার ৭০০ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করে। এসব মানুষকে পিটিয়ে মারা হয়েছিল অথবা আত্মহত্যায় বাধ্য করা হয়েছিল। এ ছাড়া তারা প্রায় এক লাখ বেইজিংবাসীর বাড়িঘর ও অস্থাবর সম্পত্তি পুড়িয়ে তাদের দেশছাড়া করে। বিশেষ করে, শিক্ষকেরা খুব নাজুক অবস্থায় ছিলেন। লাল বাহিনীর সদস্যরা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখামাত্র সেখানকার শিক্ষক ও প্রশাসকদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার এই লাল বাহিনীর ওপর চড়াও হতেও মাওয়ের বেশি সময় লাগেনি। একসময় তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, লাল বাহিনীর সদস্যরা পুঁজিবাদীদের ‘অনুচর’। সারা দেশে সামরিক আইন জারি করে মাও সে তুং লাল বাহিনীতে নতুন সদস্য নিয়োগ দিলেন, যারা ছিল নতুন সর্বহারা বিপ্লবী। কখনো কখনো তিনি বাহিনীর মূল সদস্যদের ‘নতুন করে শিক্ষালাভের’ জন্য দূরবর্তী গ্রামগুলোতে পাঠাতেন। শি তো নিজের ঘরেই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রভাব দেখেছেন।
তাঁর
বাবা শি ঝংজুন ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির বড় এক নেতা, যদিও তাঁকে
ক্ষমতাচ্যুত করে কারাবন্দী করা হয়েছিল। শেষমেশ তাঁকে ট্রাক্টর নির্মাণ
কারখানায় কাজ করতে পাঠানো হয়। আর তাঁর পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। যে আদর্শ
ও সংগঠন তাঁর পরিবার ও দেশকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল, শি সেই সাংস্কৃতিক
বিপ্লবের মূল মতবাদ ও হাতিয়ার গ্রহণ করেন। তাঁর মধ্যে ওই যুগের তরুণদের
যুদ্ধংদেহী মনোভাব আছে। ক্ষমতাই তাঁকে বাতিঘরের মতো পথ দেখায়, আর সেটা
নিশ্চিত করতে তিনি যেকোনো কিছু করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর কিছু সুবিধা
আছে, সেটা হলো মাওয়ের উত্তরাধিকার। কয়েক দশক ধরে মাও এমন এক ধরনের
শ্রেণিসংগ্রাম চালিয়েছেন, যেখানে নাগরিকেরা একে অপরের ওপর নজরদারি করেছে।
এমনকি ঘনিষ্ঠতম বন্ধু, প্রতিবেশী ও পরিবারের সদস্যরাও এই নজরদারির আওতায়
ছিলেন। কিন্তু যাওয়ার নিরাপদ জায়গা না থাকায় মানুষ কমিউনিস্ট পার্টির দাসে
পরিণত হয়। এই ভয়ের পরিবেশে রাষ্ট্র নীরবে ও দক্ষতার সঙ্গে ব্যক্তির পরিচয়
গ্রাস করে ফেলে। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের একটি শিক্ষা হচ্ছে জনগণের ওপর
একচ্ছত্র শাসন কায়েম করার জন্য হিংস্রতার এস্তেমাল করতে হয়। এই শিক্ষার
ব্যাপারে শিকে উদাসীন মনে হয়। তিনি শুধু ‘একচ্ছত্র শাসনের’ ব্যাপারেই মাথা
ঘামান। আর এ ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় জন্ম নেওয়া মানুষেরা—যঁারা
এখনো জীবিত—শির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত হয়েছেন। অর্থাৎ
যে মানুষেরা জানেন, ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ব্যক্তিগত পছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে
রাজনীতিকে প্রাধান্য দেওয়ার মানে কী। শি জানেন, স্রেফ দলের কর্তৃত্ব ও নেতা
হিসেবে নিজের অবস্থান সংহত করতে পারলেই তিনি সফল হবেন। সে কারণে তিনি এই
বয়ান হাজির করেছেন যে চীন দেশের ভেতর থেকেই মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
পার্টির দুর্নীতিবাজ ও বিশ্বাসঘাতক নেতারাই এ হুমকি সৃষ্টি করেছেন। তাই
দলীয় আনুগত্যকেই তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। স্রেফ দুই ধরনের মানুষ
আছে: যারা পার্টিকে সমর্থন করে, আর যারা করে না। ১৯৬৬ সালের মাওয়ের মতো শি
মনে করেন, সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক পর্যন্ত সবাইকে
যেকোনো উপায়ে অনুগত রাখতে পারার ওপরই তাঁর সফলতা নির্ভর করছে। ক্ষমতার
ভিত্তি নিহিত রয়েছে বিরোধীদের নিপীড়ন করার মধ্যে, যেমন নোবেল শান্তি
পুরস্কারপ্রাপ্ত লিউ জিয়াওবোসহ হাজার হাজার লেখক ও পণ্ডিতকে কারারুদ্ধ করা
হয়েছে।
কিন্তু নিজের শাসন সংহত করার জন্য শি শুধু ভীতির ওপরই নির্ভর করছেন না, একই সঙ্গে জনগণের সমর্থনও পাওয়ার চেষ্টা করছেন। এ লক্ষ্যে তিনি একীভবনের এক আদর্শ হাজির করেছেন, যার ভিত্তি সেই তথাকথিত চীনা স্বপ্ন। এটা একগুচ্ছ সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও লক্ষ্যের সমাহার, যা ‘চীনা জাতির মহান পুনর্জাগরণ’ ঘটাবে বলে বিশ্বাস করা হয়। এটাকে সংহত করার জন্য জাতীয়তাবাদী জিকিরও তোলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, পৃথিবী, বিশেষ করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে বিশ্বব্যবস্থার শীর্ষে আরোহণ করতে দিচ্ছে না, যেটা তার প্রাপ্য। আর শি ব্যক্তিপূজার এমন রীতি চালু করেছেন, যা মাওয়ের পর আর দেখা যায়নি। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ৫০ বছর হয়ে গেল, কিন্তু এখন পর্যন্ত তার অপরাধ ও পাপ মোচন হয়নি। উল্টো দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক ও সামাজিক নিপীড়নকে জায়েজ করার জন্য এটা ব্যবহার করা হচ্ছে। শি যত চেষ্টাই করুন না কেন, তাঁর এই মাও স্টাইলের শাসনের ফলাফল একদমই ভিন্ন হবে। কারণ, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় তিনি অদক্ষ। আর এই রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানের কারণে দেশের ভেতরে গোপনেই তাঁর এক বিরোধী শিবির দাঁড়িয়ে যাবে। অর্থনৈতিক ব্যর্থতা থেকে রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটলে লাল বাহিনী আবারও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মূল ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে, যাদের পেছনে থাকবে এক ইতিহাস-অজ্ঞ তরুণ প্রজন্ম। আর এবার যে ‘সম্রাটকে’ তারা ঘোড়া থেকে টেনে নামাবে, তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং।
কিন্তু নিজের শাসন সংহত করার জন্য শি শুধু ভীতির ওপরই নির্ভর করছেন না, একই সঙ্গে জনগণের সমর্থনও পাওয়ার চেষ্টা করছেন। এ লক্ষ্যে তিনি একীভবনের এক আদর্শ হাজির করেছেন, যার ভিত্তি সেই তথাকথিত চীনা স্বপ্ন। এটা একগুচ্ছ সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও লক্ষ্যের সমাহার, যা ‘চীনা জাতির মহান পুনর্জাগরণ’ ঘটাবে বলে বিশ্বাস করা হয়। এটাকে সংহত করার জন্য জাতীয়তাবাদী জিকিরও তোলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, পৃথিবী, বিশেষ করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে বিশ্বব্যবস্থার শীর্ষে আরোহণ করতে দিচ্ছে না, যেটা তার প্রাপ্য। আর শি ব্যক্তিপূজার এমন রীতি চালু করেছেন, যা মাওয়ের পর আর দেখা যায়নি। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ৫০ বছর হয়ে গেল, কিন্তু এখন পর্যন্ত তার অপরাধ ও পাপ মোচন হয়নি। উল্টো দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক ও সামাজিক নিপীড়নকে জায়েজ করার জন্য এটা ব্যবহার করা হচ্ছে। শি যত চেষ্টাই করুন না কেন, তাঁর এই মাও স্টাইলের শাসনের ফলাফল একদমই ভিন্ন হবে। কারণ, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় তিনি অদক্ষ। আর এই রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানের কারণে দেশের ভেতরে গোপনেই তাঁর এক বিরোধী শিবির দাঁড়িয়ে যাবে। অর্থনৈতিক ব্যর্থতা থেকে রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটলে লাল বাহিনী আবারও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মূল ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে, যাদের পেছনে থাকবে এক ইতিহাস-অজ্ঞ তরুণ প্রজন্ম। আর এবার যে ‘সম্রাটকে’ তারা ঘোড়া থেকে টেনে নামাবে, তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং।

No comments:
Post a Comment